• ০২ মে ২০২০ ২০:৩৭:০২
  • ০২ মে ২০২০ ২০:৩৭:০২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে বাজেট সুষ্ঠু বন্টন ব্যবস্থাপনার লাগাম কাদের হাতে

ছবি : সংগৃহীত


জাহানুর রহমান খোকন :


১.
বাংলাদেশের মধ্যে সম্পদ সুষ্ঠু বন্টন ব্যবস্থাপনার চিত্র সেই মান্ধাতার আমলের। এই ইতিহাস আমাদের প্রায় সকলের জানা যে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে ভাষাগত ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ করতে থাকে।

যার প্রেক্ষিতে ১৯৬১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান 'বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই' শিরোনামে একটি ধারাবাহিক প্রকাশের ব্যবস্থা করেন এবং আঞ্চলিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণা করেন। যার অবশ্যম্ভাবী ফল আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার চার দিন দশক পরেও উত্তরবঙ্গ-দক্ষিণবঙ্গ তথা ঢাকা কেন্দ্রীক আঞ্চলিক বৈষম্যের ভেদাভেদের শিকড় এখনো উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি। ৭১ শতাংশ গরীব মানুষের বসবাসের উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম জেলে এরকমই আঞ্চলিক বৈষম্যের শিকার।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত ২০১৬ সালের আয় ব্যয়ের জরিপের তথ্যমতে, কুড়িগ্রাম জেলায় ৭০ দশমিক ৮৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। যা ২০১৪ সালের জরিপে ছিল ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। যেখানে সারা দেশের দারিদ্র‍্যের হার ৭.৪৭ শতাংশ কমেছে। সেখানে কুড়িগ্রাম জেলার দারিদ্রসীমার চিত্র চলছে পিরামিডের উলটোপথে। ঊর্ধ্বগতিতে। এ অবস্থার কারণ কী?

অর্থনীতিবিদদের মতে, সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে দেশের সব অঞ্চলে সমান উন্নয়নের কথা থাকলেও দীর্ঘকাল ধরে অবহেলার শিকার হয়েছে দেশের কোনকোন অঞ্চল। যখন যে অঞ্চলের মানুষ রাষ্ট্রক্ষমতার মূল পদগুলোতে জায়গা পেয়েছে তখন সেই অঞ্চলের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। ফলে স্বাধীনতার চার (৪) দশক পরেও বাংলাদেশের উন্নয়ন রাজধানী শহরকেন্দ্রিক ভাবে গড়ে উঠেছে।

২.
স্বাধীনতার চার দশকে বাংলাদেশে এক দিকে যেমন আর্থিক প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে, অন্য দিকে বেড়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য। রেল-নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির গবেষণাপত্র 'বন্দরনগরী কুড়িগ্রাম জেলায় মঙ্গা কেন?' তথ্যমতে, ১৯৪৭ সালের পূর্বে তৎকালীন কুড়িগ্রাম মহকুমায় বিমানবন্দর ছিল ১টি, জাহাজ তৈরির কারখানা ও নৌ বন্দর ছিল ১টি, রেলওয়ের সদর দপ্তর ছিল ১টি। বর্তমানে যার কিছুই নেই।

বাংলাদেশে জেলাপ্রতি গড়ে পোষাক কারখানা থাকবার কথা ৮৬ টি সেখানে কুড়িগ্রাম জেলায় রয়েছে ১ টি(অচল)। বাংলাদেশের জেলাপ্রতি গড়ে বড় ও মাঝারি শিল্প কারখানার সংখ্যা ৩৮৭ টি, সেখানে কুড়িগ্রাম জেলায় রয়েছে ১০ টি যা অচলাবস্থায় ধুকেধুকে চলছে। যেখানে জেলা প্রতি গড়ে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ,প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১.৫ টি সেখানে কুড়িগ্রাম জেলায় একটিও নেই।

স্বাধীন দেশে এমন বাজেট বৈষম্যের কারণ কী তা সহজেই অনুমেয় যে দেশে স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতার সঠিক হদিস কুড়িগ্রামের মানুষ পায়নি। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসীন ছিলেন তার বিপরীতমুখী দলের এমপি নির্বাচিত হয়েছে কুড়িগ্রামের মসনদে। তাই বাজেটের লাগাম কুড়িগ্রাম বিমুখী চিরকাল।

৩.
করোনার সময়ে এসেও আমাদের দেশে ধনী ও মধ্যবিত্তের মধ্যে রয়েছে গরীবের প্রতি সীমাহীন উদাসীনতা।আমাদের নেতারা জানেই না যে এসব ৭১ শতাংশ গরীব জেলার মানুষের মাঝে লকডাউনের আগেই নেমে এসেছে ঘোরতর সংকট। লকডাউনে শ্রমজীবী মানুষেরা কর্মহীন হয়ে পরেছে। হঠাৎ হঠাৎ কর্মক্ষেত্রে অফিস খোলা ও বন্ধ সিদ্ধান্ত নেওয়ায় গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও জীবিকা প্রবল অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।

একদিকে জেলার বাইরে থেকে অতিরিক্ত শ্রমজীবী মানুষ জেলায় প্রবেশ করায় শ্রমের জোগান চাহিদার তুলনায় বেড়ে যাবে ফলে শ্রমের মূল্য কমে যাবে। তার প্রভাব পরবে সারা বছর যারা গ্রামে শ্রমবিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে তাদের উপর। তৈরি হবে সংকট। এমতাবস্থায় সরকার কি তাদের দায়িত্ব নিবে?

কিন্তু সেখানেও আশায় গুড়েবালি- করোনাকালিন সময়ে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে চাল, নগদ অর্থ ও শিশু খাদ্য বরাদ্দ এসেছে সামগ্রিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে জেলায় গরীব মানুষের সংখ্যা যতো বেশী সেই জেলায় বাজেট বরাদ্দ ততো কম। ২০১৬ সালের খানা জরিপের তথ্যমতে কুড়িগ্রাম জেলায় গরীব মানুষের সংখ্যা সবথেকে বেশী থাকলেও সেখানে চাল ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাথাপিছু ৯০০ গ্রাম ও ৩ টাকা ৮৫ পয়সা। অন্যদিকে সবথেকে কম দরিদ্র জনগোষ্ঠী নিয়ে বসবাস জেলা নারায়নগঞ্জে মাথাপিছু চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২২ কেজি এবং নগদ অর্থ ৮৮ টাকা। কুড়িগ্রামের পর সবথেকে বেশী দরিদ্র মানুষ নিয়ে বসবাস জেলা দিনাজপুর সেখানে মাথাপিছু বরাদ্দ চাল ৬৭২ গ্রাম ও নগদ অর্থ ৩ টাকা। অন্যদিকে নারায়নগঞ্জে পর কম দরিদ্র জনগনের জেলা মুন্সিগঞ্জ সেখানে মাথাপিছু চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২১ কেজি ও নগদ অর্থ বরাদ্দ ৯৫ টাকা।অথচ সব বরাদ্দ হওয়া উচিত ছিল দরিদ্র ও প্রান্তিক জনসংখ্যার ভিত্তিতে। কিন্তু সেটি করা হয়নি। শুধুমাত্র মান্ধাতার আমলের কেন্দ্রিয় বন্টন ব্যবস্থার জালে বন্দি হয়ে আছে কুড়িগ্রামের তথা আঞ্চলিক বরাদ্দের হার। এমতাবস্থা চলতে থাকলে নিকট ভবিষ্যতে কুড়িগ্রাম জেলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে।

৪.
যে আঞ্চলিক বৈষম্যের সূত্র ধরে আজকের বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল আজ সেই স্বাধীন দেশেই আঞ্চলিক বৈষম্য লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। যা একটি স্বাধীন দেশে কোনভাবেই কাম্য নয়। আর এই বৈষম্য আঞ্চলিক ব্যাপ্তি নিলে দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশংকা বেড়ে যাবে। শুরু হবে মহামারী। এ বিষয়ে দুর্ভিক্ষ মানব উন্নয়ন তত্ত্ব, জনকল্যাণ অর্থনীতি ও গণদারিদ্রতার কারণ বিষারদ ভারতীয় বাঙ্গালী অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক অমর্ত্য সেনের মতামতটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য, 'কোন কালেই কোন জায়গায় খাদ্যের অভাবে মহামারী হয় নাই। মহামারী হয়েছে খাদ্যের সুষ্ঠু বন্টন ব্যবস্থাপনার অভাবে। 'তাই সময় থাকতেই ত্রাণ ও অর্থনৈতিক সুষ্ঠু বন্টন ব্যবস্থাপনা নীতি অবলম্বন করে প্রান্তিক ও অতি দারিদ্র অঞ্চলের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে দেশকে অর্থনৈতিক সাম্যাবস্থায় নিয়ে আসা হোক।

লেখক : সদস্য, রেল-নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি, কুড়িগ্রাম।

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.1223 seconds.