• ০১ মে ২০২০ ১৪:১১:৪৪
  • ০১ মে ২০২০ ১৪:১১:৪৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
সংশ্লিষ্ট মহান মে দিবস আজ
বিজ্ঞাপন

যখন নয়ন অন্ধ হয়, যখন বক্ষ লাফিয়ে ওঠে


ডা. পলাশ বসু :


আজ মহান মে দিবস। শ্রমজীবী, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের এই একটি দিন-যাকে তারা নিজের মনে করে নিতে পারে। বছরের আর বাকি ৩৬৪ দিনই হচ্ছে তাদের জন্য শোষণ ও বঞ্চনার দিন। তার মানে যদি কেউ মনে করেন যে তাহলে এ দিনে কি তারা সবকিছু পেয়ে যায়? উত্তর হচ্ছে, না -পেয়ে যায় না।

তবে এ দিনে অন্তত তারা আবার নতুন করে ভাবতে শেখে যে তাদেরও কিছু অধিকার আছে। তাদের শ্রম ও ঘামের কিছুটা হলেও মূল্যায়ন হওয়া দরকার। এ দিবসের প্রাপ্তি যদি বলেন তাহলে এখন অতটুকুতেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। হয়ত সে অর্থে এটা কোন প্রাপ্তিই নয়-এভাবেও ভাবা যেতে পারে। আবার এই যে চেতনার অন্তর্গতবোধ এটা যে এখনও টিকে আছে-এক সময় এই বোধই যে আবার তার স্বরূপে ফিরে আসবে না-সেটা কি কেউ আগাম বলতে পারে?

এটা ঠিক, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় আসলেই শ্রমিকের মুক্তি মেলে না। কারণ এ ব্যবস্থাটাই মুনাফা তৈরির জন্য এক অনন্য হাতিয়ার হিসেবে গড়ে উঠেছে। যদিও গণতন্ত্র নামক ছাতার আড়ালে অনেক রাষ্ট্র দেখাতে চায় যে তারা মেহনতি মানুষের পাশে আছে। নানা ধরণের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে, ভোটাধিকার দিয়ে তাদেরকে দেখাতে চায় যে তারা গণমানুষের পাশে আছে। এভাবে তারা তাদেরকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে। সফলও হয় তাতে। আর এভাবেই নিপীড়িত মানুষের বঞ্চনা চলতেই থাকে। কিন্তু তাদের সে অর্থে করার কিছু থাকে না।

মেহনতি মানুষের সমাজ তথা শোষণহীন সমাজও যে হতে পারে, একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা যে এভাবে গড়ে উঠতে তা লিখিতভাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন কার্ল মার্কস। যা ‘কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো’রূপে পরিচিতি লাভ করে। সেই আলোকে আসে অক্টোবর বিপ্লব।

আর এ অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমেই কায়েম হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন; একটা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। সেই সাথে নতুন নতুন দেশে এ আন্দোলন বেগবান হয়ে ওঠে। যদিও গত শতকের ৯০ দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। তার ফলে নিপীড়িত মানুষের আশার বাতিঘর অনেকটাই নিভে গেছে বলে অনেকেই মনে করে থাকেন।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে ঠিকই কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের দাবি কি থেমে গেছে? বিদ্যমান শোষন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সত্যিকারের মানবতাবাদী সমাজ তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপট কি বিদ্যমান নেই এখনও?

সে যাই হোক, আজ মহান মে দিবস। আমরা কার্ল মার্কসকে শুধুই বিপ্লবী রাজনীতিবিদ হিসেবে মনে করে থাকি। কিন্তু এ মানবতাবাদী মানুষটির ভেতরেই লুকিয়ে ছিলো অন্য একজন সাহিত্যিক মার্কসও। শুরুর জীবনে লিখেছেন কবিতা, উপন্যাস, নাট্যকাব্য প্রভৃতি। যদিও পরে নিজে আর সাহিত্য রচনায় প্রবৃত্ত থাকেননি। কেন থাকেননি সেটা আলাদা আলোচনার বিষয়। আপাতত আজ সেদিকে আর না যাই। তবে, এতটুকু জানিয়ে রাখি তিনি তার চিঠিপত্রে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কবিদের কবিতার উদ্ধৃতি দিতে কার্পণ্য করতেন না।

মহান এই মে দিবসে শ্রমজীবী, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি কার্ল মার্কস এর অর্ধ ডজন কবিতা।

১.
অন্তরে দুর্বহ বোঝা
অন্তর্দৃষ্টি কিন্তু স্বচ্ছ হল
অস্পষ্ট আমার বাসনা
অবশেষে মূর্ত হল তোমাতে

জীবনের বন্ধুর কন্টকিত পথে
যা পারিনি আনতে হাতের মুঠোয়
তা এলো অযাচিত আমার কাছে
তোমার মদির দৃষ্টিতে।

২.
মনের উদ্যমের মতো মহান শক্তিকে,
পৃথিবীর মতো যা অনন্ত
তাকে কী করে রূপ দেবে শুধু শব্দ,
ধোঁয়ার মতো বংকিম রেখায় ভেসে-চলা এই শব্দ?

৩.
হৃদয়কে যা জাপটে ধরে কঠিন শক্তিতে
ধীরে সুস্থে তার মোকাবিলা পারব না কখনো,
অস্থির অশেষ যাত্রা
এগিয়ে যেতে হবে দ্বন্দ্বে পথ করে।
যা কিছু অনবদ্য, যা কিছু সুন্দর
আমার জীবনে আনব
ভেদ করব বিজ্ঞানের জগত
শিল্প ও সংগীতের রসে হব মুখর।

৪.
সাধ্য সীমার পরোয়া না করে চল,
সংঘাত থেকে হটা কখনো নয়
ইচ্ছাশক্তি বর্জিত স্থবিরের মতো
বেঁচে থাকা কখনো নয়।

যন্ত্রণা আর খাটুনির জোয়ালে
শান্তভাবে কাঁধ গলানো? ধিক!
যা হবার হোক, আমাদের কাছে
আশা, আকাঙ্খা, কর্ম ও প্রয়াস।

৫.
সুতরাং আমরা সর্বদা সাহসী ভীষণ,
থামিনা কখনো, বিশ্রাম নেই কোন:
বেশি সাবধানী জড়তা কখনো নয়
যে প্রতিবাদ করেই নিঃশেষ হয়ে যাব,

আমরা কি মুরগির ওম দেবার মতো ধ্যানস্থ কবি তৈরি করবো
সংহতি স্বীকার করতে?-না তা কখনোই নয়
কারণ, চাহিদা ও কার্যক্রমের স্বরূপ বুঝতেই হবে
এরা আমাদের সঙ্গী চিরকাল।

৬.
আমি কী বাজাচ্ছি, মশায়! ঢেউ কী গর্জন করে
যখন তারা বজ্রনাদে ভাঙে পাহাড়ে
যখন নয়ন অন্ধ হয়, যখন বক্ষ লাফিযে ওঠে
যখন আত্মা গড়িয়ে যায় নরকের দিকে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0832 seconds.