• ২৮ এপ্রিল ২০২০ ২২:৫১:৫৬
  • ২৮ এপ্রিল ২০২০ ২২:৫১:৫৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

করোনাকালের হিরোইজম, ধানকাটা উৎসব আর সামাজিক পান্ডা

ফাইল ছবি


কাকন রেজা :


‘হিরোইজম’ বিষয়টি খুব আকর্ষণীয়। বিশেষ করে আমাদের স্বজাতির মধ্যে ‘হিরোইজমে’র একটি নেশা রয়েছে। একেবারে প্রমান দিয়ে দিই। সম্প্রতি ‘ধানকাটা’ নিয়ে শুরু হয়েছে এই ‘হিরোইজমে’র। কদিন ধরে গণমাধ্যমে ঢুকলেই ধানকাটার খবর।

কৃষকের ধান কেটে দিচ্ছে ‘অমুক’জনেরা, এমন খবরে সয়লাম গণ ও সামাজিকমাধ্যম। স্যুট-কোট-জুতা কিংবা সফেদ পাঞ্জাবি-পাজামা পড়ে কাঁচা ধান কাটার চিত্রও শোভা পাচ্ছে মাধ্যমগুলোতে। 

কেন এই ‘ধানকাটা’, এমন প্রশ্নের উত্তরে দেখবেন কোরাস কন্ঠে বলছে, ‘করোনাকালে কৃষকদের সহায়তা করার জন্য এমন উদ্যোগ।’ যদি তাদের বলি, আপনারা ধান কাটতে পারলে, কৃষি শ্রমিকরা কেন ধান কাটতে পারবেন না! ধান কাটার যে প্রক্রিয়া তাতে তো গা ঘেষে বসে শ্রমিকদের ধান কাটতে হয় না। ধান কাটতে গেলে না বললেও শারীরিক দূরত্ব বজায় থাকে। সুতরাং শ্রমিকদের ধান কাটতে অসুবিধা কোথায়! প্রতিবছর ধানকাটার মৌসুমের অপেক্ষায় থাকে দিনমজুরেরা। এটা তাদের উপার্জনের মৌসুম। সেই মৌসুমে যদি শহুরে বাবুরা ধানকাটার নামে মচ্ছব করেন, তবে সেই গরীব বেচারাগণ যায় কোথায়। করোনার মধ্যে যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা খোলা যায়, তবে ধান কাটা যাবে না কেন? প্রশ্নটা জরুরি, অথচ এ পর্যন্ত কারো মুখে উচ্চরিত হতে শুনলাম না! গরীব দিনমজুররা কেন তাদের কামাইয়ের মৌসুম হারাবে এমন কথাও বললেন না কেউ! পোশাক কারাখানার চেয়ে অন্তত মাঠে শারীরিক দূরত্ব বজায় থাকে বেশি। সবচেয়ে বেশি ভালো হতো সরকারের কৃষি অধিদপ্তর করোনাকালে যা অনেকটাই বেকার বসে আছে, তারা দিনমজুরদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাঠে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করতো। অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তা রয়েছেন তাদের এসব তদারকির ভার দেয়া হতো। এর ফলে কৃষকরাও বাঁচতো, দিনমজুরদেরও রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা হতো। তা না করে শুরু হয়েছে ‘হিরোইজম’। ধানকাটার নামে ‘ফটো উৎসব’। 

‘ফটো উৎসবে’র ঠেলায় ‘হিরোইজম’ যেখানে দেখানো দরকার সেখানে এই হিরোদের খোঁজ নেই। করোনায় আক্রান্ত মৃতদের দেহ সিঁড়িতে পরে থাকে, রাস্তায় মুখ থুবড়ে থাকে, কেউ ছোঁয়া তো দূরের কথা, কাছে যাবারও নেই। শেষ পর্যন্ত পুলিশ, প্রশাসন বা মারকাজুল ইসলামের লোকদের এসে দাফন করতে হয়। তখন কারো দেখা মেলে না! তখন ‘ফটো উৎসব’ নেই। দু’একটা ব্যতিক্রমের মধ্যে দেখলাম নারায়নগঞ্জের এক কাউন্সিলরকে। খোরশেদ নামের এই মহান মানুষটি তার লোকজন নিয়ে করোনায় মৃত মানুষদের দাফন করে চলেছেন। এমনকি হিন্দু ব্যক্তিরও সৎকার করছেন তিনি। 

ইসলাম বা যে কোন ধর্মই মৃতদের অসম্মান করতে নিষেধ করেছে। সেই মৃতদেরই নাকাল হতে হচ্ছে করোনাকালে প্রতিনিয়ত। এখানে ধানকাটার সেই ‘হিরো’ কামলাদের কারো দেখা মেলে না। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো পরিষ্কার জানিয়েছে, মৃতদেহ থেকে ভাইরাস ছড়ায় না। শুধুমাত্র গোসল করানোর সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। তারপর কাফন করার পর, আর কোনো ভয় থাকে না। আর কবর থেকে ভাইরাস ছড়ানোর তো প্রশ্নই উঠে না। মৃতদেহ দাফন বা সৎকার থেকে ভাইরাস ছড়ানোর কোনো প্রমান এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তারপরেও এক্ষেত্রে ‘হিরোইজম’ দেখাতে কেউ আসেন না। এখানে হিরোদের হিরোগিরি জিরো। 

যেটা বলছিলাম। কৃষি অধিদপ্তরের ধানকাটা নিয়ে এ সময়ে একটা গাইড লাইন জরুরি ছিলো। তাদের জানানো উচিত ছিলো, মাঠে ধান কাটতে গেলে ভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাবনা নেই। কারণ ধানকাটার সময় শারীরিক দূরত্ব এমনিতেই বজায় থাকে। যেহেতু নির্দিষ্ট পরিমান জমিতে, মজুর নির্দিষ্ট পরিমানই লাগে। আর সে অনুযায়ী শারীরিকভাবে কাছে আসার সুযোগ নেই। বরং যারা ধানকাটা উৎসবের নামে ‘হিরোইজম’ দেখাতে যাচ্ছেন, তারাই ভীড় করে ধান কাটছেন। দিনমজুরদের ধানকাটা নিয়ে বিপদের সম্ভাবনা না থাকলেও এই সোকল্ড ‘হিরো’দের বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, হিরো হওয়ার জোশে তাদের শারীরিক দূরত্বের বালাই থাকছে না। অতএব কৃষি দপ্তরের দ্রুত এ ব্যাপারে কথা বলা উচিত। যাতে কৃষক আর মজুররা বেঁচে যায়। সাথে বেঁচে যায় সেই ‘হিরো’রাও। 

এর আগে সামাজিক পান্ডাদের অত্যাচার নিয়ে লিখেছিলাম। এলাকায় কেউ করোনা আক্রান্ত, পান্ডারা ফরমান জারি করলেন, আক্রান্ত রোগী বা পরিবারের কেউ এলাকায় থাকতে পারবে না, তাদের এলাকা ছাড়তে হবে। অনেক জায়গায়, করোনা আক্রান্ত বা আক্রান্ত সন্দেহে বাড়িঘরে পর্যন্ত আক্রমন করা হয়েছে, ভাংচুর করা হয়েছে। একদিকে রোগ অন্যদিকে এসব সামাজিক পান্ডাদের অসভ্য অত্যাচার, দুয়ে মিলে রোগী এবং তার পরিবার মরার আগেই মরে যাবার অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। এমনকি টেলিভিশনে কাজ করা ঢাকার করোনা আক্রান্ত এক খবরকর্মীও জানিয়েছেন এমন অভিজ্ঞতার কথা। এসব পান্ডাদের যন্ত্রণাতেই বেশির ভাগ রোগী তাদের রোগের লক্ষণ লুকিয়ে রাখছেন। বলতে গেলে সামাজিক পান্ডাদের হাতে নিগৃহিত হবেন এমন ভয়েই তারা উপসর্গ লুকিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসা নিতে। ফলে তাদের দ্বারা চিকিৎসকরা আক্রান্ত হচ্ছেন, স্বাস্থ্য সেবার বারোটা বাজছে। অনেকে দেখেছি আক্রান্তদের উপসর্গ লুকানোর ব্যাপারে দোষ দেন। আরে ভাই, দোষ আক্রান্তদের নয়, ওই সামাজিক পান্ডাদের। যারা আক্রান্ত বা আক্রান্ত সন্দেহে এলাকা ছাড়তে বলে। যে বাড়িওয়ালা তাদের বাসা থেকে তাড়িয়ে দিতে চান। দায়ি তারা। 

এই সামাজিক পান্ডা নামক অসভ্যদের অসভ্যতার আরেকটি উদাহরণ দিই এবং তা গণমাধ্যম হতেই। যা ইতোমধ্যেই অনেকের নজরে এসেছে। গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ার একটি ঘটনা। বাড়িতে গিয়েছেন ঢাকার একটি হাসপাতালে কর্মরত এক নারী স্বাস্থ্যকর্মী। সেখানের এক সামাজিক পান্ডা ফরমান জারি করলেন, তাকে কোয়ারান্টিনে রাখতে হবে। আর সেই কোয়ারান্টিন হবে এক নির্জন পুকুরপাড়ের ঝুপড়ি ঘরে। যেই বলা সেই কাজ, খুঁজে পেতে এক নির্জন পুকুড়পাড়ে তালপাতার ঝুপড়ি বানিয়ে দেয়া হলো। সেই নারীকে বাধ্য করা হলো রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে সেখানে থাকতে। কী ভয়াবহ অসভ্যতা, কী ভয়ানক পান্ডামি! এমন অবস্থা বা পরিস্থিতিতে কেন আক্রান্তরা উপসর্গ লুকাবে না বলতে পারেন? এ ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে শক্ত হতে হবে। এসব সামাজিক পান্ডাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। না হলে দেশে আরো চিকিৎসক আক্রান্ত হবেন। রাস্তাঘাটে মানুষের মৃতদেহ পড়ে থাকবে। একই সাথে চাপ পড়বে পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর। 

এমনিতেই আমাদের চিকিৎসা সেবা প্রয়োজনের তুলনায় অসম্ভব রকম অপ্রতুল। যে সব রোগীর মৃদু উপসর্গ রয়েছে। যারা ঘরে থেকে ভালো হওয়ার যোগ্য তারাও এই পান্ডাদের অত্যাচারে হাসপাতালে ভীড় করবে। গুরুতর রোগীরা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবেন। এ অবস্থা থেকে আক্রান্তদের বাঁচাতে, সাথে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর চাপ কমাতে সরকারকে এখনি কঠোর হতে হবে। এসব সামাজিক পান্ডাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তবেই যদি আক্রান্তরা নিজেদের উপসর্গের কথা জানায়। বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিতে সাহস পায়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0695 seconds.