• ০৬ মে ২০২০ ১৭:৩৬:০১
  • ০৬ মে ২০২০ ১৭:৩৬:০১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

করোনাকালেও থেমে নেই ধান্ধাবাজেরা

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


আমাদের দেশে বোধহয় বিনা স্বার্থে, কোন ধান্ধাবাজি ছাড়া ভালো কাজ করা নিষেধ। আমরা বোধহয় এমন ভাবেই টিউনড। সব কাজেই একটা কারণ খুঁজে বের করতে চেষ্টা করি। সেই ‘কার্য-কারণ’ পদ্ধতি আর কী। কোন কারণ ছাড়াও যে ভালো কাজ করা যেতে পারে তা আমাদের মাথায় ঢোকে না।

এই যে, নারায়নগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের একজন কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। নিজের জীবনের ভয় না করে, নিজের পরিবার পরিজনের কথা চিন্তা না করে, মানুষের কথা চিন্তা করছেন। করোনায় মৃতদের দাফন-সৎকার করছেন। তাকে নিয়েও নাকি ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।

যারা মানুষ মরে গেলে কবরস্থ করার দায়িত্বটুকু পালন করতে চান না। যারা মৃতদের লাঞ্ছিত করার মতন পরিস্থিতিতেও ঘরে বাসে থাকেন। তখন খোরশেদ বেড়িয়ে আসেন সেই মৃতদের শেষ কাজটা সম্মানের সাথে করতে। যিনি সারা বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছেন, সেই খোরশেদকেও সামাজিকমাধ্যমে লাইভে আসতে হয়! বলতে হয় শঙ্কার কথা, বলতে হয় ষড়যন্ত্রের কথা! 

‘বিদ্যানন্দ’ নিয়ে তো অনেক কথাই হলো। বিদ্যানন্দের চেয়ারম্যানকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিলো। যদিও পরবর্তীতে তিনি সিদ্ধান্ত পাল্টেছেন। কিন্তু তাকে পদ ছাড়ার চিন্তাটা করতে হয়েছিলো। ‘বিদ্যানন্দ’ নামে প্রতিষ্ঠানের দোষটা কী, তারা গরীব মানুষদের এক টাকায় খাবার খাওয়ায়, এটা তাদের দোষ? তারা এই করোনাকালে সারাদেশের মানুষদের সহায়তা করছে, খাদ্যের জোগান দিচ্ছে, এটা তাদের দোষ? এসব করা যাদের দায়িত্ব, যারা আমাদের সাধারণ জনগণের টাকায় চলেন, তারা যখন অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ, সেখানে ‘বিদ্যানন্দ’ সফল এটা তাদের দোষ? বলিহারি যাই, এমন চিন্তার মানুষও রয়েছেন এমন দুঃসময়ে, এমনটা ভেবে।

এমন চিন্তার, এমন ধান্ধাবাজদের কথা অনেকেই বলছেন। আর সেই বলায় ধান্ধাবাজদের সাথে কিছু সাধারণ মানুষদেরও সামিল করছেন। আমি ঠিক সেভাবে বলছি না। সমালোচনাটা করছি ধান্ধাবাজ আর সাধারণদের পৃথক করে। কারণ আমি জানি, সাধারণ যারা আছেন, তারা এর সাথে টিউনড। মানে অভ্যস্ত। কীভাবে দেখুন।

এই যে, ধান কাটার ফটোসেশন, ত্রাণ বিতরণের ফটোসেশন, এসব লোক দেখানো কার্যক্রম দেখতে দেখতে সাধারণ মানুষ ক্রমেই সন্দেহ প্রবণ হয়ে উঠছে। তারা সব কিছুতেই এখন নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে। কেন করবে না, এই দুর্যোগে স্বাস্থ্যখাতের কথাই বলি। ‘সংকটকালেও চলছে স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি’, গণমাধ্যমের এমন একটা শিরোনামই যথেষ্ট স্বাস্থ্যখাতের অবস্থাটার জানান দিতে।

খবরটিতে বলা হয়েছে, এপ্রিলেই কেনাকাটার ক্ষেত্রে ২২ কোটি টাকার স্বচ্ছ হিসাব দিতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এন ৯৫ মাস্কের কাহিনিতো সবারাই জানা। এর আগে বালিশকান্ড, পর্দাকান্ডসহ নানা কান্ডে মাহের এই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

অনেকে ক্ষেত্রেই এসব দেখতে দেখতে সাধারণ মানুষ খুঁতখুঁতে হয়ে উঠেছে। সব কিছুই দেখছে সন্দেহের দৃষ্টিতে। বলতে পারেন তারা উদ্দেশ্য আর আদর্শকে গুলিয়ে ফেলেছে। এই সুযোগটাই নিয়েছে ধান্ধাবাজেরা। মানুষদের মনে দ্বন্দ্ব সৃষ্টির জন্য ‘বিদ্যানন্দ’ প্রধানের ধর্মীয় পরিচয়টা সামনে আনছে। কাউন্সিলর খোরশেদের বিনাস্বার্থের এমন কাজকে রাজনৈতিক রূপ দিতে চাচ্ছে। যেহেতু বিনাস্বার্থে নিজেরা কোন কাজ করে না, তাই সেই স্বার্থের দুর্গন্ধটা ধান্ধাবাজেরা সাধারণ মানুষের নাকেও পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছে। যাতে সেই ভালো কাজটাও থমকে যায়। ভালো কাজে জড়িতরা হেনস্তার ভয়ে কেটে পড়ে। ‘বিদ্যানন্দে’র প্রধান কিশোর যে কাজটি করেছিলেন। অবশ্য দ্রুত তিনি সামলে নিতে পেড়েছেন এটাই আশার কথা।

মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদকেও বিব্রতকার অবস্থার সম্মুখিন হতে হচ্ছে। অবশ্য তিনি বলেছেন, এসবে তিনি কান দিচ্ছেন না। খোদার সন্তুষ্টি লাভের জন্য তিনি এসব করছেন। মানুষের কথায় তার কিছু যায় আসে না। 

খোরশেদর মতন পিছু লোকের কথায় যাদের কিছু যায় আসে না, তারাই শেষ পর্যন্ত টিকে যান। ইতিহাস হয়ে থাকেন, উদাহরণ হন। কাউন্সিলর খোরশেদেকে যারা হেনস্তা করার চেষ্টা করছেন, তাদের বলুনতো একজন করোনায় মৃতকে দাফন বা সৎকার করতে, দেখেন তো তারা কী করে। নিজের স্বজনরাই যখন শেষ কাজে ভয় পায়, তখন ওই ধান্ধাবাজেরা; প্রশ্নই উঠে না, সব দৌড়ে পালাবে। এই করোনাকালে ‘বিদ্যানন্দ’ যেভাবে কাজ করছে, তা করতে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে স্বয়ং দায়িত্বশীলরা সবরকম লজিস্টিক সাপোর্ট থাকা সত্বেও।

সুতরাং ‘বিদ্যানন্দ’ তাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। তাদের সফলতা মানে সেসব দায়িত্বশীলদের ব্যর্থতার মাপকাঠি। তাই ‘বিদ্যানন্দ’কে মাঠ থেকে হঠাতে নানা কৌশলের অপপ্রয়োগ। ব্যর্থদের কাজই এই। নিজে উপরে না উঠে, অন্যকে টেনে নামানো। গণস্বাস্যেেকর কিটের বেলাতেও একই কান্ড। গণস্বাস্যোপর সফলতা মানে অন্যদের ব্যর্থতা। সেজন্যই সেই কিট এখনো অন্ধকারেই। 

সুতরাং যারা ভালো কাজে সবসময় বাগড়া দেয়, এমন সব ধান্ধাবাজ আর ব্যর্থদের থেকে আমাদের সাধারণদের সাবধান হতে হবে। ফারাকটা বুঝতে চেষ্টা করতে হবে আদর্শ আর উদ্দেশ্যের মধ্যে। এটা আমাদের জন্যই প্রয়োজন। আমাদের বেঁচে থাকার জন্য। ভালো থাকার জন্য। 

পুনশ্চ : একটা বিষয় বাদ পড়ে গিয়েছিলো। ওই যে যারা বলছেন, ‘বিদ্যানন্দ’ প্রধানের ধর্মীয় পরিচয়ের ব্যাপারে। যাদের ধারণা তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের বলেই, কিছু মুসলমানরা তকে সরাতে চাইছেন। এমনসব মানুষদের বলছি, আপনারা যারা এমন ধারণা পোষণ করেন তারাই প্রকৃত সাম্প্রদায়িক। তারা মূল কারণটা বোঝার চেষ্টা না করেই, উপসর্গকে সামনে আনেন। জ্বর উপসর্গ, মূল অসুখ ‘করোনা’ এটা ভুলে যান। এখানে ‘করোনা’ হলো সেই ধান্ধাবাজরা।

যারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষের মধ্যে বিভেদ বাধিয়ে দেয়। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, সম্প্রদায়, রাজনীতি, বাম, ডান, লাল, নীল এসবই বিভেদ বাধানোর অনুষঙ্গ। ধর্মতে কুলিয়ে না উঠলে বর্ণ আনবে। তাতেও সুবিধা না হলে রাজনীতি আনবে। পারলে পঙ্গপাল খাওয়া যাবে কী যাবে না এমন অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়েও বিভেদ বাধাবে। এদের কাজই বিভেদ বাধানো। সুতরাং ধর্ম এখানে শুধুমাত্র বিভেদের এক অনুষঙ্গ, মূল বিভেদ নয়। এটা মাথায় রাখতে হবে। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। 

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0855 seconds.