• ১৯ মে ২০২০ ১৩:৪৫:৩৫
  • ১৯ মে ২০২০ ১৫:৩৮:১৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

জুটমিলে শ্রমিক অসন্তোষের কারণ কী

ফাইল ছবি


রুহুল আমিন :


“ক. সাধারণ ছুটির আগের দিন অর্থাৎ ২৫-০৩-২০২০ তারিখ এবং ছুটি শেষে অফিস খোলার দিন অর্থাৎ ০৬-০৫-২০২০ তারিখ মিলে যে সকল স্থায়ী শ্রমিকদের হাজিরা থাকবে কেবল তারাই ছুটিকালীন সুবিধাদি পাবেন।  তবে বদলি বা দৈনিকভিত্তিক বা অন্য কোনো ধরনের শ্রমিক (কাজ ব্যাতিত) ছুটিকালীন সুবিধাদি পাবেন না। ”
- বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন।  প্রতিটি মিলে ৩ মে পাঠানো বিজেএমসির নোটিশ।

রাষ্ট্রায়ত্ত্ মিলের শ্রমিকরা কাজ করলেই যে মজুরি পাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।  মজুরির জন্য কাজের পর তাকে আবার আন্দোলনে নামতে হয়। যার জন্য তারা কোনো পারিশ্রমিক পান না। আবার আন্দোলনের কারণে তাদের কখনো কখনো চাকরিও হারাতে হয়। অর্থাৎ এক সময় যে পাটকলে চাকরি করা ছিল শ্রমিকদের জন্য গর্বের ও মর্যাদার ব্যাপার, সেই মিলে চাকরি করা আজ যেন অপরাধ!

বিশ্বে প্লাস্টিক দ্রব্যকে এখন ক্রমান্বয়ে পরিহার করা হচ্ছে। বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে ন্যাচারাল প্রোডাক্ট।  সে কারণেই পাট-শিল্পের বাজার ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশের সরকারি পাটকলগুলোর অবস্থা দিনদিন খারাপ থেকে খারাপের দিকেই অগ্রসর হচ্ছে।  এই খারাপ অবস্থাটা ইচ্ছাকৃতই মনে হয়।  কেননা দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো যখন ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর পথে হাঁটছে, তখন বছরে বছরে বেড়ে চলেছে বেসরকারি পাটকলের সংখ্যা। 

আজ সরকারি পাটকলের সংখ্যা ২৬টি’তে এসে ঠেকলেও বেসরকারি পাটকলের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৮২টি। ফলে একজন সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে যে, পাট-শিল্পের আগামী দিনের সমস্ত সম্ভাবনাকে ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য অত্যন্ত চতুরতার সাথে এগোনো হচ্ছে।  বেশ কয়েক বছর ধরে মাসের পর মাস বেতন না পেয়েও রাষ্ট্রীয় পাটকল শ্রমিকদের অর্ধাহারে-অনাহারে থেকে মিলের মেশিনের সাথে যুদ্ধ করে যেতে হচ্ছে। বর্তমান বাস্তবতায় এটা যেন পাটকল শ্রমিকদের নিয়তি।

করোনা পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের অবস্থা আরো অবনতির দিকে গেছে।  সরকার সারাদেশের কর্মরত শ্রমিক (প্রাতিষ্ঠানিক), কর্মকর্তা- কর্মচারীদের সাধারণ ছুটির টাকা পরিশোধ করার নির্দেশ দিলেও নিজেরই প্রতিষ্ঠান বিজেএমসি মানছে না সেই নির্দেশনা।  রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি মিলের মধ্যে ৫টির অস্থায়ী প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক পাচ্ছে না কোনো সাধারণ ছুটির টাকা।  এর সাথে যুক্ত আছে ২৬টি মিলেরই প্রায় ২০ হাজার বদলি শ্রমিক।  তারাও এ সাধারণ ছুটির পাওনা থেকে বঞ্চিত। আবার এ সকল বদলি শ্রমিকদের একটি বড় অংশকেই গত ৮ মাস যাবৎ মিলে কাজ দেওয়া হচ্ছে না।  তাহলে তারা যাবে কোথায়, খাবে কী?

বদলি শ্রমিকদের অপর একটি অংশকে মিলের স্টাফ-কর্মচারী হিসেবে কাজ করানো হয়। মিলের কম্পিউটার অপারেটর, পিয়নসহ বিভিন্ন বিভাগে তারা কাজ করে।  কিন্তু দিন শেষে তারা ঐ বদলি শ্রমিকের হাজিরাই পায়।  কাজ করছে স্টাফ-কর্মচারীর, অথচ বেতন পাচ্ছে বদলি শ্রমিকের।  তারাও পাচ্ছে না সাধারণ ছুটির টাকাসহ সুযোগ-সুবিধা।  অথচ ঐ সকল বদলি ও অস্থায়ী কর্মচারীর কম্পোজেই বেতন হবে সকল স্টাফ-কর্মকর্তা-স্থায়ী শ্রমিকদের।  যে ছেলেটি বেতনের খাতা এক টেবিল থেকে আর এক টেবিলে বহন করে নিয়ে যাবে সে-ই পাবে না কোনো বেতন।  যাদের সংখ্যা মূল স্টাফদের তুলনায় অনেক বেশি।  যেমন, খুলনার প্লাটিনাম জুটমিলে স্থায়ী কর্মচারী মাত্র ৭ জন। বদলি কর্মচারী হিসেবে কাজ করছে ১০৪ জন। যশোরের জে জে আই মিলে ৫৪ জন স্থায়ী কর্মচারীর পাশাপাশি আছে ৭৯ জন বদলি কর্মচারী। একই দায়িত্ব পালন করে স্থায়ী কর্মচারীরা সাধারণ ছুটির বেতন পেলেও বদলি কর্মচারীরা সেটা পাচ্ছে না।

বৈশাখী ভাতা ও ঈদ বোনাসের বেলাতেও ঐ একই দশা। এক মিলে দুই নীতি।  অস্থায়ী ও বদলি শ্রমিক-কর্মচারীদের  বৈশাখী ভাতা তো দেওয়াই হচ্ছে না, ঈদ বোনাসের বেলাতেও নাকি অর্ধেক দেওয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে দেশের ৫টি (খালিশপুর জুটমিল, দৌলতপুর জুটমিল, কর্ণফুলী জুটমিল, জাতীয় জুটমিল ও ফোরাম কার্পেটস ফ্যাক্টরি  জুট মিল) মিলের প্রায় ১৫ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক (৫টি মিল সম্পূর্ণভাবে অস্থায়ী শ্রমিকদের দ্বারা পরিচালিত হয়) ও কয়েক হাজার বদলি শ্রমিক-কর্মচারীর অবস্থা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যার ফলেফলে ঐ ৫টি মিলের অস্থায়ী শ্রমিক ও অপর ২১টি মিলের বদলি শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে।

মিলগুলোর সিবিএ নেতারাও পারছেন না পরিস্থিতির কোন সমাধান দিতে।  করোনা পরিস্থিতি, প্রশাসনের ভয়ভীতি ও সরকার দলীয় রাজনীতি করার কারণে তারাও আজ শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আদায়ে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। আর নিজেদের না পারাটাকে আড়াল করতে আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে নানা ধরনের  ছলচাতুরীর।

কিন্তু শ্রমিকরা নেতাদের অপেক্ষায় আর বসে থাকতে চাইছে না। তারা দাবি করছে, “করোনার মধ্যে মিলে ঢুকে একসাথে যদি হাজার হাজার শ্রমিককে কাজ করতে হয়, তবে পাওনা আদায়ের জন্য রাস্তায় নামতে পারব না কেন?”

গত ১৬ মে, শনিবার সকালে খুলনার খালিশপুর জুটমিলে ঘটে গেছে এমন একটি ঘটনা। সকাল দশটায় বি শিফটের শ্রমিকরা মিলে ঢুকে কাজ না করে নিজেরাই বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা মেশিনে হাত না দিয়ে স্ব স্ব জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।  একটা পর্যায় তারা দলবদ্ধভাবে মিলগেটের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু ইতমধ্যে সিবিএ নেতারা খবর পেয়ে মিলে প্রবেশ করে।  মিলে ঢুকেই তারা অগ্রসরমান শ্রমিকদের ধমকাতে শুরু করে।  ধমক দিয়ে, চাকরি যাওয়ার ভয় দেখিয়ে ও খানিকটা আশ্বস্ত করে শ্রমিকদের তারা আবার কাজে যেতে বাধ্য করে।

রাগে-দুঃখে গরগর করতে করতে শ্রমিকরা কাজে যায় বটে কিন্তু সেই নিভানো আগুন যে কোনো মুহূর্তে জ্বলে উঠতে পারে। শ্রমিকদের দাবী, ‘আমরা ত্রাণ চাইনা, সাধারণ ছুটির পাওনা চাই।”

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0717 seconds.