• ১২ মে ২০২০ ০১:০৭:১৭
  • ১২ মে ২০২০ ০১:০৭:১৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ভেড়ার পালের ইমিউনিটি অর্জন নাকি গিনিপিগ হওয়া?

ছবি : সংগৃহীত


আনিস রায়হান


করোনাভাইরাস যাতে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারও 'সাধারণ ছুটি' ঘোষণা করে দেশকে প্রায় অচল করে রেখেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রতিদিন করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। 'ভাইরোলজিস্ট' হিসেবে খ্যাত চিকিৎসকরা দাবি করছেন, বাংলাদেশে লকডাউন কাজ করছে না, রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এ অবস্থায় 'হার্ড ইমিউনিটি' অর্জন ছাড়া উপায় নেই।

শব্দগত ভ্রান্তির কারণে কেউ কেউ মনে করছেন, হার্ড ইমিউনিটি মানে শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। মানুষ ঘরে বসে থাকায় তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এখন সাধারণ ছুটি তুলে নিলে মানুষ বাইরে এসে চলাফেরা ও ছোটাছুটির মধ্যে পড়লে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে এবং তা করোনা মোকাবিলায় সহায়ক হবে। সুতরাং হার্ড ইমিউনিটি ছাড়া আসলেই কোন উপায় নেই।

হার্ড ইমিউনিটির হার্ড শব্দটার উচ্চারণ এইচএআরডি নয় বরং এইচইআরডি। ইংরেজি এই হার্ড শব্দটি এসেছে ভেড়ার পাল থেকে। ব্যাপার হলো, ভেড়ার পালকে সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে টিকা দেয়ার অভিজ্ঞতা থেকে একটি মেথড বা চিকিৎসাপ্রণালী গড়ে উঠেছে, যাকে হার্ড ইমিউনিটি বলা হয়। দেখা গেছে, কোনো ভেড়ার পালের ৮০ শতাংশকে যদি টিকা দেয়া হয় তাহলে বাকি ২০ শতাংশ এমনিতেই ওই রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে ফেলে। পরবর্তীকালে এই ২০ শতাংশের বংশধররা কোন টিকা ছাড়াই এই রোগ মোকাবিলা করতে পারে। প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় টিকে থাকার লড়াইয়ে এরাই সুবিধা পেয়ে থাকে।

সমস্যা হলো, করোনাভাইরাসের এখনো কোনো টিকা আবিষ্কার হয়নি। তাহলে হার্ড ইমিউনিটি কিভাবে অর্জন করা যাবে? বলা হচ্ছে, প্রচলিত নানা ওষুধের মাধ্যমে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করা হচ্ছে এবং এভাবে অনেকে সুস্থও হয়ে উঠছেন। এখন আশি ভাগ মানুষ আক্রান্ত হলে বড় একটা অংশ সুস্থ হয়ে উঠবে এবং ভাইরাসটির সংক্রমণের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাবে। এভাবে আমরা টিকা ছাড়াই হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করতে পারব।

বাংলাদেশে যদি হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করতে হয় তাহলে আশি শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ১৫ কোটি মানুষকে করোনায় আক্রান্ত হতে হবে। সরকার এখনো হার্ড ইমিউনিটির পথ গ্রহণের ঘোষণা দেয়নি। কিন্তু জনমানুষ মনে করে সত্যটা হয়তো এখনই জানা যাবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেরকম অনেককে ধরে নিয়ে গিয়ে প্রথমেই স্বীকার করে না, অনেক পরে তাকে বের করে দেয়, সরকারও তেমনি এসব বিষয়ে সত্যটা পরে স্বীকার করবে। যাই ঘটুক এটা অন্তত পরিষ্কার যে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো এখনো কথিত ওই 'হার্ড ইমিউনিটি'র পথকেই সমর্থন জোগাচ্ছে।

ভাইরাস সংক্রমণের বিপদ এখনো কমেনি। বরং করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্যেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন, দোকানপাট খুলে দিয়ে চলমান অচলাবস্থা নিরসনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অথচ গণমানুষের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করে লকডাউন চালিয়ে যাওয়াটাই সমীচীন হতো। এমন দুর্যোগকালীন সময় মানুষের চাহিদার জোগান দেয়াটা ছিল রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে সরকার ব্যর্থ তো হয়েছেই, এমনকি লকডাউন অকার্যকর হওয়ার দায়ও সরকারের কম নয়।

আমরা দেখেছি সরকার সাধারণ ছুটির ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু অচলাবস্থায় মানুষ কীভাবে চলবে তার ব্যবস্থা করেনি। যদিও লকডাউন সফল করতে প্রয়োজন ছিল দরিদ্র ও মধ্যবিত্তসহ স্বল্প আয়ের মানুষদের দুর্যোগকালীন রেশন বা অর্থ সহায়তার ব্যবস্থা করা, কিন্তু তা করা হয়নি। এতদিন ধরে দেখা গেল, সরকার গরিবদের রাস্তায় নামতে, কাজে যেতে বাধ্য করছে আর ধনীদের বলছে ঘরে বসে থাকতে। অধিকাংশ মানুষকে অরক্ষিত রেখে কেবল অবস্থাসম্পন্নদের রক্ষার জন্য লকডাউন অব্যাহত রেখেছে। সরকারের এসব পদক্ষেপ শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্তদের লকডাউনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে বাধ্য করেছে।

এখন লকডাউন উঠে গেলে কী হবে? ব্যাপক হারে মানুষ আক্রান্ত হবে। কিন্তু আমাদের মতো দেশ, যেখানে করোনা চিকিৎসার মোটামুটি ব্যবস্থাও নেই, সেখানে প্রচুর মানুষ আক্রান্ত হলে তারা চিকিৎসা কোথায় পাবে? অভিযোগ রয়েছে, করোনার লক্ষণসম্পন্ন রোগীরা চিকিৎসা না পেয়ে হাসপাতালের দরজায় ঘুরে ঘুরে রাস্তায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। যারা হাসপাতালে জায়গা পাচ্ছেন, তারা চিকিৎসা পাচ্ছেন না। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ভীতি এখনো দূর হয়নি। এই যখন অবস্থা, মাত্র ১৫ হাজার রোগী সনাক্ত হওয়াতেই যেখানে চিকিৎসার এমন অব্যবস্থাপনা, সেখানে টিকাবিহীন হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করতে কত বড় মূল্য চোকাতে হবে?
১৫ কোটি মানুষ আক্রান্ত হলে, যদি তার মধ্যে আধা শতাংশও মারা যায়, তাহলে সেই সংখ্যাটা হবে কম করে হলেও সাড়ে সাত লাখ। এই বিপুল পরিমাণ মানুষের জীবন/মৃত্যুর সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে নেয়া হচ্ছে। সরকার জেনেবুঝেই এই পথে হেঁটেছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। তবে সঠিক করণীয় সম্পর্কে বিবেচক মানুষদের নানা পরামর্শ থাকতেও সরকার তা কানে তোলেনি। সরকারের কর্মকাণ্ডের ফলেই আজকের অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ভালো বা খারাপ যাই হোক, তারা তা চাক বা না চাক, এর দায় তাদেরই। 
যুক্তি-বুদ্ধিতে কিছু শান দেয়া গেলে অবশ্য আরও অনেক ইঙ্গিত মেলে। মনে হয় যেন পুরো ব্যাপারটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া, এখন যা পরিণতির পথে এগোচ্ছে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, ১) সহজে মোকাবিলার পথ হলেও বিমানবন্দরে করোনা আক্রান্তদের সনাক্ত ও তাদের আলাদা করা হয়নি। ২) আমরা প্রস্তুত বলে হুঙ্কার দেয়া হয়েছে কিন্তু আসলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। ৩) লকডাউনের কথা বলে গণপরিবহন চালু রেখে 'সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সারাদেশে করনা ছড়ানোর সুযোগ করে দেয়া হলো। ৪) বলা হয়েছে লকডাউন কিন্তু মানুষকে ওএমএসের চাল কিনতে রাস্তায় লাইনে দাঁড়াতে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের পায়ে হাঁটিয়ে কারখানায় নেয়া হয়েছে। ৫) জনগণের অর্থে সঞ্চিত তহবিল থেকে কিছু ব্যয় করে আরও কিছুকাল লকডাউন চালিয়ে গিয়ে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকতেও তা না করে অসংখ্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সবকিছু খুলে দেয়া হচ্ছে।
এসবের সারকথা হলো, সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কারণেই করোনা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পেরেছে। একটু লক্ষ্য করলে দেখবেন বাংলাদেশে করোনায় চিকিৎসা পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়নি, কিন্তু এর মধ্যেও করোনার ওষুধ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গণস্বাস্থ্য যদিও একটা কিট বানানর ব্যবস্থা করে উঠতে পারে না, কিন্তু বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো ঠিকই মুখ থেকে পড়ার আগেই ওষুধ বানিয়ে দামও ঠিক করে ফেলেছে। দেশের মানুষের ওপর ওই ওষুধ প্রয়োগে সংশ্লিষ্টদের আগ্রহও বিবেচ্য।

কিছু বিষয় পূর্ব পরিকল্পিত হতে পারে, আবার ঘটনার গতি-প্রকৃতিও আজ আমাদের এখানে এনে দাঁড় করাতে পারে। যেটাই ঘটুক না কেন বাস্তবতা হলো, হার্ড ইমিউনিটির নামে এখানকার লোকেরা গিনিপিগ হতে যাচ্ছে বা তাদের তা বানানো হচ্ছে। আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, মানুষ গিনিপিগ হওয়ার বদলে সম্মানী/মজুরি পায়। কিন্তু আমাদের বিতর্ক করতে হচ্ছে, আমরা কি বিনামূল্যে গিনিপিগ হব নাকি গিনিপিগ হওয়ার গর্ব ধারণ করতে মোটা অঙ্কের দামও চোকাব?

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী

সংশ্লিষ্ট বিষয়

করোনাভাইরাস বাংলাদেশ

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0745 seconds.