• ১০ মে ২০২০ ১৭:২৪:৩৭
  • ১০ মে ২০২০ ১৭:২৮:৩৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

মা দিবসে কাকন রেজা’র লেখা

আমার মা

কাকন রেজা। ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


আমার মা খুব বই পড়তেন। আমার লেখক বাবার থেকেও বেশি। আমার পড়ার অভ্যাস মূলত মা’র থেকে ধার করা। আমার মেজ খালা, যার কাছে থেকে আমি মার কাছাকাছি স্নেহ পেয়েছি, প্রশ্রয় পেয়েছি। সেই খালাকেও দেখেছি বই পড়তে। মা’র পরিবারে পড়ার অভ্যাসটা খুব ছিলো। শুনেছি, নানা প্রচণ্ড পড়াশোনা করতেন। এক মামাতো বিখ্যাত মানুষ। আরেক মামারও পড়ার অভ্যাস ছিলো যথেষ্ট।

আমার মা’র হাতের লেখাও ছিলো চমৎকার। বাংলা ইংরেজি দুটোই। খুব বড় ডিগ্রিধারী ছিলেন না মা। বড় বড় পাশ দেয়া তার হয়ে উঠেনি। একাডেমিক অর্থে তিনি উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু উচ্চশিক্ষিতদের বেশিরভাগই তার পড়াশোনার সামনে ছিলেন তুচ্ছাতি-তুচ্ছ। মার চিন্তার গভীরতা ছিলো এসব শিক্ষিতদের চেয়ে অনেক গভীরতর। রাজনীতি আর সমাজ নিয়ে তার অনেক চিন্তাই আমার তরুণকালের অনুপ্রেরণা।

আজ মা’র কবরের পাশে বসে মনে হলো, বঙ্কিম আর শরৎ বাবুদের চেনা মার কাছ থেকে সেই শৈশবেই। বর্ণ পরিচয়ের সাথে সাথেই তাদের নামের সাথে পরিচয় হয়েছে আমার এবং তা মা’র কল্যাণেই। বঙ্কিম যে মুসলিম বিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক তা মা’র কাছ থেকেই শোনা। মা সাম্প্রদায়িকতাকে ঘৃণা করতেন। বলতেন, স্কুলে তার প্রিয় বান্ধবীদের প্রায় সবাই ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের। আমার বাসা অবাধ ছিলো সব সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য। মা নিজেও লিখতেন। যদিও তার কোনো লেখা প্রকাশ হয়নি। তার লেখা আমাদের সংগ্রহেও নেই, যা এখন প্রকাশ করা যাবে। মূলত মা প্রকাশ করতে চাননি বলেই, সংগ্রহে রাখা যায়নি। আমার জীবনের গোপন কষ্টগুলোর মধ্যে মা’র লেখা প্রকাশ করতে না পারাটা একটা।

বাবা ছিলেন লেখক। মা ছিলেন বাবার লেখার বড় প্রেরণার জায়গা। মা’কে অনেক বিষয় নিয়ে বাবার সাথে রাগ করতে দেখেছি, লেখা নিয়ে কখনোই বাবার সাথে মা’র কোনো বিতন্ডা হয়নি, বরং আলোচনা হয়েছে। বাবার লেখা উপন্যাস নিয়েও কথা বলেছেন মা। সমালোচনাও ছিলো সে কথায়। তখনকার সময়ে আমার মা এতটাই অগ্রসর ছিলেন, আধুনিক ছিলেন। যা আজকের তথাকথিত আধুনিকাদের চিন্তাতেই আসবে না।

খুব সুন্দর করে শাড়ি পড়তেন মা। আমার কাজিনরা অনেকেই অনুষ্ঠানে যাবার আগে শাড়িটা পড়িয়ে নিতেন মা’কে দিয়ে। অনেকে মা’র কাছ থেকে শাড়ি ধার করে নিয়ে পড়েছেন। মা খুব দামি শাড়ি পড়তেন না। সুতির শাড়ি ছিলো তার পছন্দের। আর রুচির কারণে তার সেসব শাড়ি ছিলো অনেকটাই আলাদা। বলা যায় সৌন্দর্য আর আভিজাত্যের অপূর্ব সমন্বয় ছিলো তার সংগৃহিত শাড়িতে। ফলে অনেক রমনীরই ‘আইডল’ ছিলেন আমার মা।

মা রাজনীতিতে জড়ান স্বাধীনতার আগেই। ন্যাপ ভাসানী’র সাথে সাথে যুক্ত হন মা। মাওলানা ভাসানীর আগ্রহেই তার রাজনীতিতে আসা। নানা বাড়িতে এসেছিলেন মাওলানা। মা তার ভক্ত হয়েছিলেন তখন থেকেই। মা’র বক্তৃতা দেয়ার ধরণও ছিলো চমৎকার। গুছিয়ে কথা বলতে পারতেন। এখনো মা’কে আমার হিংসা হয়, তার মতো করে বলতে পারি না বলে।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেও মা ছিলেন উল্লেখ্য। বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃত্বও দিয়েছেন। জনপ্রতিনিধি হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তখন স্কুলের গন্ডি পার হইনি। জনপ্রতিনিধি হিসাবে সে সময়েও সৌদি সরকারের দানের গোশত আসতো। জনপ্রতিনিধি হিসাবে পেতেন আমার মাও। বাসাতেই সাদা কাপড়ে জড়ানো সেই দানে পাওয়া দুম্বা কেটে ভাগ করে দেয়া হতো দুঃস্থদের মধ্যে। আমাদের অনেক পরিচিত এবং আত্মীয়দের মধ্যেও দু’একজন শখ হিসাবে দুম্বার গোশত চেখে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মা’র ছিলো সাফ জবাব, ওগুলো দুঃস্থদের জন্যে। দুঃস্থ আর গরীবদের হকের বিষয়টি মা’র কাছ থেকেই জানা।

বাসায় ছিলো একপাল বিড়াল। আমি পালতাম। বলতে গেলে নামটা শুধু আমার, পালতো আমার মা। কুকুরও ছিলো। এদের কেউ ব্যথা পেলেও মা অস্থির হয়ে যেতেন। শুধু মানুষ নয়, পশুদের জন্যেও আমার মা ছিলেন প্রশান্তির আশ্রয়। আর আমি কতটা আশ্রয় ও প্রশয়ে ছিলাম সেতো বলার অপেক্ষাই রাখে না।

আমাদের কুকুর ছিলো ‘টম’। নামটা ছেলেদের হলেও মাদি কুকুর। তাও আবার দেশি-বিদেশির ক্রস। সেই টমের কোনো বাচ্চাকেই আমরা বাঁচাতে পারিনি। কী কারণে যেনো একটু বড় হবার পরেই বাচ্চাগুলো মারা যেতো। সেই বাচ্চাদের বাঁচানোর জন্য মা’র যে কী আকুতি দেখেছি। তখন আমাদের মহকুমা শহর। সেখানের পশু হাসপাতালের ডাক্তারকে ডেকে টমের বাচ্চাদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন মা। আর এখনকার গৃহিণীরা শিশু গৃহকর্মীকে পিটিয়ে মেরে ফেলেন! পশুতো দূরের কথা, মানুষকেই সহ্য করতে পারেন না তারা।

আমার কাজিনদের মধ্যেও মা ছিলেন বেশ জনপ্রিয়। আমার এক ভাই, আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ মাকে বলতেন, ‘স্মার্ট খালা’। এজন্যেই বলতেন, আমার মার সময়ে বই পড়া, সমাজ সেবা আর রাজনীতি করে বেড়ানো নারীর সংখ্যা ছিলো হাতেগোনা। হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে হাতেগোনা মানুষদের মধ্যেই আমার মা একজন।

ওই পারে ভালো থাকুন মা, আমার মামনি।

পুনশ্চ : মাকে নিয়ে লেখাটা আমার ব্লগে ছিলো। গণমাধ্যমে দেয়া হয়নি সম্ভবত। আজ মনে হলো, দেয়া উচিত। মা দিবস বলে নয়। মা নেই বলে। মা থাকাকালীন আমার কোনো মা দিবস ছিলো না, আমার প্রতিটি দিবসেই ছিলেন মা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কাকন রেজা মা দিবস

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0801 seconds.