• ২৯ এপ্রিল ২০২০ ০০:২২:৪৭
  • ২৯ এপ্রিল ২০২০ ০০:২২:৪৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘আমাদের জীবনের একটু মূল্য দেবেন না?’

ডা. মারুফ রায়হান খান। ছবি : সংগৃহীত


ডা. মারুফ রায়হান খান :


-ইসিজি দেখে মনে হচ্ছে আপনার বাবার আরও ২-৩ দিন আগেই হার্ট এটাক হয়েছে।
-জি স্যার, আব্বার ব্যথা আরও ২ দিন আগে থেকেই।
- তো আরও আগে নিয়ে এলেন না কেন? তাহলে তো আরও উন্নত চিকিৎসা দিতে পারতাম।
- স্যার, 'মাইনশে' বলে এখন কোনো ডাক্তার নেই। হাসপাতালে গিয়ে লাভ নেই।
- এসে কী দেখলেন? ডাক্তার আছে?
- জি স্যার আছে তো।

আচ্ছা এই 'মাইনশে'গুলো কারা আসলে? এতো অযাচিত, মিথ্যে, কল্পনাপ্রসূত ভুলেভরা কথাগুলো তারা কেনই বা বলেন? এই যে এই সাদামাটা লোকটাকে যে বিভ্রান্ত করা হলো, শুধু সময় বিলম্বের জন্যে তার বাবাকে অনেক উন্নতমানের ইনজেকশানটি দেওয়া সম্ভব হলো না--এই দায়ভারটি কে নেবে? এই রোগীটি যদি মারা যেতেন বা এখন যদি মারা যান? সেই মানুষগুলো দায়ভার নেবে? কেন আমাদের সব বিষয়ে মন্তব্য করতেই হবে? যে বিষয়টি আমরা জানি না, বুঝি না, সে বিষয়ে কেন আমরা চুপ থাকতে পারি না? শুধু 'মাইনশের' কথার কারণে কতো রোগীর যে কতো ক্ষতি হলো তার চাক্ষুষ উদাহরণ অজস্র।

আচ্ছা এরাই কি সেই মানুষগুলো যারা ইতিহাস গোপন করে চিকিৎসকদের কাছে এসে তাকেও আক্রান্ত করে দেন? একটা তথ্য দিলে বিশ্বাস করতে চাইবেন না। ডেইলি স্টারে এসেছে, ময়মনসিংহ বিভাগে করোনায় ১০৮ জন আক্রান্ত, তারমধ্যে ৭৮ জনই চিকিৎসক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী। ৭২%! কাল যুগান্তরে এসেছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন কর্মরত ২৭ জন চিকিৎসক, ১৩ জন নার্স ও ৩২ জন স্টাফ।

একজন মানুষ যখন চিকিৎসা নিতে আসে, চিকিৎসক কল্পনাও করতে পারে না ইনি মিথ্যে বলতে পারেন। সরলমনে চিকিৎসা দেন, পরবর্তীতে জানা যায় তিনি করোনার রোগী অথবা করোনার মতো উপসর্গ, পরবর্তীতে টেস্ট করলে করোনা ধরা পড়ে। আপনারা সবাই হয়তো ইতোমধ্যে জানেন গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে এক কোভিড পজিটিভ রোগী মিথ্যে তথ্য দিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেলের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে এক বিতিকিচ্ছিরা অবস্থা করে ফেলেছিলেন। এমন রোগী প্রায়ই আসছেন। অথচ আলাদা একটি হসপিটালই আছে এসব রোগীদের জন্য। তারা সে হসপিটালে যেতে চান না। নানা হুমকি দেন।

স্বাস্থ্যকর্মীদের বলা হয় সুপারস্প্রেডার। অর্থাৎ তারা যদি আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তারা অজান্তেই আক্রান্ত করবেন আরও অনেক মানুষকে। অন্তত আপনার সুস্থ থাকার জন্যে হলেও আপনার উচিত মানুষকে সচেতন করা। যেন তারা ইতিহাস/লক্ষণাদি না লুকায়। নইলে সে যে ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নেবে, সেই ডাক্তারের কাছে আপনি বা আপনার আপনজন কেউ গেলে সেও আক্রান্ত হবে।

কয়দিন আগে ময়মনসিংহের একটু রুরাল এরিয়ায় যেতে হয়েছিল। বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, মহিলাগুলো দল বেঁধে গল্প করছে, ছেলেরা দল বেঁধে ক্রিকেট খেলছে--কারও মুখে কোনো মাস্ক নেই। দেশে যে একটা মহামারী চলছে তাদের কোনো খেয়াল নেই। আমি মোটামুটি দৌড়ে পালিয়েছি। ওয়ার্ডে আসুন, এখনও আপনাকে আমি প্রতি রোগীর সাথে ৩/৪/৫ জন করে মানুষ দেখাতে পারব। কারও ভয় নেই। উনারা আক্রান্ত হন, সেইসাথে আক্রান্ত করেন চিকিৎসকদের। কয়দিন পর চিকিৎসক খুঁজে না পাওয়া গেলে কী হবে?

ছবিতে পানির বোতলটা দেখছেন। সারাদিন রোজা রেখে চাইলেও খুব একটা পানি খাওয়া যাচ্ছে না। মেপে খেতে হচ্ছে। কারণ চিন্তার বিষয় পানি খাবার পরের  কনসিকোয়েন্সটা...পিপিই যতো ডনিং-ডফিং করতে হয় ততোই আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বাড়ে। এই যে সারাটিদিন এতো কষ্ট করি, হসপিটালে বসে ইফতার করি, যখন ডাকেন তখনই পান...এতোসব কাদের জন্য করি? আপনার জন্যেই তো, আমার কোনো স্বজন তো অত্র বিভাগেও থাকেন না। আমাদের জীবনের একটু মূল্য দেবেন না?

লেখক : হৃদরোগ বিভাগ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0702 seconds.