• ০৭ মে ২০২০ ১৮:১৩:১৯
  • ০৭ মে ২০২০ ২১:০০:৫৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

করোনা মোকাবিলায় সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্তের সুযোগ নেই

সজীব সরকার। ছবি : সংগৃহীত


সজীব সরকার :


এ বছরের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত দেশে মোট প্রায় ১১ হাজার সংক্রমণের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা প্রায় দুইশত। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এখনো প্রতিলাখে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা অনেক কম; পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো হলে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা অস্বীকার করার উপায় নেই।

জনসহপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় ও ওয়ার্ল্ডমিটারস-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত ও মৃতের পরিসংখ্যানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে ভারত ও পাকিস্তান। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভুটান। দেশটিতে মোট আক্রান্ত ৭, সুস্থ ৫ ও মৃত্যুর সংখ্যা শূন্য।

মধ্য মার্চ থেকে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা শুরু হয়। একে একে বন্ধ হতে শুরু করে নানা প্রতিষ্ঠান। সংক্রমণের সংখ্যা ও ছড়িয়ে পড়ার ভৌগোলিক আওতা বাড়তে শুরু করলে একের পর এক বাড়ি-পাড়া-মহল্লা-গ্রাম-শহর-জেলা লকডাউনের আওতায় নিতে শুরু করে সরকার। ছোঁয়াচে করোনাভাইরাসের নতুন সংক্রমণ ঠেকাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে শুরু থেকেই সবাইকে ঘরে থাকতে (হোমকোয়ারেনটিন) নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় জরুরি পণ্যের দোকান পাট খোলা রাখার সময়সীমা ও সড়কে মানুষের চলাচল সীমিত করতে নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

দেশে করোনায় আক্রান্ত রোগী ও এ রোগে মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। এ অবস্থায় দেশের করোনা পরিস্থিতি যে ভালোর দিকে যাচ্ছে, তা নয়—বরং উল্টো। এমন সময়ে যখন সবার ঘরে থাকাই একমাত্র সমাধান এবং সরকার ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা যখন সেটিই করতে বলছেন, তখন একের পর এক শিল্প প্রতিষ্ঠান, অন্যান্য অফিস এবং সর্বশেষ সিদ্ধান্তে শপিংমলসহ দোকানপাট খুলে দেওয়ার বিষয়টি স্ববিরোধী নয় কি?

স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে ও স্বীকার করেছেন, পোশাক কারখানা ও দোকানপাট খুলে দেওয়ার ফলে সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাহলে এই সিদ্ধান্ত কি ঝুঁকির কথা জেনেও নেওয়া হলো, না কি এটি সমন্বয়হীনতারই প্রমাণ?

মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে হবে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতেই হবে; এ নিয়ে দ্বন্দ্ব নেই। তবে জনজীবন যখন নির্বিচারে অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখোমুখি, তখন ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষার চাপে বেশি নমনীয় হওয়া ঠিক নয়। জনজীবনের নিরাপত্তা ও নিশ্চিত করতে হবে এবং অর্থনীতিকে রক্ষার তাগিদে ব্যবসায়ীদের স্বার্থও দেখতে হবে; তবে তা করতে হবে মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে। এখানে প্রশ্ন থাকছে : এই যে শপিংমল ও দোকানপাট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো, তাতে চলমান হোমকোয়ারেনটিন ও লকডাউন কতোটা কার্যকর থাকবে? আর যারা এখন এসব মার্কেট বা দোকানে যাওয়ার তাগিদে ঘর থেকে বেরোবেন, তারা কতোটা সুরক্ষা ব্যবস্থা মেনে বের হচ্ছেন এবং শপিংমল ও দোকানপাটে সামাজিক দূরত্ব কতোটা রক্ষা হবে, তা কে দেখবে বা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?

এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত কোনো পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্তের খবর আমরা জানিনা। ফলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত করোনামোকাবেলায় করণীয়র সঙ্গে এখন পর্যন্ত সাংঘর্ষিক বলেই মনে হচ্ছে। আরেকটি বিষয় হলো, যখনই এ ধরনের শিথিলতা দেওয়া হচ্ছে, তখন বলা হচ্ছে ‘সীমিত পরিসরে’ ও ‘শর্ত সাপেক্ষে’ খোলার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শুরু থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, এসব শর্ত প্রায় সবক্ষেত্রেই অমান্য করা হচ্ছে।

সর্বশেষ ঘটনায় পোশাক কারখানাগুলো এসব শর্ত বা নিয়ম অমান্য করেছে বলে আমরা গণমাধ্যমের খবরে দেখেছি। এর পরিণতিও আমরা দেখেছি : গাজিপুর ও সাভারে কয়েকজন পোশাককর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। আর অন্য প্রতিষ্ঠান  বা দোকানপাট ও নির্ধারিত সময়ের বাইরে খোলা থাকছে—এমন অনিয়মের খবরও প্রতিদিন খবরে উঠে আসছে। প্রতীতি হচ্ছে, এ প্রসঙ্গে শুরু থেকেই যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত করা না হলে এ ধরনের সিদ্ধান্তের কারণে আমাদের ও যুক্তরাষ্ট্র-স্পেন-ইতালির পরিণতিই বরণ করতে হবে।

তাই কেবল সীমা বা শর্ত জুড়ে দিয়ে দায়সারলেই হবেনা—তা মানা হচ্ছে কিনা, সেটির ও কঠোর নজরদারি দরকার। নিবিঢ় তদারকির মাধ্যমে তা নিশ্চিত করতে হবে এবং নিয়ম ভঙ্গ হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জবাবদিহিতা ও প্রয়োজনে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

সমীকরণটি খুব কঠিন নয় :সর্বাগ্রে মানুষের জীবনের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে। অর্থনীতি ও স্বাভাবিক জীবন যাত্রার প্রয়োজনে শিল্পকারখানা-অফিস-দোকানপাট খুলতে হলে যথাযথ সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে তবেই খুলতে হবে, অন্যথায় নয়। 

আর এ জন্যে দায় কেবল সরকারেরএকার নয়; সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিতথা জনসাধারণের ও যথেষ্ট দায়বোধ থাকা চাই। তবে জনগণ ও প্রতিষ্ঠান গুলো যথেষ্ট দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছে কিনা, তা দেখভালের দায় সরকার এড়াতে পারেনা কিছুতেই। তাই সাংঘর্ষিক নয়—জীবনমুখী ও কল্যাণকামী সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করতে হবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারপারসন, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

করোনাভাইরাস বাংলাদেশ

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0699 seconds.