• বাংলা ডেস্ক
  • ২৭ এপ্রিল ২০২০ ১৬:৫১:৩৫
  • ২৭ এপ্রিল ২০২০ ১৭:৪৬:১২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

কোভিড-১৯: এন্টিজেন টেস্টিং আনতে পারে যুগান্তকারী পরিবর্তন

ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাস পরীক্ষা যতটা মানুষের দোরগোড়ায় হওয়ার কথা বাস্তবে সেটার ধারে কাছেও নেই আমরা। সাম্প্রতিক একটি রোড ম্যাপে পরামর্শ দেয়া হয়েছে যে অর্থনীতিকে নিরাপদ রাখার জন্য প্রতিদিন আমাদের প্রায় ২০ মিলিয়ন লোকের  পরীক্ষা করা প্রয়োজন (বর্তমানে দিনে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার পরীক্ষা চালানো সম্ভব)।

পরীক্ষার এ সংখ্যা বাড়ানোর জন্য আমাদের প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে যেতে হবে - এবং এর জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।

শুরুতে এ কথাগুলো বলে নিয়ে MIT Technology Review তাদের প্রকাশিত Antigen testing could be a faster, cheaper way to diagnose covid-19 প্রতিবেদনে এন্টিজেন টেস্টিং নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনটিকে কিছুটা সংক্ষেপিত ও বোধগম্যরূপে ভাষান্তর করে বাংলা'র পাঠকের জন্য উপস্থাপন করা হলো।

কোভিড -১৯ টেস্টিং : ফিরে দেখা

কোভিড-১৯ পরীক্ষার ‘সর্বোত্তম পদ্ধতি’ হল পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (পিসিআর) পরীক্ষা। পিসিআর পরীক্ষার জন্য নাকের ভেতর থেকে নমুনা নেয়া হয়। তারপর ভাইরাসের জিনগত উপাদান কয়েক মিলিয়ন বা বিলিয়ন বার ‘কপি’ করা হয় যার ফলে কোভিড- ১৯  সংক্রমণ চিহ্নিত করা যায়।

পিসিআর পরীক্ষার অসুবিধা :

এটা ঠিক এ পরীক্ষা নিখুঁত। এটি ভাইরাসকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারে। তবে দুর্ভাগ্যক্রমে এই পরীক্ষা করতে যা লাগে তা হলো সময়, সক্ষমতা এবং প্রশিক্ষিত কর্মী। এসব সমস্যাই পিসিআর টেস্টিংকে আমাদের জন্য সত্যিকার অর্থেই অসুবিধায় ফেলে দেয়।

হোয়াইট হাউস করোনাভাইরাস টাস্ক ফোর্সের প্রধান, দেবোরাহ বার্কস ১৭ এপ্রিল বলেছেন, ‘আমাদের কাজে বা স্কুলে যাওয়ার আগে প্রত্যেককে পরীক্ষা করা বা  প্রতিদিন ৩০০ মিলিয়ন পরীক্ষা করা (পিসিআর) সম্ভব নয়। তবে এক্ষেত্রে এন্টিজেন পরীক্ষার মাধ্যমে সেটা সম্ভবপর হতে পারে।’ 

অ্যান্টিজেন পরীক্ষা : আসুন জানি

এখন কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য মূলত ২ টা উপায় বিদ্যমান আছে। (১) পিসিআর (ভাইরাসের জিনগত উপাদান পরীক্ষা) এবং (২) এন্টিবডি টেস্ট (ভাইরাসের বিরুদ্ধে মানুষের দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়) 
তবে, আমরা এ ২ টা পরীক্ষার বাইরে গিয়ে ভাইরাসের অ্যান্টিজেন পরীক্ষার মাধ্যমে সংক্রমণ চিহ্নিত করতে পারি। (ভাইরাল পৃষ্ঠের প্রোটিনই হচ্ছে এন্টিজেন; যা সাধারণত করোনাভাইরাস পৃষ্ঠের স্পাইকে থাকে)। এ স্পাইকগুলো যথেষ্ট বড় ফলে সময় এবং শক্তি ব্যয় না করেই আমরা তা নির্ণয় করতে পারি।

ভাইরাসের এই এন্টিজেন শনাক্তকরণের অর্থ হচ্ছে ব্যয়বহুল সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ বা শক্তি ছাড়াই কেবল কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা রোগটা নির্ণয় করতে পারি। তাত্ত্বিকভাবে, একটি নির্ভরযোগ্য এন্টিজেন পরীক্ষার মাধমে আমরা সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি নির্ধারিত করা সহজ করতে পারি। তারপরে বাড়িতে বা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রকে আবার তার নিজের পায়ে দাঁড়াতে হলে আমাদের এ এন্টিজেন পরীক্ষা প্রয়োজন দেখা দিবে।

পিসিআর পরীক্ষা, এন্টিবডি টেস্ট ও এন্টিজেন টেস্ট :

আগেই বলেছি এখন কোভিড-১৯ এর জন্য মূলত পিসিআর ও এন্টিবডি টেস্ট করা হচ্ছে। এন্টিজেন টেস্টকে আমরা এখন নবতর সংযোজন হিসেবে ধরতে পারি।

অ্যান্টিজেন টেস্ট ও পিসিআর পরীক্ষার উদ্দেশ্যে একই রকম। উভয়ই কোভিড -১৯ এর নতুন কেস শনাক্তকরণে ভাল কাজ করে। কিন্তু অ্যান্টিবডি টেস্টে আগে কেউ সংক্রমিত হয়েছিলো এবং সে সংক্রমণ থেকে সু্স্থ হয়েছিল কিনা তা নির্ধারণের জন্য উপযুক্ত। আর পিসিআর এর সীমাবদ্ধতা হচ্ছে এটা চালাতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। সক্ষমতা ও প্রশিক্ষিত কর্মীদের প্রয়োজন হয়। ঘন ঘন ফলো-আপ পরীক্ষা করা যায় না। তাছাড়া পিসিআর ফলাফল সাধারণত দিনের দিনে পাওয়া যায় না। এমআইটি এবং হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক লি গের্ক (Lee Gehrke) বলেছেন, সময়ের সাথে সাথে সংক্রমণের অগ্রগতি ট্র্যাক করার ক্ষেত্রেও পিসিআর প্রযুক্তিটি ভাল নয়। তিনি বলছেন ‘কোনো রোগী প্রথম দিন কোভিড -১৯ এর জন্য নেতিবাচক হতে পারে এবং তারপরে হয়তো পরের দিন ইতিবাচক হতে পারে।’

এন্টিজেন টেস্ট : দ্রুত এবং সহজ

এন্টিজেন টেস্ট ঘটনাস্থলেই ফলাফল দিতে পারে। এর অর্থ এটি বারবার পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত। আপনি কোন ক্ষেত্রে দ্রুত ‘হ্যাঁ-বা-না’ ফলাফলের জন্যও এটি ব্যবহার করতে পারেন। যেমন কোনো অভিজাত হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে যেখানে রোগীদের পরীক্ষার সাইটে যাওয়ার মতো শারীরিক সক্ষমতা নেই বা স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের মধ্যে এ রোগ রয়েছে কিনা তা নির্ণয় করতে এ টেস্ট কাজে লাগতে পারে।

স্টিভ ট্যাং (Steve Tang) সিইও, ওরাসিউর (OraSure) বলছেন, আমরা মনে করি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রথম রাস্তা হল আপনি সংক্রামক নন এবং আপনার চারপাশের লোকেরা সংক্রামক নয়, তা নিশ্চিত করা, কোম্পানিটি বছরে কয়েক মিলিয়ন এইচআইভি এইডস অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করে এবং এখন কাজ করছে কোভিড -১৯ এর টেস্ট এর জন্য।

এদিকে, গের্ক (Gehrke) কেমব্রিজ ভিত্তিক বায়োটেক সংস্থা (E25Bio) এর  কো-ফাউন্ডার, যা কোভিড -১৯ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা নিয়ে কাজ করছে।

গের্কের মতে, কোভিড -১৯ টেস্ট মূলত ডেঙ্গু এবং জিকা পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত একইরকম বেসিক প্ল্যাটফর্ম। এই পরীক্ষাগুলো ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ নির্ভুল ছিল এবং কোভিড-১৯ এর জন্য তার প্রত্যাশা একই রকম তিনি বলেন যে এক্ষেত্রে প্রতিটি পরীক্ষার জন্য ১০ ডলার ব্যয় হবে; একটি পিসিআর পরীক্ষার পাঁচভাগের এক ভাগ এ ব্যয়। সংস্থাটি আশা করে যে যখন উৎপাদন শুরু হবে, তখন আমরা নিয়মিত এই লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার কিট উৎপাদন করতে পারব।

শ্বাসনালীর অবস্থা : নানা জনে নানারকম

এন্টিজেন টেস্ট নিয়ে যখন এত কথা হচ্ছে, তখন পিটসবার্গ মেডিকেল সেন্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিকাল পরীক্ষাগারের মেডিকেল ডিরেক্টর অ্যালান ওয়েলস (Alan Wells) বলেছেন, ‘আমি বলব কোভিড -১৯ এর অ্যান্টিজেন টেস্টিং দারুণ গেম-চেঞ্জার হবে। তবে একটা জায়গায় এটা সফল নাও হতে পারে।’

কিন্ত প্রশ্ন হচ্ছে কোথায় এটা সফল নাও হতে পারে? এন্টিজেন টেস্ট সাধারনত ব্যাকটেরিয়াজাতীয় জীবাণু শনাক্তকরণের জন্য ভাল কাজ করে। তবে করোনাভাইরাসের মতো শ্বাস প্রশ্বাসের ভাইরাসগুলো সম্পূর্ণ অন্য একটি বিষয়। একটি শ্বাসযন্ত্রের অসুস্থতার জীবাণুগুলো শ্বাসযন্ত্রের গভীরে থাকে। তাই টেস্টের জন্য আপনাকে নাকের ভেতর থেকে নমুনা নিয়ে ব্যবহার করতে হবে। তবে এই নাকের এ অঞ্চলে ভাইরাসের উপস্থিতি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিভেদে পরিবর্তিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ইনফ্লুয়েঞ্জার জন্য অ্যান্টিজেন টেস্টে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সংবেদনশীলতা থাকে কেবল বাচ্চাদের ক্ষেত্রে, কারণ শিশুদের মধ্যে ভাইরাসের পরিমাণ এখানে সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় অনেক বেশি। আপনি যখন প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে একই ইনফ্লুয়েঞ্জা অ্যান্টিজেন পরীক্ষা ব্যবহার করবেন তখন তার সংবেদনশীলতা (Sensitivity) ৫০ শতাংশ এরও কম হয়। 

পিসিআর পরীক্ষায় ভাইরাল জেনেটিক উপাদানটিকে কপি করা হয় যাতে কোভিড -১৯ এর লক্ষণ শনাক্ত করা সহজ হয়। অ্যালান ওয়েলস আরো বলছেন যে, ‘আমার এ ধারণা  ভুল হলেই আমি খুশি হব।’

সেই সাথে তিনি এও যুক্ত করেন যে, ‘তবে সন্দেহ হয় কোভিড -১৯ ভাইরাস অন্য ভাইরাস থেকে আলাদা হবে না। এটা ভাইরাসের জন্য নতুন জীববিজ্ঞান বা একটি নতুন রসায়ন নয়।’

অ্যান্টিজেন টেস্টিং এই যে, যেগুলি ৯০% এর উপরে সংবেদনশীলতা দেখাচ্ছে তা মূলত পরীক্ষাগারের নমুনাগুলোর উপর ভিত্তি করে। তবে প্রকৃত রোগীর নমুনা পরীক্ষার জন্য যা কম নির্ভুল হতে পারে।

গের্ক, ট্যাং এবং অন্যরা স্বীকার করেছেন যে  এই নতুন অ্যান্টিজেন পরীক্ষা যদি নির্ভরযোগ্য প্রমাণিতও হয়, তবে তা অবশ্যই পিসিআর টেস্টকে  প্রতিস্থাপিত করতে পারবে না। বরং পিসিআর এর পাশাপাশি থেকে এটা সমস্যাকে দূর করে প্রতিদিন ২০ মিলিয়ন আমেরিকান জনগোষ্ঠীর পরীক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে।

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0681 seconds.