• বাংলা ডেস্ক
  • ০৪ মে ২০২০ ২০:১০:৫১
  • ০৪ মে ২০২০ ২২:৩৪:৫৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘আমি হিন্দুদের ভয় পাই, এমনকি ইউরোপ-আমেরিকাতেও’

রাজকুমারী হেন্দ আল কাশিমি। ছবি : দ্য ইউক থেকে নেয়া

ভারতীয় উদ্যোক্তা সৌরভ উপাধ্যায়ের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুসলিমবিরোধী মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) রাজকুমারী হেন্দ আল কাশিমি। আল কাশেমি শারজাহ রাজপরিবারের সদস্য। মুসলিমবিরোধী কোনো মন্তব্য ইউএইতে গ্রহণযোগ্য নয় বলেও সৌরভকে সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি।

‘ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতার’র সমালোচনা করে সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষস্থানীয় গলফ পত্রিকায় প্রবন্ধও লিখেছেন হেন্দ আল কাশেমি। এই ইস্যু দ্রুতই কূটনৈতিক সংকট তৈরি করে, যা ভারতকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে। সংবাদমাধ্যম দ্য উইক-এর কাছে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এই রাজকুমারী বলেন, ভারতে নাৎসি-জাতীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যা সারাবিশ্বে বসবাসরত ভারতীয়দের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বাংলা’র পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি ভাষান্তর করা হলো-

কেন আপনি এর বিরুদ্ধে কথা বলার পথ বেছে নিয়েছেন?

হেন্দ কাশিমি : ভারতে যা ঘটছে তা নতুন নয়, এটা বিগত কয়েক বছর ধরেই ঘটছে। সম্প্রতি এই আওয়াজ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আমরা মুসলিম, খ্রিষ্টান ও সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ বাড়তে দেখেছি। হিন্দুত্ববাদী একটি সম্প্রদায় নায়কে পরিণত হয়েছে এবং বাকিরা অস্পৃশ্য হয়ে গেছে। মহাত্মা গান্ধী এই ভারতকেই শেষ করার চেষ্টা করেছিলেন। সেখানে হঠাৎ করে আমরা নাৎসি-জাতীয় সিস্টেমের উদয় হতে দেখলাম। এখানে ভারতীয়দের কিছু নেই। এখানে হিন্দুরও কিছু নেই।

আমাকে এটা স্বীকার করতে হবে, ইসলামের নামে মন্দির ধ্বংসের মতো যা কিছু ঘটেছে, সেখানে ইসলামের কিছুই ছিলো না। কিন্তু বলতে হবে, ইসলামের আলেমগণ এটা পছন্দও করতেন না। ইসলামে এটা স্পষ্ট করে বলা আছে মন্দির, গীর্জা ও সিনাগগ (ইহুদিদের ধর্মীয়স্থান) ধ্বংস করা যাবে না, বিশেষ করে যুদ্ধের সময়।

কোন পুরোহিতকে আঘাত করা যাবে না। নারী ও শিশুদেরকেও আঘাত করা উচিত নয়। এমনকি একটি গাছও কাটা উচিত নয়। আমি বিশেষভাবে মুঘলদের কথা বলছি। কিন্তু আপনাকে এটা বিষয় মনে রাখতে হবে, মুঘলরা চেঙ্গিশ খানের বংশধর, হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর নয়। এখন ৭০০ বছর পর এসে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে। এটা ভুল ছিলো, এটা চোখের বদলে চোখ তুলে নেওয়ার মতো ব্যাপার হলো। আমি এটা বুঝতে পারি, মসজিদটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের উপর নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু মুসলমানদের বয়কট করাটা আমি বুঝতে পারি না।

আমি পড়েছি যে, অনেক হিন্দুই মনে করেন মুসলমানরা তাদের হিন্দুত্ববাদকে মুছে ফেলতে চায়। আপনি হিন্দুত্ববাদ মুছে ফেলতে পারবেন না, এটা সব সময় সেখানে থাকবে। একইভাবে আপনি ভারত থেকে ইসলামকেও মুছে ফেলতে পারবেন না। কারণ, এখানে ৭০০ বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাস রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচরণায় কি ভারত-ইউএই’র সম্পর্কের কোন ক্ষতি করেছে?

হেন্দ কাশিমি : ভারতে কী ঘটছে এবং মুসলমানদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হচ্ছে সে বিষয়ে ইউএই সচেতন হচ্ছে। জনগণ অবাক এবং হতাশ। তারা এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য অপেক্ষা করবে। আমি পড়েছি যে, ভারত শরণার্থী ক্যাম্প তৈরি করছে। চীনে ১৮ লাখ উইঘুর মুসলিম কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের মধ্যে রয়েছে, যাকে শ্রমিক শিবির বা আটক শিবিরও বলা হয়। এটা বিরক্তিকর যে ভারতেও এটা ঘটতে চলেছে।

ইউএই সব সময়ই ভারতীয়দের স্বাগত জানায়। কারণ, আমরা এটা অনুভব করিনি যে ভারতীয়রা আমাদের প্রতিযোগী বা শত্রু মনে করে। ভারত এবং ইউএই’র মধ্যে শক্তিশালী ও স্থায়ী বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আমি আশা করি ভারতের সহিংসতা ও ইসলামবিদ্বেষ বন্ধ হবে। ভারত তার আগের বহুত্ববাদে ফিরে যাবে।

আপনার কি মনে হয় ভারত সরকার এজন্য যথেষ্ঠ উদ্যোগ নিয়েছে?   

হেন্দ কাশিমি : দুর্ভাগ্যবশত ভারত সরকার তা করেনি। আমি খুবই হতাশ। তারা এটাকে উপেক্ষা করার চিন্তা করে। কিন্তু শুধু আরব বিশ্বই নয়, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ইন্দোরনেশিয়াতেও এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে। আপনি কি মনে করেন পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং মালেশিয়া এই বিষয়ে চুপ থাকবে? এর প্রতিক্রিয়া শুধুমাত্র ভারতের হিন্দুরাই অনুভব করবে না, এটা নানা মাত্রায় আরো সংকট তৈরি করবে।

তাহলে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে?

হেন্দ কাশিমি : ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এমনকি নেতারা যদিও চুপ থাকে, আপনি কি মনে করেন জনগণও তাই করবে? তারা করবে না। আমি হিন্দুদের ভয় পাই, এমনকি তা ইউরোপ এবং আমেরিকাতেও। তাদের নব্য-নাৎসিবাদ হিসেবে দেখা হবে। ইসলামবিদ্বেষী চিন্তা অদেখা থাকবে না।

ইউএই’তে বসবাসরত ভারতীয়রাও কি এমন প্রতিক্রিয়ার শিকার হবে?

হেন্দ কাশিমি : ইউএই খুবই উদার একটি দেশ। কিন্তু এখন হিন্দুদের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। আগে এমনটা ছিলো না। এছাড়াও ভারতীয় ব্যবসায়ীরা নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করা এবং পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় কয়েকটি মামলাও রয়েছে। ভারতীয়রা খুবই পরিশ্রমী। নাৎসি হিসেবে তারা পরিচিতি লাভ করতে পারে না। ভারত একমাত্র দেশ যারা অন্য দেশে আক্রমণ করেনি। দেখেন চীন কিভাবে তীব্বত আক্রমণ করেছিল। এমনকি এখন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা তাদের ধর্মও পালন করতে পারে না। ভারত অবশ্য শরণার্থীদের স্বাগত জানায়।

আপনি কি এজন্য বিজেপি বা সংঘ পরিবারকে দায়ী করছেন?  

হেন্দ কাশিমি : ভারতের রাজনীতির বিষয়ে আমার ভালো ধারণা নেই। এমনকি যখন আমি টুইটারেও লিখি। আমি তাবলীগ জামায়েতকে রক্ষার দায়ে অভিযুক্ত হই। এমনকি আমি জানিও না এটা কী? আমি জানি তারা মুসলিম। আমি তাদের মতো ব্যক্তিদের (সৌরভ উপাধ্যায়) নিয়ে আরো উদ্বিগ্ন, যারা আমার ধর্ম, আমার নবী, আমার দেশ, আমার জীবনযাত্রা এবং আমার জাতিকে আক্রমণ করে। আমি আশা করি, ভারতের মুসলিমবিরোধী মনোভাবের দ্রুতই ইতি ঘটবে। আমি নিশ্চিত এটা সংশোধন করা যেতে পারে।

আপনি কোন আশা দেখতে পান?

হেন্দ কাশিমি : অবশ্যই। এটা ভারত।

এই কথাগুলো বলাটা কতটা কঠিন ছিলো?

হেন্দ কাশিমি : আমার মা আমাকে স্মরণ করে দিয়েছিলেন, ‘অমার্জিত কিছু বলো না। তবে তোমাকে সত্যটা বলতে হবে।’ ভারত আমাদের বাসা। যখন আমরা ভারতে গিয়েছিলাম, মনে হয়েছে আমি আমার পরিবারের সঙ্গেই আছি। এমনকি যখন আমি একটি হোটেলে ছিলাম। এটা খুবই হৃদয়গ্রাহী।

আমি শুধু আমার উদ্বেগের বিষয়গুলো বলতে পারি। আমি যখন বৈষম্যের খবরগুলো দেখি, তখন আমার হৃদয় ভেঙে যায়। আমি এসব বলতে চাই না, কারণ এগুলো আমাকে রাগান্বিত করে। কারণ, তারপর আমি আর ভালো থাকতে পারবো না।

আপনার কি আবারো ভারত ভ্রমণের পরিকল্পনা আছে?

হেন্দ কাশিমি : আমি আশা করি, করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারীর পর দ্রুতই আসবো। আমার বাবা খুব ভালো হিন্দি বলতে পারেন। তিনি দুই বছর ভারতে ছিলেন।

বাংলা/এনএস

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1725 seconds.