• ১৬ মে ২০২০ ১৭:০৯:৪২
  • ১৬ মে ২০২০ ১৭:০৯:৪২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

মৃত্যু নিয়ে কাটাকুটি খেলা নয়

ফাইল ছবি


কাকন রেজা :


এক ধরণের কাটাকুটি খেলা চলছে। মৃত্যুকে মৃত্যু দিয়ে কেটে দেয়ার খেলো। কয়েকটি গণমাধ্যম দেখলাম রিপোর্ট করেছে ‘একমাসে ক্রসফায়ার আর হেফাজতে ১০১ মৃত্যু’। সড়ক দুর্ঘটনায় কত জন মারা গেছে তার হিসাবও দেখলাম গণমাধ্যমে। কেউ কেউ আবার ডেঙ্গুতে মারা যাবার সম্ভাবনাটাও মনে করিয়ে দিচ্ছে।

কোন দায়িত্বশীল দেখলাম অবলীলায় বলে যাচ্ছেন, আমাদের দেশে এমনিতেই প্রতিদিন কত লোক মারা যায়। হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়, স্রোছেকে মারা যায়, ক্যান্সারে মারা যায়, ইত্যাদি ইত্যাদি। চারিদিকে যেন মৃত্যুর উৎসব। আহা মৃত্যুটা তেমন কিছু নয়। এটাও এক ধরণের উৎসব বলে মেনে নাও। তোমরা এত ভাবছো কেনো করোনায় মৃত্যু নিয়ে। এটা তো কোনো ব্যাপারই না। পরিসংখ্যান দেখো, তবেই বুঝতে পারবে মৃত্যু কত সহজ, কত অগুরুত্বপূর্ণ! 

হ্যাঁ, তাই বোঝানো হচ্ছে মূলত। তুলনা করিয়ে দেয়া হচ্ছে হেফাজতে, ক্রসফায়ারে মারা গেছে ১০১ জন, সড়ক দুর্ঘটনায় দু’শয়ের অধিক। তো করোনা কোনো ব্যাপারই না। এতদিনেও দু’শর ঘর ছাড়াতে পারেনি। সো, নো চিন্তা ডু ফুর্তি। মার্কেট খোলা হয়েছে, শপিং মল উন্মুক্ত যাও কেনাকাটা করো, উৎসবের আয়োজন করো। মৃত্যু নিয়ে দুঃশ্চিন্তা নয়, তারচেয়ে গাও, নাই নাহি ভয়। জানি, অনেকে রাগ করবেন, বলবেন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড নিয়ে প্রতিবাদ হবে না। নিশ্চয়ই হবে, এর প্রতিবাদ আমি নিজে করে আসছি, করবো। কিন্তু কিছু সময় কিছু উদাহরণ মূল সমস্যাটাকে সরলিকরণ করে ফেলে, মানুষ বিভ্রান্ত হয়। এখন যা প্রয়োজন ফোকাসটাকে সেভাবেই রাখা উচিত। এখনের সমস্যাটা সার্বিক। এখানে কোনো পক্ষ-বিপক্ষ নেই। এখানে আমজনতা মহামারিজনিত মৃত্যুর মুখোমুখি। সুতরাং এমন মৃত্যুকে অন্য মৃত্যু দিয়ে সরলিকরণের কিছু নেই। 

মেজাজ খারাপ করেই মূলত এই লিখার শুরু। কোনো কিছুতেই সঠিক পরিকল্পনা নেই, সমন্বয় নেই। যখন যা ইচ্ছ বলে দিলাম। ইচ্ছে হলো বলে দিলাম ‘খুল যা ছিমছিম’। এ যেন আরব্য রজনী, আলিফ লায়লা। জাদু বাস্তবতায় বসবাস। সব ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে হাইপোথিসিসে। লকডাউন চলছে। কিন্তু এরমধ্যে পোশাক কারখানা খুলে দেয়া হলো। এর কারণটাও অস্পষ্ট। বলা হলো, অর্ডার বাতিল হয়ে যাচ্ছে। আরে, অর্ডারতো এমনিতেই বাতিল হয়ে যাবার কথা। সারাবিশ্বই লকডাউনে। আমাদের তৈরি পোশাকের যারা গ্রাহক, তারাওতো লকডাউনে। তাদের ব্যবসা বানিজ্যওতো বন্ধ। তাহলে ডেলিভারিজনিত কারণে অর্ডার বাতিল হবার যুক্তি কতটুকু! না, তেমন কোনো যুক্তি নেই, থাকলেও আমরা জানি না। দু’একটা গণমাধ্যমে রিপোর্ট হয়েছে, কিন্তু সে রিপোর্টও অস্পষ্ট, ধোঁয়াটে। মূলত সেসব রিপোর্ট পোশাক কারখানা খোলার দায়মুক্তি বা প্রস্তুতিপর্ব বলেই মনে হয়েছে। 

দুটো মাসের বিপর্যয় সইবার ক্ষমতা নেই আমাদের পোশাক শিল্পের! বিশ্বাস হয় না। আর বিশ্বাস না হবার কারণ আমাদের পোশাক কারখানার উন্নতি বিষয়ে প্রচারণা। হ্যাঁ, সেটা যে প্রচারণাই ছিলো, তা করোনাকালে বোঝা গেলো। আর যদি তাই না হয়, তবে পোশাক শিল্প মালিকরা অর্থলোভী এবং ক্ষমতাবান। যারা নিজ স্বার্থে রাষ্ট্রকেও প্রভাবিত করতে পারে নাগরিকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে। কথাটা শুনতে খারাপ শোনায়, তবে যদি প্রশ্ন করা হয়, শ্রমিকদের জীবন রক্ষায় ব্যবস্থা কী নেয়া হয়েছে, উত্তরটা কী হবে? বলা হবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা খোলা হয়েছে। বুঝলাম কারখানার বাইরে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিশ্চয়তা কে দেবে? গাদাগাদি করে থাকা, এক শৌচাগার ব্যবহারের বিষয়টি কে দেখবে? কারখানার বাইরে তারা করোনায় আক্রান্ত হবে না, এমন গ্যারান্টি কোথায়? নেই। তাহলে? 

বলা হবে, এতগুলো শ্রমিকের তো চলতে হবে। তো এতদিন আপনাদের তারা চালালো। বাড়ি করলেন, গাড়ি করলেন, হাজার কোটি টাকার মালিক হলেন, তারপরও দুই মাস শ্রমিকদের চালাতে পারবেন না! এমন কথা বিশ্বাস করতে বলেন? আপনাদের একটা গাড়ির দামেই তো বহু শ্রমিকের একমাসের বেতন হয়ে যায়। হ্যাঁ, আপনাদের ব্যবহৃত অডি, লিমুজিন, নিদেনপক্ষে হ্যারিয়ারের কথা বলছি। এগুলোর দাম কত, বলে দিন মনুষকে। তারপর নিজেদের প্রণোদনার কাসুন্দি গান। 

এখন আসি ঈদের দোকানপাট আর শপিং মল খোলার ব্যাপার। বসুন্ধরা, যমুনা তাদের শপিংমল না খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভালো কথা। এসব  মলগুলো হলো বড়লোকদের চারণক্ষেত্র। এখানে বিনিয়োগও কোটি কোটি টাকা। দোকানি যারা আছেন তাদের দু’মাস বসে গেলেও কিছু যায় আসবে না। তাদের কথা বাদ। কিন্তু যারা ছোটখাটো দোকানি, ফুটপাতের দোকানওয়ালারা। যারা দুটি ঈদের আশায় বছর ভর অপেক্ষা করে। যাদের দুটি ঈদের ব্যবসায়, উপার্জনে বছরের ছয়মাস চলে। ঋণের টাকা শোধ হয়। মেয়েটার বিয়ে হয়। তাদের কী হবে? বড়লোক মার্কেটওয়ালারা নয় বসে খেতে পারবেন। তাদের দুটো ঈদের উপার্জন না করলেও চলবে। তারা নিজ জমানো টাকা দিয়েই পাড়ি দিতে পারবেন করোনাকাল। কিন্তু সেই ছোট দোকানি, ফুটপাতওয়ালারা কী দিযে পাড়ি দিবে এই দুর্যোগ? গার্মেন্টস মালিকরা প্রণোদনা পাচ্ছেন, পাচ্ছেন বড় ব্যবসাদাররা। এদের কী হবে? এদের প্রণোদনা কে দেবে?

হাইপোথিসিস ভালো, তবে হাইপোথিসিস থেকে ব্যবস্থা নিতে গেলে, সেই ব্যবস্থার প্রায়োগিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঠেকাতেও ব্যবস্থা তৈরি রাখতে হয়। সে অনুযায়ী এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য চিন্তা করা উচিত ছিলো। লকডাউনের চিন্তার সাথে সাথে, আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অবস্থা। তাদের শ্রেণি বিন্যাস, তাদের প্রয়োজন নির্দিষ্ট করা উচিত ছিলো। তারপর সেই প্রয়োজন মেটানোর পরিকল্পনা এবং সেই পরিকল্পনা সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিলো। এসবের জন্য প্রয়োজন ছিলো একটি সম্মিলিত পরিকাঠামো গড়ে তোলা। তা হয়েছে কি? এই যে, কিছু লোককে খাদ্য সহায়তার নামে পাঁচ-দশ কেজি চাল, এক-দু কেজি ডাল, কিছু আলু, তেল দেয়া হচ্ছে এটা কি সম্মিলিত পরিকল্পনার অংশ মনে হয়? কখনো পুলিশ দিচ্ছে, কখনো সেনাবাহিনী দিচ্ছে, কখনো বা সিভিল প্রশাসন, আবার কেউ কেউ ব্যক্তি উদ্যোগে। এগুলোকে কি সমন্বিত পরিকল্পনা? মনে হয় নাতো। হওয়ার কথাও নয়। হলে সম্মিলিত একটি কাঠামো থাকতো যার মাধ্যমে শ্রেণি বিন্যাস অনুয়ায়ী পরিমান সুনির্দিষ্টি করে পৌঁছানো হতো দুর্গতদের মধ্যে। এখন কী হচ্ছে, গণমাধ্যমে দেখছি অমুক রাতের বেলায় ঘরে খাবার পৌঁছে দিলো। আমরা ধন্য হয়ে গেলাম। আর কোন চিন্তা নেই! অথচ হিসাব করে দেখা হলো না কয় প্যাকেট খাবার পৌঁছলো। কত ঘর পেলেন, কত ঘর পেলেন না, কত ঘরের প্রয়োজন ছিলো। আর যারাই পেলেন তাদের কতদিন চলবে। কোনো হিসাব নেই, কারো কাছেই নেই। তাহলে?

আপনার ব্যাকআপ নেই। ব্যাকআপ কাঠামো নেই। মানুষকে বাঁচানোর সমন্বিত পরিকল্পনা নেই। অথচ সব বন্ধ রাখতে বলছেন। কেনো বলছেন, কোন অধিকারে বলছেন? করোনায় মৃত্যুর হার কি ক্ষুধায় মৃত্যুর হারের চেয়ে বেশি? শুধুমাত্র এই জবাবটা দিন, তারপর সব বন্ধ করে দিন। নাহলে মানুষকে খাদ্য নিরাপত্তা দিন। গণমাধ্যমে কিন্তু অভাবে আত্মহত্যার খবর এসেছে ইতোমধ্যে। অ্যামেরিকার মতন দেশ বলছে হতাশ মানুষের মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতা দেখা দিতে পারে। আর আমাদের কী হবে? ১৬ থেকে ১৮ কোটি মানুষের দেশে পঞ্চাশ লক্ষ পরিবারের মধ্যে এককালীন আড়াই হাজার টাকা অবস্থার খুব বড় রকমের পার্থক্য গড়ে দিতে পারবে কি? আড়াই হাজার টাকায় একটা পরিবারের কদিন চলে তার কি গাণিতিক পরিসংখ্যান আছে? চাহিদা আর জোগানের প্রকৃত ব্যালেন্সশিটটা কি জানা আছে দায়িত্বশীলদের?

এখন আমাদের কাজ কী, এমন প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক। এখন এই মুহূর্তে বড় কাজ হলো মানুষকে সহায়তা প্রদানের জন্য দ্রুত একটি পরিকাঠামো গড়ে তোলা। দেশের দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থার যে একটা পরিকাঠামো রয়েছে তাকে কাজে লাগানো। ভোটার তালিকার ডাটা বেইজটাকে কাজে লাগানো। একটা মোটামুটি আন্দাজ গড়ে তোলা আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠী সম্পর্কে। বাগাড়ম্বর নয়, এটা বাগাড়ম্বরের সময় নয়, আমরা মুখে না বললেও মোটামুটি জানি, আমাদের বেশিরভাগ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা কী। তারা নিজে থেকে কোন শ্রেণি অনুযায়ী কত দিন নিজেদের ব্যাকআপে চলতে পারবে। সে অনুযায়ী আপাতত তাদের একমাসের ব্যাকআপের ব্যবস্থা করতে হবে। আর সেটা পৌঁছাতে হবে সঠিক ভাবে তাদের হাতে। এখানে চালচোর ছ্যাচরাদের বাদ রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে এটা জরুরি সময়, এখানে সিদ্ধান্তটা গুরুত্বপূর্ণ, দোদুল্যমনতার কোনো সুযোগ নেই। 

এরপর লকডাউন করে দেন। একটা উপজেলায় যদি খাদ্য সহায়তার টার্গেট পূরণ হয় তাকে টাইট লকডাউন করা হোক। একেবারে কার্ফ্যু টাইপ লকডাউন। এরপর জেলা, বিভাগ লকডাউন করে দিন। কোথাও কোনো শব্দ হবে না নিশ্চিত থাকুন। এতে সংক্রমন বাগে আনতে পারবেন, কদিন পরে ধীরে ধীরে সব খুলেও দিতে পারবেন। অনেকে ভাবছেন অনেক সময়ের ব্যাপার। মোটেই না, ফাইল চালাচালি হলে সময়ের ব্যাপার, না হলে এক সপ্তাহ থেকে পনেরো দিনের মধ্যেই সম্ভব। আর সহায়তা দেয়ার অবস্থায় থাকলে, দেয়ার পর নয়, দিতে শুরু করার সময় থেকেই লকডাউন সম্ভব হবে। আমরা এমন অবস্থা যে দেখিনি তা নয়। সামারিক শাসন খারাপ নিঃসন্দেহে কিন্তু সে সময়ে এমন কিছু সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের নজির দেখেছি। গণতান্রিরডক শাসনেও জরুরি অবস্থা বলে একটা কথা আছে, এখন তেমনি রাজনৈতিক নয় তবে স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা। এখানে মানুষ বাঁচানোর প্রশ্ন। মানুষ বাঁচাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার বিকল্প নেই। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। 

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কাকন রেজা মৃত্যু

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0835 seconds.