• অর্থনীতি ডেস্ক
  • ২৭ এপ্রিল ২০২০ ১৬:০১:২৩
  • ২৭ এপ্রিল ২০২০ ১৬:০৩:২৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

নগদ অর্থে টানা, ব্যাংকের সঞ্চয় ভাঙছেন গ্রাহকরা

ছবি : সংগৃহীত

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) কারণে লকডাউনের কবলে পুরো দেশ। এতে করে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কার্যত স্থবির অর্থনীতির চাকা। এমতাবস্থায় ব্যাংকে থাকা মেয়াদি আমানত (ফিক্সড ডিপোজিট বা এফডি) ও সঞ্চয়ী আমানত প্রকল্পের (ডিপিএস) মতো সঞ্চয়ে টান পড়েছে। লকডাউনে ব্যাংক ও হাতে থাকা অর্থ শেষ হওয়ায় মেয়াদের পূর্বেই এসব সঞ্চয় থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছেন অনেক গ্রাহক।

এফডি, ডিপিএসের মতো সঞ্চয় নগদায়ন করতে ব্যাংকের শাখায় হাজির হচ্ছেন অনেক গ্রাহক। এ ধরনের গ্রাহকের সংখ্যা বেড়েই চলেছে প্রতিদিন। কিছু গ্রাহক এফডি বা ডিপিএস মেয়াদ পূর্তির আগেই ভাঙাতে পারলেও অনেককেই ফেরত পাঠাচ্ছেন ব্যাংকাররা। আবার অনেক ব্যাংকারই গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় এফডি নগদায়ন করে দিচ্ছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এফডি নগদায়ন না করে গ্রাহকদের প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ দিচ্ছেন ব্যাংকাররা। অন্তত এক ডজন ব্যাংকের ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফেনী ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন কর্মকর্তারা এমন কথা জানান। এছাড়াও বেশ কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরাও প্রায় একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন।

এদিকে ব্যাংকারদের অসহযোগিতার কথাও জানান অনেক গ্রাহক। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, প্রয়োজনের মুহূর্তে তারা এফডি, ডিপিএস নগদায়ন করতে পারছেন না। এক্ষেত্রে ব্যাংকাররা জানান, সাধারণ ছুটির এই সময়ে সীমিত পরিসরে ব্যাংকিং কার্যক্রম চলছে। এ অবস্থায় মেয়াদ শেষ হয়নি এমন এফডি, ডিপিএস নগদায়নের সুযোগ নেই।

পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে উল্লেখ করে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘মানুষের আয়ের কোনো পথ নেই। অনেক বড় ব্যবসায়ীও মেয়াদি আমানত ভাঙাতে আসছেন। এ ধরনের গ্রাহকের সংখ্যা এখনো খুব বেশি নয়। তবে পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকেই যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোয় ভালো কিছু দেখছি না।’

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক এই চেয়ারম্যান জানান, মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে এফডি বা ডিপিএস নগদায়ন করে দিলে ব্যাংকেরই লাভ। এক্ষেত্রে গ্রাহক অনেক কম মুনাফা পান। এজন্য মানবিক দিক বিবেচনা করে আমরা গ্রাহকদের প্রয়োজনের কথা শুনছি। এখন গ্রাহকের প্রয়োজন এমন অর্থ এফডি বা ডিপিএসের চেয়ে কম হলে আমরা তাকে ছোট অংকের ঋণ দিচ্ছি। গ্রাহক একেবারেই অপারগ হলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এফডি নগদায়ন করে দেয়া হচ্ছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে কর্মকর্তাদের এ ধরনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

বণিক বার্তা’র এই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে কাগজ-কলমে ব্যাংক হিসাব আছে ১০ কোটি ২৮ লাখ ৮১ হাজার ৯৬৩টি। এসব ব্যাংক হিসাবে জমা আছে ১১ লাখ ৫৯ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব সংখ্যা ১০ কোটি ২৪ লাখ ৮৭ হাজার ৬১২টি। বেসরকারি খাতের আমানতের পরিমাণ ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের ভিত্তিতে করা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে এই চিত্র পাওয়া যায়।

দেশের ব্যাংকগুলোতে থাকা আমানতের ৪৮ দশমিক ১৫ শতাংশ অর্থ মেয়াদি আমানত। বিভিন্ন নামে ফিক্সড ডিপোজিট ও ডিপিএস হিসাবে এ অর্থ ব্যাংকগুলোতে জমা রেখেছেন ৪০ লাখ ৩৬ হাজার গ্রাহক। সাধারণত মেয়াদি আমানতের সর্বনিম্ন মেয়াদ ৩ মাস। সর্বোচ্চ মেয়াদ সুনির্দিষ্ট না থাকলেও সাধারণত বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পের নামে ব্যাংকগুলো ১২ বছর পর্যন্ত ডিপিএস খুলছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, দেশের ব্যাংক হিসাবধারীদের মাত্র ৩ দশমিক ৯২ শতাংশের মেয়াদি আমানত রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিশ্রেণীর হিসাবধারীকে এ পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জনসংখ্যার বিচারে সঞ্চয়কারী জনগোষ্ঠীর এই হার খুবই কম।

সাধারণত সমাজের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি ব্যাংকগুলোতে মেয়াদি আমানত রাখেন। চাকরি থেকে অবসরে যাওয়া জনগোষ্ঠীর একটি অংশও ব্যাংকে মেয়াদি আমানত রেখে মুনাফার প্রত্যাশায় থাকেন। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে এই শ্রেণিটির কাছে নগদ অর্থের টান পড়েছে। এ কারণে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই এফডি বা ডিপিএস ভাঙাতে ব্যাংকগুলোতে ভিড় করছেন তারা।

এ পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডির) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকে দুই শ্রেণির গ্রাহক মেয়াদি আমানত রাখেন। এক শ্রেণি মেয়াদি আমানত থেকে মাস শেষে প্রাপ্ত সুদের ওপর নির্ভর করেই জীবনযাপন করেন। তারা যদি মেয়াদি আমানত নগদায়ন করে ফেলেন, তাহলে বুঝতে হবে ব্যাংক যে সুদ দিচ্ছে, তা দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার কথা ভেবে গ্রাহকরা ব্যাংকে মেয়াদি আমানত রাখেন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মেয়াদি আমানত নগদায়ন করা ব্যাংক ও গ্রাহক দুই শ্রেণির জন্যই বিপজ্জনক।’

তিনি আরো বলেন, ‘মেয়াদি আমানত ভাঙার অর্থ হচ্ছে গ্রাহকের ভবিষ্যতের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলা। একই সঙ্গে মেয়াদি আমানত কমতে থাকা দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্যও নেতিবাচক। বিদ্যমান পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতি ও মানুষের দুর্যোগ প্রতিরোধ সক্ষমতার দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ।’

বাংলা/এনএস

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0630 seconds.