• ১৫ মে ২০২০ ২২:৩৮:৫৭
  • ১৫ মে ২০২০ ২২:৩৮:৫৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

করোনাজয়ী ভিয়েতনামকে বলতেই হচ্ছে ‘লাল সালাম ভিয়েতনাম’

ছবি : সংগৃহীত


আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি :


এখন পর্যন্ত কোন প্রাণহানী না ঘটিয়েই ভিয়েতনাম করোনা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে। অনেকটা স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে আসতে শুরু করেছে ভিয়েতনামে। অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে ফিরতে শুরু করেছে। হাট-বাজার-মার্কেট খুলতে শুরু করেছে। ঝুঁকি কিংবা করোনা আতঙ্কনির্মূল করার পরই তারা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরতে শুরু করেছে।

গত এক সপ্তাহে ভিয়েতনামে নতুন করে কোনো করোনা রোগী শনাক্ত হয়নি। ভিয়েতনামের স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মে পর্যন্ত ভিয়েতনামে মোট করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩১২ জন। যাদের ভেতর ২৬০ জন সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরছে। চিকিৎসাধীন থাকা ৫২ জনের ভেতর কয়েকজন ছাড়া বাকিরাও সুস্থ হওয়ার পথে। তাদেরকেও সুস্থ করে তুলতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে কাজ করছেন চিকিৎসকরা। শুধু স্বজনরাই নয় পুরো ভিয়েতনামই তাদের সুস্থতার জন্য অপেক্ষা করছেন।

দেশটিতে মোট আক্রান্ত ৩১২ জন করোনা রোগীর ভেতর সর্বশেষ ২৪ জন রোগী ছিলো রাশিয়ার মস্কো থেকে আসা ভিয়েতনামি নাগরিক। তারা মস্কো থেকেই করোনা আক্রান্ত হয়ে দেশে ফেরেন। তাদেরকে ভিয়েতনাম সরকার দেশে ফিরিয়ে এনে চিকিৎসা করছে আলাদাভাবে। এই হচ্ছে ভিয়েতনামের সর্বশেষ করোনা পরিস্থিতির তথ্য।

আমাদের প্রেক্ষাপট এবং চিন্তার করা বা করানোর ধরন অনুযায়ী এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে ইউরোপ-আমেরিকা করোনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি সেখানে ভিয়েতনাম কিভাবে পারলো? ভিয়েতনাম সরকার যে তথ্য দিচ্ছে তা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য না কি এখানে তথ্য গোপন করার কোন বিষয় আছে? উত্তর হচ্ছে,, ভিয়েতনামে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক এবং চিকিৎসকরাও সরকারের দেয়া তথ্য নিয়ে কোনো রকম সন্দেহ পোষণ করেননি। তারা সরকারি তথ্যকে জোরালোভাবেই সমর্থন করেছেন।

বিবিসিকে দেয়া এক স্বাক্ষাতকারে ভিয়েতনামের চিকিৎসক অধ্যাপক থোয়াটস জানায়, করোনা প্রতিরোধে সরকারের দেয়া তথ্যে কোন গরমিল নেই। তিনি বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলেন, ‘তার চিকিৎসক দল দেশটির প্রধান সংক্রামক হাসপাতালে ২০ হাজার টেস্ট করেছিলো। সেখান থেকে পাওয়া তথ্য আর সরকারের দেয়া তথ্যের ভেতর কোনো পার্থক্য বা গরমিল খুঁজে পাননি।’

কিভাবে এই সফলতা এলো? যেখানে দেশটির সাথে চীনের রয়েছে নিবির যোগাযোগ। প্রতিদিন চীন ও ভিয়েতনামে হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করে। ভিয়েতনামের সাথে চীনের রয়েছে ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটারের সীমান্ত। দুই দেশের ভেতর বাণিজ্যিক সম্পর্কটাও খুব জোরালো।

ভিয়েতনামের এই সফলতার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক দূরদর্শি সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এফপি একটি প্রতিবেদনে বলে, “ভিয়েতনামে কমিউনিস্ট পার্টির ‘অস্ত্রগুলোই’ সাহায্য করেছে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সফল হতে।” অর্থ্যাৎ তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর কারণেই করনো মোকাবিলায় সফলতা এসেছে। খুব উন্নত চিকিৎসা কাঠামো যে ভিয়েতনামে আছে তা কিন্তু নয়। তবে তারা তাদের বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে আজ একটি সত্যিকার অর্থেই স্বস্তিদায়ক জায়গায় পৌঁছেছে।

তা নিয়ে ভিয়েতনামি চিকিৎসক অধ্যাপক থোয়াটস বলেন, ‘প্রতিরোধ সব সময়ই নিরাময়ের চেয়ে ভালো এবং সহজ ও খরচ কম।’ অর্থ্যাৎ রোগ হয়ে চিকিৎসার আগেই রোগকে হতে না দেয়া এর বিস্তার রোধ করার পদ্ধতিকেই বেছে নিয়েছেন তারা। ভিয়েতনাম সরকার জানতো তাদের বাস্তবতা, পরিবেশ পরিস্থিতি। ‘সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে’ বলে বক্তৃতা না দিয়ে বরং সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করে মাঠে নেমে পরেছিলো।

ভিয়েতনাম সরকার বুঝতে পেরেছিলো একবার এই রোগ বিস্তার ঘটে গেলে তাকে প্রতিরোধ করা কতটা দুঃসাধ্য কাজ হয়ে উঠবে। কত মানুষ প্রাণ সংকটের ভেতরে থাকবে। কত দীর্ঘমেয়াদি হবে সেই লড়াই। তাই প্রথম থেকেই ভিয়েতনাম সরকার করোনা প্রতিরোধে কড়াকড়ি অবস্থান গ্রহণ করে।

তারা জনগণের কাছে সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। তথ্য গোপন কিংবা তথ্যবিভ্রান্তি দূর করেছে নাগরিকদের মন থেকে। সরকার নিজ উদ্যোগেই করোনা পরীক্ষায় বেশ তৎপর হয়ে ওঠে প্রথম থেকেই। আক্রান্ত সম্ভাব্য রোগীর কাছ থেকে ফোন কল পাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে কোথাও এমন সম্ভাব্য কেস আছে কিনা তা নিজেরাই খুঁজে বেড়িয়েছেন। এমনকি ওষুধের দোকানে গিয়েও তথ্য সংগ্রহ করে তা যাচাই বাছাই করে দেখেছেন কি ধরনের ওষুধ নিচ্ছে জনগণ। এই তথ্যের ভিত্তিতেও সম্ভাব্য করোনা রোগীর অনুসন্ধান করেছেন সরকার। খাদ্য সংকট মোকাবেলায় কাজ করেছেন, আক্রান্ত হয়ে তথ্য গোপন করলে শাস্তি জারী করেছেন, ঘরে ঘরে গিয়ে সচেতনতা মূলক প্রচারণা চালিয়েছেন।

ছোট একটা উদাহরণ এখানে দেয়া যেতে পারে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুমার রানা নামের এক পর্যটক তার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বলেন, ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে তারা ভিয়েতনামে ছিলেন। ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে তার বাসার কলিং বেল বাজলে দরজা খুলে তিনি দেখেন এক ভিয়েতনামি হাতে একটি লিফলেট দিয়ে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত একগাদা সচেতনতা মূলক কথা বলে যান।

কুমার বলেন, ‘করোনা প্রতিরোধে ভিয়েতনাম স্বাস্থ্য দপ্তর যা যা কাজ করেছিল, তার মধ্যে শুধু বিজ্ঞাপন নয়, সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করাটা ছিল অন্যতম।’

আমাদের দেশের বাস্তবতায় দেখা গেছে, করোনা প্রতিরোধে শুধু প্রস্তুতির বয়ান। আর সেইসব কথায় আমরা বিভ্রান্ত হয়েছি নানাভাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো প্রতিদিন মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এমনকি হাসপাতালগুলো অরক্ষিত হয়ে পরছে। চিকিৎসক স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছেন। খোদ সরকারের সমর্থিত চিকিৎসক নেতারাও এখন বলছেন সঠিক প্রস্তুতির অভাবের কথা।

স্বাচিপের সভাপতি ডা. ইকবাল আর্সনাল বলেন, ‘কোভিড সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা না থাকা, বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত না নেয়া ও সময় পেয়েও প্রস্তুতি ছাড়া যুদ্ধের ময়দানে নামায় আজ এই বিপর্যয়।’ এমনকি চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের এ বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণও দেয়া হয়নি। (সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন)

যাই হোক, ভিয়েতনামের প্রস্তুতি ও পদক্ষেপগুলো যে শুধুমাত্র মৌখিক কথা না তা তার দেশের জনগণের স্বস্তি বার্তাই বলে দেয়। কোনো এলাকায় করোনা আক্রান্ত রোগী পেলে সেই এলাকা লকডাউন করে সাথে সাথে হাজার হাজার মানুষের টেস্ট করেছে। করোনা প্রতিরোধ লড়াইয়ে ভিয়েতনাম জানুয়ারি মাসে টেস্টিং কিট আমদানি করেছিলো কোরিয়া থাকে। তারপর এপ্রিলে দেখা গেলো ভিয়েতনাম পাল্টা কিট রপ্তানি করা শুরু করলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থাও এই কিটকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

অন্যদিকে যদি বাংলাদেশে তাকাই প্রথমে টেষ্ট করা নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তি আর অভিযোগ ছিলো জনগণের দিক থেকে অন্য দিকে কিট আবিষ্কার নিয়ে রীতিমত আরেককাণ্ড। গণস্বাস্থ্য যখন কিট আবিষ্কারের ঘোষণা দিলো তখন তা পরীক্ষা নিরিক্ষা ছাড়াই ‘টকশো ট্রায়ালে’ ফেলে মোটামুটি কেউ কেউ আবিষ্কারকদের অপরাধীও বানিয়ে ফেললেন মৌখিকভাবে।

এখন সর্বশেষ পরিস্থিতি হচ্ছে ভিয়েতনামে গত বেশ কিছু দিন ধরে নতুন করে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা শূন্য, সেখানে বাংলাদেশ প্রতিদিনই আগের দিনের রের্কড ভেঙে ফেলছে। দেশে এখন করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়েছে।  

ভিয়েতনাম এখন নিরাপদ জায়গা। এই নিরাপত্তা নিশ্চই তাদের অর্থনীতিকে নতুন ভাবে গতিশীল করে তুলবে। তাদের শ্রমিকদের জন্যও কাজের পরিবেশ নিরাপদ হয়েছে। ভিয়েতনামকে অর্থনীতি সচল রাখতে করোনার হুমকিতে রেখে শ্রমিকদের ডেকে আনতে হয়নি কারখানায় বরং করোনামুক্ত করেই নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করেই তারা এখন হাসছেন স্বস্তির হাসি। আর এসব কিছুই নিশ্চই বিনিয়োগকারীদের আরো বেশি টানবে।

ভিয়েতনামের এই সফলতা তার দেশের গণমানুষের জীবনযাত্রাকে নিরাপদ করতে পেরেছে। ১৭ বছর লড়াই করে দেশকে শত্রু মুক্ত করেছিলো ভিয়েতনামের জনগণ। আমেরিকার চালানো চরম ধ্বংসযজ্ঞ ও নির্যাতনের মুখেও মাটি কামড়ে লড়াই করেছিলো সেদেশের মানুষ। তখন এই বাংলাদেশের তরুণরা স্লোগানতুলে ছিলো- ‌‌'লাল সেলাম ভিয়েতনাম!' আজ এই সময়ে এই করোনা আক্রান্ত জনপদে দাঁড়িয়ে করোনা জয়ী সুদূর ভিয়েতনামকে বলতেই হচ্ছে- ‘লাল সালাম ভিয়েতনাম’

লেখক: সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ভিয়েতনাম করোনাভাইরাস

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0792 seconds.