• ০৭ মে ২০২০ ২১:০৪:১৬
  • ০৭ মে ২০২০ ২২:৩১:৫১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

সমালোচনা আর গুজব এক নয় মহাশয়

তৈমুর ফারুক তুষার। ছবি : সংগৃহীত


তৈমুর ফারুক তুষার :


অদ্ভুত একটা ব্যাপার খেয়াল করছি গত কিছুদিন থেকে। সমালোচনা আর গুজব এ শব্দ দুটোর মানে যেন এক হয়ে গেছে! সম্প্রতি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ঢালাও ব্যবহার দেখে এমনটাই মনে হয়। গত কয়েক দিনে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক, কার্টুনিস্ট, এক্টিভিস্টকে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে গারদে ভরা হয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে আমার বিশেষ পরিচিত। তারা অনলাইনে কোনো মিথ্যা তথ্য প্রচার করেননি। সরকারের কোনো কোনো ব্যক্তির নির্দিষ্ট কাজের বিরুদ্ধে তাদের মতামত তুলে ধরেছিলেন। এ সমালোচনাকেই গুজব নাম দিয়ে তাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের শিকার বানানো হয়েছে।

এখন কথা হলো, সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে স্বল্পন্নোত দেশ থেকে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর আগে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার কথা। বেশকিছু উন্নয়ন সূচকে আমরা কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও করেছি। কিন্তু বাক-স্বাধীনতা কিংবা মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে আমরা গত বছরের চেয়েও এক ধাপ পিছিয়েছি। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা প্যারিসভিত্তিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স-এর সূচকে গত বছরের চেয়ে একধাপ পিছিয়ে এবার বাংলাদেশের অবস্থান ১৫১তম। সরকারকে বুঝতে হবে, উন্নত দেশগুলোর মানুষ শুধু বেশি রোজগার করেন, সেখানে বড় বড় দালান-কোঠা, উড়াল সড়ক আর মেট্রোরেলই থাকে না। উন্নত দেশগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো বাক-স্বাধীনতা। সেখানকার নাগরিকেরা সরকার কিংবা সরকার প্রধানের তীব্র সমালোচনা করতে পারেন কোনো বাধা ছাড়াই। সেখানকার শাসকদের নাগরিকদের সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা রাখতে হয়।

দেশের সব মানুষ আওয়ামী লীগ করবে না, সরকারের সমর্থক হবে না। সে চেষ্টা করা আত্মঘাতি হবে। বরং বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের সমালোচকরাই সরকারের বড় বন্ধু। কারণ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যখন তৈল মর্দন আর তোষণে মগ্ন তখন সমালোচকরাই সরকারের ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে দুর্বল দিকগুলো সামনে এনে সরকারের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।

আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী বিটে সাংবাদিকতা করার কারণে ক্ষমতাসীনদের অনেকের সঙ্গেই নানা বিষয়ে আলাপ করতে হয়। ব্যক্তিগত এসব আলাপচারিতায় তাদের কেউ কেউ সমালোচকদের বিরুদ্ধে নানা ক্ষোভ জানিয়ে থাকেন। কিন্তু সরকার পক্ষকে সন্তুষ্ট রেখে সরকারের সমালোচনা আদৌ সম্ভব? কারও সমালোচনা কখনোই তার মন জুগিয়ে করা যায় না। কেউ কখনো আপনার পছন্দমতো আপনার সমালোচনা করবে না মাননীয় সরকার। আপনি কাউকে ঠিক করে দিতে পারেন না যে আপনার কতটুকু সমালোচনা করা যাবে। সমালোচনার বিষয় কী হবে সেটাও আপনি নির্ধারণ করে দিতে পারেন না। একজন নাগরিক তার পছন্দমতো বিষয় নিয়ে কথা বলবে। আপনাদের কোনো কাজ পছন্দ না হলে তারা তীব্র সমালোচনায় ভাসিয়ে দেবে। আপনি যত বেশি মানুষের সমালোচনা গ্রহণ করতে পারবেন তত বেশি মানুষকে আপনার সঙ্গে যুক্ত করতে পারবেন। আমি মনে করি, মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার একটা ভালো উপায় হলো তাদের কথা বলতে দেওয়া। সরকারের উচিত মানুষকে বাধাহীন কথা বলতে দেওয়ার গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করা। আমরা সবাই জানি, গণতন্ত্রে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে। কিন্তু গণতন্ত্র না থাকলে কুকুর কামড়ায়।

একাধিক সূত্র থেকে জেনেছি, বর্তমানে অনলাইনে গুজব ছড়ানো বা সরকার বিরোধী তৎপরতার বিষয়গুলো সরকারের যারা পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের কর্মকান্ড নিয়ে ক্ষমতাসীনদের মাঝেও বিরক্তি আছে। আগে এ বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের শত্রু-মিত্র চিনে, যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হতো। কিন্তু বিগত কিছুদিন ধরে যথাযথ খোঁজখবর না করেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তারা গুজব আর সমালোচনা এ দুটোর পার্থক্য করতে পারছেন না। নানা ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা যারা করছেন তারাই টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। এতে করেই সংকট বেড়েছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে হারে অপব্যবহার হচ্ছে, এলোপাতারি যেভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের মাঝে শঙ্কা বাড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতির নিরসন হওয়া খুবই জরুরি। 

গত এপ্রিল মাসে ঠাকুরগাঁওয়ে বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী, জাগোনিউজের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মহিউদ্দিন সরকারসহ ৪ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। কারণ তারা ত্রাণ চুরি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন।

আহমেদ কবির কিশোর একজন কার্টুনিস্ট। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় আমি তাকে ঘনিষ্ঠভাবে চিনি। তিনি যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতাবিরোধী, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আপোষহীন। তার কার্টুনের মূল উপজীব্য সমাজের নানা অসঙ্গতি, অনিয়ম, দুর্নীতি। করোনা দুর্যোগেও তিনি অনেক কার্টুন এঁকেছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এখন তিনি কারাবন্দি।

শফিকুল ইসলাম কাজল একজন চিত্রগ্রাহক। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে রাজপথে আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের আন্দোলন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকালে নির্যাতিত হওয়ার অসংখ্য ছবি তুলে সে সময়ে প্রচার করেছেন। সেসময়ে তোলা তার বহু ছবি এখনো রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার হয়। তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একাধিক মামলা হয়েছে। প্রায় দেড় মাস গুম থাকার পর এখন তিনি জেলখানায়।

মাননীয় সরকার, ওই সাংবাদিক, সমালোচকরা সরকার উৎখাতের জন্য কাজ করছেন না। তাদের উদ্দেশ্য সমাজের অসঙ্গতি, অন্যায়, অনিয়ম দূর করতে সরকারকে আরও বেশি সক্রিয় ও কার্যকর করা। ফলে মামলা, জেল-জুলুম দিয়ে তাদের স্তব্ধ করার চেষ্টা যারা করছেন, তারা বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার তৎপরতায় লিপ্ত আছেন। 

লেখক: সাংবাদিক

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0883 seconds.