• ০১ মে ২০২০ ১৮:০৬:২৬
  • ০১ মে ২০২০ ১৮:০৬:২৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

মে দিবসের নতুন ইতিহাস, মাস্ক ও পিপিই আর কিট বনাম কীট

ফাইল ছবি


কাকন রেজা :


এক. 

মে দিবস নিয়ে লিখার ইচ্ছা নেই। আপনি সেখানেই লিখতে পারেন, যেখানে উপলব্ধি ব্যাপারটা থাকে। উপলব্ধির জায়গাটা যখন লেজুরবৃত্তি আর স্তাবকতার জায়গায় পৌঁছে সেখানে তখন লেখাটা অর্থহীন হয়ে উঠে। বিষয়টার সাথে কোভিড নাইনটিন পরিস্থিতির যথেষ্ট মিল রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এক চিকিৎসক কোভিডে আক্রান্ত মানুষের লাশের সারি দেখে মানসিক ট্রমায় পৌঁছেছিলেন এবং তিনি আত্মহত্যা করেছেন। কারণ তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই অসহায়ত্ব মেনে নিতে পারছিলেন না। আমরা যারা সত্যিকার অর্থেই লিখছি, লেজুরবৃত্তি বা স্তাবকতার বাইরে থেকে, তাদের অবস্থাও সেই চিকিৎসকের মত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরাও যাচ্ছি ট্রমার মধ্যে দিয়ে। 

মে দিবস যে কারণে, সে কারণে সেই সময় শিকাগোতে হাজারো শ্রমিক মারা যাননি। আমি মে দিবসের ইতিহাস ঘাটতে বসিনি, যখন চোখের সামনে আরেকটি ইতিহাসের হাতছানি দৃশ্যমান তখন অতীত ইতিহাস টানতে মন চায় না। একটা মহামারির ভেতর দিয়ে আমরা যাচ্ছি। যে রোগের কারণে এই মহামারি তার কোন ওষুধ নেই, সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। কে বাঁচবে তাও বলা সম্ভব নয়। বলা হচ্ছে শারীরিক দূরত্ব মানা ছাড়া এ রোগের সংক্রমণ এড়ানোর আর কোন উপায় নেই। সারাদেশে স্কুল-কলেজ বন্ধ, পার্ক-সিনেমা হল এমনকি উপাসনালয়ের দরোজাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অথচ খোলা রাখা হয়েছে কারখানার দরোজা। সবাইকে বাঁচানোর গরজ আছে, শ্রমিকদের বাঁচানোর গরজ নেই! আলেকজান্ডারের বলা ‘বিচিত্র এই দেশে’ শ্রমিকরা গিনিপিগ হয়ে উঠছে।

হ্যাঁ, হার্ড ইমিউন সৃষ্টি হলে, নাকি মহামারির প্রকোপ চলে যায়। আর এই হার্ড ইমিউন মানে হলো আশি ভাগ লোক আক্রান্ত হওয়া। তারমধ্যে মরে-টরে যতজন থাকে, তারাই হার্ড ইমিউনের অধিকারী। উপরতলার লোকদের মেরে-ধরে তো আর হার্ড ইমিউনিটির ধারণা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, সুতরাং গিনিপিগ বানানো হোক শ্রমিকদেরই। তাদের কারখানা খুলে দেয়া হোক। উপরতলার মানুষদের টাকা বানানোর মেশিন চালু থাক। আর সেই মেশিন চালুর উৎসবে যাক না প্রাচীন কালের মতন কিছু নরবলি, অসুবিধা কী।

যখন হাজারো শ্রমিকের আহুতি যজ্ঞের সূচনা করা হয়েছে সেখানে সেই পুরাতন ‘মে’র গুটিকয়েক মৃত্যুর হিসাব টেনে আনার কী দরকার। আমরা নতুন ‘মে দিবসে’র দ্বারপ্রান্তে। আমরা সব ইতিহাসই নতুন করে লিখতে চাই। চুরি-চামারি, লুটপাট থেকে মৃত্যু- সব।

দুই.

মুগদা হাসপাতালের পরিচালক এবং অন্য হাসপাতালের আরেকজন পরিচালককে বদলি করা হয়েছে। সম্প্রতি তারা মাস্কসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এমন প্রশ্ন তোলাকেই তাদের বদলির সম্ভাব্য কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। গণমাধ্যমের শিরোনামগুলোতেই যার প্রমাণ মেলে। একটি শিরোনাম শুধু তুলে দিই, ‘মাস্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সরকারি হাসপাতালের দুই পরিচালকের বদলি’। 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারা বিশ্বে চিকিৎসকদের আক্রান্ত হবার হার বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। আমার ময়মনসিংহ বিভাগ নিয়ে প্রথম আলো’র শিরোনাম ছিল, ‘ময়মনসিংহে করোনা আক্রান্তদের ৭৪% ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী’। এ থেকেই দেশে চিকিৎসকদের অবস্থা বোঝা যায়। আর এর জন্য দায়ি করা হয়েছে চিকিৎসকদের জন্য সরবরাকৃত সুরক্ষা সামগ্রীকে। কথা উঠেছে মাস্ক ও পিপিই নিয়ে।

আমি নিজে বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের সাথে কথা বলেছি, তারাও একই কথা বলেছেন। অভিযোগ রয়েছে যেসব পিপিই দেয়া হয়েছে সেসবের অবস্থা এমনই যে, বসতে গেলে তা ফেটে যায়। আর মাস্কের কথাতো সবারই জানা। এন ৯৫ এর জায়গায় বিস্ময়কর ‘ভুল’ করে আসে কাপড়ের মাস্ক। অথচ এ নিয়ে কথা বলা যাবে না। বললেই বদলি। তাও যে সে জায়গায় নয় পাবনা মানসিক হাসপাতালে। 

কী ভয়াবহ অবস্থা। আপনি যুদ্ধে নামবেন এমন বর্ম নিয়ে যা সামান্য আঘাতেই এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাবে। পরিণতি মৃত্যু জেনেও আপনাকে যুদ্ধ করে যেতে হবে। এমন যুদ্ধ হলে তো পরাজয় নিশ্চিত। সাথে অনিশ্চিত সৈনিকের বেঁচে থাকা। অথচ আপনি এর প্রতিবাদও করতে পারবেন না। বলতে পারবেন না, যুদ্ধে আমরা যাবো কিন্তু আমাদের সুরক্ষার সঠিক বর্ম দাও। এমন প্রতিবাদে আপনাকে শূলে চড়ানো হবে। সত্যিই আবার বলতে হয় আলেকজান্ডারের কথা, ‘কী বিচিত্র এই দেশ!’ এখানে যুদ্ধে যেতে হয় পরাজয় জেনে, মৃত্যুকে ভবিতব্য মেনে! 

তিন. 

কিট বনাম কীটের লড়াইতো এখন দৃশ্যমান। ইউরোপ র্যা পিড টেস্টিং কিটের স্বীকৃতি দিয়ে পরীক্ষা শুরু করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ফার্মেসিগুলোতে র‌্যাপিড টেস্টিং কিটের মাধ্যমে পরীক্ষা শুরু করতে বলেছে। ভারততো আগেই শুরু করেছে। ইউরোপের স্বীকৃত গবেষণা বলছে, অ্যান্টিবডি পরীক্ষার ৯৯ ভাগ সফলতার কথা। বিপরীতে আমাদের দেশের চিত্র সবারই জানা। 

আফ্রিকার দরিদ্র এক দেশ সেনেগাল। অথচ তারা করোনা নিয়ন্ত্রণে আশ্চর্যরকম সফলতা পেয়েছে শুধুমাত্র র‌্যাপিড টেস্টিং কিট ব্যবহার করে। ভিয়েতনামের র‌্যাপিড টেস্টিং কিটের সফলতা দেখে তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ইরানতো আগে থেকেই ব্যবহার করছে। আমাদের দেশের গণস্বাস্থ্য উদ্ভাবিত কিট অন্যান্য দেশের উদ্ভাবিত কিটের চেয়ে আরো অগ্রসরমান এমনটাই দাবি করা হয়েছে। অথচ অদ্ভুত সব অজুহাতে আটকে রয়েছে এই কিট দিয়ে পরীক্ষা শুরুর প্রক্রিয়া। এমনও হতে পারে আমাদের আগে অন্য দেশে এই কিট দিয়ে পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে। আমরা চাই না এমনটা হোক। চাই না, আলেকজান্ডারের মতন আবারও বলতে হোক, কী বিচিত্র এই দেশ।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামনিস্ট। 

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কাকন রেজা মে দিবস

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0655 seconds.