• ১৩ মে ২০২০ ১৬:০০:১৬
  • ১৩ মে ২০২০ ২০:৪৬:৪৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

মহামারী দুর্যোগ বেয়ে হত্যার শিকার এক সাংবাদিকের বাবার আকুতি

কাকন রেজা। ফাইল ছবি


কাকন রেজা :


মানুষ মহাদুর্যোগে। মহামারি চলছে, চারিদিকে অসুস্থতা আর মৃত্যুর খবর। এরমধ্যেই আমার ছেলেটা চলে যাওয়ার একবছর পুরো হয়ে গেলো। ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন, হ্যাঁ, সাংবাদিক ফাগুন রেজা’র কথা বলছি। অনেকেই হয়তো ভুলে গেছেন, এক বছর আগে বাড়ি ফেরার পথে নিখোঁজ হয়েছিলো সে।

পরে তার মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিলো জামালপুরের কাছে রেললাইনের ধারে। গতকাল ১৭ রমজান। আরবি মাস অনুযাযী এই ১৭ রমজানেই হত্যা করা হয়েছিলো ফাগুনকে। আর ইংরেজি মাস অনুয়ায়ী ২১ মে।

একবছর হয়ে গেলো। অনেকের কাছেই দীর্ঘ সময়, কিন্তু আমার কাছে মনে হয় কাল। কালও ছিলো ফাগুন। মনে হয় কাল রাতেও বলেছে, ‘সাহরি খাবে না আব্বুজি।’ সেদিন রাতেও সাহরি খেয়ে ভোরে বেড়িয়ে গিয়েছিলো সে, পরদিন ফিরেছে তার দেহ, প্রাণহীন। 

প্রতিমাসেই ফাগুনকে নিয়ে আমার অন্তত দুটি লেখা থাকে। যখন খুব খারাপ লাগে তখন লিখতে বসি। এছাড়া আর কিই বা করতে পারি। অথচ করোনাকালে ওকে নিয়ে আমার লেখা হয়নি। শুধু গতমাসে মেহেদি নামের গণমাধ্যমকর্মী ছেলেটি যখন করোনায় আক্রান্ত হলো তখন ওকে নিয়ে লিখতে গিয়ে ফাগুনের প্রসঙ্গ এসেছিলো। গতমাসে সেই একটি লেখাই আমার ওকে নিয়ে। লিখতে গিয়েও লিখিনি। মানুষ এমনিতেই আতঙ্কিত হয়ে আছে, প্রিয়জনের অমঙ্গলের আশঙ্কায় সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত। এরমধ্যে আমার বাচ্চাটাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে কাউকে আরো ভারাক্রান্ত করে দিতে মন চায়নি। আজ লিখতে বসলাম আরেক বাচ্চার লিখা দেখে। ফাগুনের বন্ধু আসিফ জামান লিখেছে ওকে নিয়ে। ১৭ রমজানে ফাগুনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী ধরে নিয়ে আসিফ লিখেছে, ‘এক বছর হলেও আজ অবধি ফাগুন হত্যার বিচারতো দূরের কথা মৃত্যুর রহস্যের কুল-কিনারা হয়নি এবং আমি এটাও জানি ফাগুনের হত্যার বিচার কেয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করলেও পাবে না। আর কেনোই বা পাবে, তার পরিবারতো আর হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক না।’

বাবা হিসাবে আমার আক্ষেপ কখনো প্রকাশ করিনি, বলিনি বিচার পাবো না। কারণ আমি আশা ছাড়িনি। বারবার মনে হয়েছে, আমার সৎ, নির্লোভ আর মেধাবী ছেলেটাকে যারা মেরেছে তারা রেহাই পেতে পারে না, পাওয়া উচিত নয়। তাহলে ‘ইহ’ এব ‘পর’ দুটো কালেরই বিচার ব্যবস্থা প্রশ্নের মুখে পড়বে। আসিফ লিখেছে, ‘এই দুনিয়াটা ভাই এমনেই চলে না। ফাগুনের মত কিছু সৎ মানুষের জন্যই আল্লাহপাক এই দুনিয়াটা টিকিয়ে রেখেছেন আর আমরা বেঁচে আছি।’ সুতরাং বিচার হতেই হবে। বাবা হিসাবে এটা আমার আশার কথা। কিন্তু বিচার বিষয়ে আসিফের আক্ষেপটা সার্বিক। আমাদের ইহলৌকিক বিচার ব্যবস্থার উপর ক্রমাগত জমে উঠা ক্ষোভের প্রকাশ এটা। চোখের সামনে দেখা সাগর-রুনি, তনু, আফসানাসহ নানা হত্যাকান্ডের বিচারহীনতাই এরজন্যে দায়ি। এই ক্ষোভ অসঙ্গত নয়। এই ক্ষোভ অনর্থকও নয়। 

একটা বছর কম সময় নয়। ফাগুনের খোয়া যাওয়া ফোন উদ্ধার হয়েছে। একজন গ্রেপ্তার হয়েছে এবং যারা খুনের জন্য দায়ি তার সাথে গ্রেপ্তারকৃতের নিশ্চিত যোগসাজশ রয়েছে। কারণ সে স্বীকার করেছে সেই ব্যক্তির নাম যে তাকে ফোনটি বিক্রি করতে দিয়েছিলো। এতসব নিশ্চিত সূত্র থাকার পরও সেই ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়নি। কেনো হয়নি সেটা এক রহস্য। তারপরেও আমি আশায় আছি এই ভেবে যে, অনেকদূর এগিয়েছে পুলিশ, হয়তো কিছু একটা হবে। তবে পুলিশের কাজেও বাধা এসেছে। কিভাবে এসেছে, কারা এরা, এসবও হয়তো বেড়িয়ে আসবে এক সময়। আমি সেই সময়ের অপেক্ষায় আছি। 

একজন পিতা, যখন তার সন্তানকে হারায়, সে কষ্টকে পৃথিবীর কোন কষ্ট দিয়েই পরিমাপ করা যায় না। করা সম্ভবও নয়। আমি নিজে আমার পিতাকে হারিয়েছি। বন্ধুর মত পিতা। মাকে হারিয়েছি। এমন মা খুব কমই হয়। কষ্ট পেয়েছি, বুক ভেঙে গিয়েছে। কিন্তু সন্তান হারানোর কষ্ট, এর কাছে কিছুই না। কারণও রয়েছে। মা-বাবা’র ক্ষেত্রে আমাদের মাইন্ড সেটআপ করাই থাকে, তারা চলে যাবেন। সন্তানের ক্ষেত্রে সেটা কোনভাবেই থাকে না। কোন মা-বাবাই ভাবতে পারেন না, তাদের আগে তাদের সন্তান চলে যাবে। সেজন্যেই পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বোঝা হিসাবে বাবা’র কাঁধে সন্তানের লাশকে বলা হয়েছে। এই বলাটা এমনিতেই নয়, সেই কষ্টের ওজন অনুভব করেই বলা। 

আমি শুধু সন্তান হারাইনি, হারিয়েছি আমার সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গাটি। আমার সুখ-দুঃখ শেয়ার করার মানুষটি। চুড়ান্ত মেধাবী, নক্ষত্রের মতন জ্বলজ্বলে বাচ্চাটিকে। সব সময় ভাবতাম এত মেধাবী মানুষ কিভাবে হয়। প্রতিটি কথার পেছনেই কারণ আর যুক্তি থাকতো ফাগুনের। প্রায় সময়ই যুক্তিতে তার কাছে হেরে যেতাম আমি। সেই হারার আনন্দ কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়। তেমন স্বার্থক পিতার পক্ষেই বোঝা সম্ভব সেটা। হ্যাঁ, গর্ব করে বলি, পিতা হিসাবে আমি স্বার্থক। এই অল্প বয়সেই আমার ছেলেটা, ছেলে থেকে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠেছিলো। একজন মানুষের মানুষ হয়ে উঠার যতগুলো গুন দরকার সবই ছিলো আমার ফাগুনের মধ্যে।

সততা, প্রতিশ্রুতি, মেধা এই তিনের সম্মিলন খুব কম মানুষের মধ্যে দেখা যায়। ফাগুন সেই খুব কম মানুষের একজন। এমন সন্তানের পিতা হয়ে তো গর্ব করাই যায়। ফাগুন নিজে চলে গেছে আর আমাকে রেখে গেছে এক গর্বিত পিতা করে। শুধু তাই নয়, ওর দেয়া কাপড়, পাঞ্জাবি আমার গত ঈদে পড়া হয়েছে। ওর বেতন থেকে দেয়া টাকাও এখনো জমা রয়েছে আমার একাউন্টে। একজন পিতার এরচেয়ে বেশি আর কী চাই একজন পুত্রের কাছ থেকে।  

আজ এই দুর্যোগের সময় আমি নিজেও ভীত। কারণ আমার ভরসার মানুষটি নেই। ফাগুন থাকলে আমি ভরসা করতে পারতাম। নিশ্চিত থাকতাম, আমি না থাকলেও আমার পরিবারকে দেখে রাখার মতন একজন রয়েছে। মনে শান্তি থাকতো, বংশ পরম্পরায় লেখালিখি এবং সাংবাদিকতার যে ধারাটি চলে আসছিলো সেই ধারাটি ক্ষুন্ন হবে না। মানুষ জানবে, না পরম্পরাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার মতন কেউ রয়েছে। ফাগুন নেই, এই কথাটি বিশ্বাস করতে আজো তাই মন সায় দেয় না। সায় দেয় না ওর এভাবে চলে যাওয়াকে জোর করে মেনে নিতে। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং নিহত সাংবাদিক ফাগুন রেজা’র বাবা।

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0780 seconds.