• ৩০ এপ্রিল ২০২০ ১৫:৩০:৩৭
  • ৩০ এপ্রিল ২০২০ ১৫:৩০:৩৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

দুর্ভিক্ষ ঠেকাবেন কেমনে?

ছবি : সংগৃহীত


খন্দকার আরিফ :


গত শতাব্দিতে মাত্র ত্রিশ বছরের ব্যবধানে দুটি দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে হয়েছিলো এই ভূখন্ডকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে জাপান মিয়ানমার দখল করে নিলে ব্রিটিশ সরকার সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং তড়িঘড়ি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

মধুশ্রী মুখার্জী তাঁর চার্চিলস সেক্রেট ওয়ার বইটিতে লিখেছেন যে এসময় সেনা এবং যুদ্ধে নিয়োজিত মানুষদের জন্য বেশি বেশি করে খাদ্য মজুত করতে শুরু করে ব্রিটিশ সরকার। শুধু তাই নয় জাপান ভারত দখল করে নিলে খাদ্য যাতে শত্রুর হাতে না পৌঁছায় এ জন্য বাংলাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গরুর গাড়ি এবং নৌকাগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

ফল হিসেবে ১৯৪৩ নেমে আসে বাংলার বুকে। পরিত্রাণ পাবার পথ আগেই রুদ্ধ করে রাখা হয়েছিলো। খাদ্যাভাব, অপুষ্টি,ডায়েরিয়া এবং ম্যালেরিয়ায় প্রায় ২.১ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়।

টাইম ম্যাগাজিনের মতে ১৯৭৪ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলমান দুর্ভিক্ষে মৃত্যুবরণ করেছিলো ১ থেকে ৪ লক্ষ ৭৫ হাজার মানুষ। অবশ্য সরকার মাত্র ২৭ হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছিলো। পন্ডিতগণ গবেষণা করে দেখিয়েছিলেন, গড় শস্য উৎপাদন সর্বোচ্চ হলেও শুধুমাত্র বিতরণ ব্যর্থতার কারণে ওমন একটি দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হতে পেরেছিলো।

চলতি মাসের মাঝামাঝিতে জাতিসংঘ বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষের হুশিয়ারি দিয়েছে। বিগত দুর্ভিক্ষগুলোর সাথে আসন্ন দুর্ভিক্ষের প্রাধানতম পার্থক্যটি হলো, আগের দুর্ভিক্ষগুলো সংঘটিত হয়েছিলো বিশ্বের নির্দিষ্ট একটি ভৌগোলিক এলাকায় ফলে বাকি দুনিয়া সংকট থেকে উত্তরণে এগিয়ে আসতে পেরেছিলো কিন্তু এবারের সংকট বিশ্বব্যাপী, ছোটো দেশ বড় দেশ, ধনী দেশ গরীব দেশ কেউই সংকটের বাইরে নয়। ইতোমধ্যে বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলো ক্রমশ বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি ব্রিটেন জিডিপিতে ধস নামার কথা অকপটে স্বীকার করেছে।

আর বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে আমাদের অর্থনীতি সম্পর্কহীন নয়। দেশে দেশে লকডাউনের ফলে কলকারখানা, যানবাহন সবকিছু বন্ধ। তেলের বাজার নিন্মমুখী। তেল নির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোতে আমাদের প্রচুর শ্রমিক রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এমন স্থবির পরিস্থিতি বিরাজমান থাকলে তারা শ্রমিক ছাঁটাই করবে নিশ্চিত। ইতোমধ্যে কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে। এই শ্রমিকরা কিন্তু আমাদের অর্থনীতির অন্যতম একটি স্তম্ভ। এটি ভেঙে পড়লে তা আমাদের অর্থনীতির জন্য করুণ পরিণতি বয়ে আনবে। উপরন্তু দেশের ভেতরের গার্মেন্টস, ছোটো বড় শিল্প কারখানা এনজিও, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ের পথ বেছে নিবে নিশ্চিত। বেশ কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, করোনা চলাকালীন সময় থেকে শুরু করে করোনা পরবর্তী সময় পর্যন্ত এদেশের ১ কোটি মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়তে পারে। সত্যি সত্যি এমন ঘটলে হিসেবের খাতা আরো ভারী হবে। এ কোটি মানুষই তো নয়, তাদের উপর নির্ভরশীল পরিবার পরিজনের হিসেব ধরলে তা ৫ কোটির নিচে আসবে না। এই বিপুল পরিমাণ মানুষের জন্য রাষ্ট্র কতখানি প্রস্তুতি রেখেছে তা খতিয়ে দেখা দরকার।

এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে সময়। অর্থাৎ ঠিক কতদিন ধরে এই মহামারি বিরাজমান থাকতে পারে এবং মহামারী পরবর্তী সময়ে সংকট কতদিন ধরে হাজির থাকতে পারে। এর সঠিক উত্তর দিতে গেলে করোনার প্রতিষেধক কার্যকর হচ্ছে কবে সেই হিসেবটি গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলে যদি ধরে নিই ৬ কোটি মানুষকে প্রত্যক্ষভাবে ১ বছরের খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদানের প্রস্তুতি রাখতে হবে, সেক্ষেত্রে আমাদের রাষ্ট্র কতখানি প্রস্তুতি রেখেছে?

আশা করা যায় ১৯৭৪ এর মতো এবারও হয়তো শস্যের ভালো ফলন হবে, সরকার নাকি হয়তো কিছু খাদ্য মজুদও রেখেছে তবে সঙ্গত কারণে প্রশ্নটা রাখা দরকার -এই খাদ্য সহায়তা পদ্ধতিমাফিক উদ্দিষ্ট মানুষজনের হাতে পৌঁছাবে কিনা। ইতোমধ্যে ত্রাণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠছে, মাটির ভেতর থেকে, পুকুরের তলদেশ ত্রাণের চাল মিলেছে, টেলিভিশন খুললেই চুরি লুটপাটের খবর মিলছে প্রতিনিয়ত। আবার খেতে না পাওয়া মানুষজনদের আত্নহত্যার খবরও গোপন রাখা যায়নি।

তবে কি আমরা চুয়াত্তরের পথেই যাত্রা করেছি, এবারো কি অমর্ত্য সেন সত্যি হয়ে উঠবেন - ‘খাদ্যের অভাবে পৃথিবীতে দুর্ভিক্ষ হয়নি, হয়েছে সুষম বন্টনের অভাবে।’

লেখক : সমাজকর্মী

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0774 seconds.