• ১৯ মে ২০২০ ১৬:১০:০৮
  • ১৯ মে ২০২০ ১৬:১০:০৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিবর্তনে পারিবারিক চিকিৎসক পদ্ধতি

ডা. রতীন্দ্র নাথ মন্ডল। ছবি : সংগৃহীত


ডা. রতীন্দ্র নাথ মন্ডল :


সারা পৃথিবীতে ১৯ মে ‘বিশ্ব পারিবারিক চিকিৎসক দিবস’ বা ‘ফ্যামিলি ডক্টরস ডে’ হিসেবে পালিত হয়। ২০১০ সালে পারিবারিক চিকিৎসককদের বিশ্ব সংস্থা (WONCA) এটি প্রথম ‘পারিবারিক চিকিৎসক দিবস’ হিসেবে পালন করা শুরু করে।

ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থায় পারিবারিক চিকিৎসকদের ভূমিকার স্বীকৃতি প্রদানের জন্য এবং বিগত বছরে পারিবারিক চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি এবং আধুনিকায়ন সম্পর্কে সারা পৃথিবীর পারিবারিক চিকিৎসকদের জানানো এই দিনটি পালনের উদ্দেশ্য। বিশ্ব পারিবারিক চিকিৎসক দিবস এর এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো-Family doctors on the front line অর্থ্যাৎ কোভিড-১৯ চিকিৎসায় প্রথম সারিতে পারিবারিক ডাক্তার।

উন্নত দেশগুলোতে প্রতিটি এলাকার মানুষের জন্য একটি জেনারেল প্রাকটিস সেন্টার থাকে। সেই সেন্টারে ওই এলাকার সকল মানুষের চিকিৎসা হয়। কেউ চাইলেই ওই জেনারেল প্রাকটিস সেন্টারের বাইরে চিকিৎসা নিতে পারেন না। ওই জেনারেল প্রাকটিস সেন্টার এর চিকিৎসক যদি কোন রোগীকে রেফার করেন তবেই সেই রোগী বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে পারেন। প্রয়োজনভেদে ওই সেন্টার এর চিকিৎসক তার নির্ধারিত রোগীর বাসায় কলে যান এবং চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন। ওই সেন্টারের চিকিৎসকই ওই এলাকার নির্দিষ্ট মানুষদের পারিবারিক চিকিৎসক। 

আমাদের যেসব রোগ হয়, তার সবগুলোই জটিল রোগ নয়, এই রোগগুলোর বেশির ভাগই প্রাথমিক চিকিৎসায় সেরে যায়। এর জন্য একজন এমবিবিএস চিকিৎসকই যথেষ্ট। যদি কোনো রোগীর জটিল রোগ ধারণা করা হয় অথবা রোগী জেনারেল প্রাকটিশনার বা পারিবারিক চিকিৎসকের চিকিৎসায় সুস্থ না হোন তবেই ওই রোগীকে তার প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে রেফার করা হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা শেষে ওই রোগীকে আবারো তার নির্দিষ্ট পারিবারিক চিকিৎসক বা সেন্টারে ফেরত পাঠানো হয়, সেখানে বাকি চিকিৎসা এবং ফলোআপ নিশ্চিত করা হয়। এটি একটি সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা। এই চিকিৎসা ব্যবস্থায় রোগীদের কোন প্রকার ভোগান্তি হয় না, চিকিৎসা ব্যয় অনেক কম হয়, রেফারেল সিস্টেম নিশ্চিত হওয়াতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও হাসপাতালে রোগীদের চাপ অনেক কমে যায়।

জেনারেল প্র্যাকটিস প্রথম শুরু হয় ১৬১৭ সালে ইংল্যান্ডে। তবে জেনারেল প্র্যাকটিস শব্দটি প্রথম ব্যবহার করা হয় ডিসেম্বর ১৮৪৪ সালে। আমেরিকায় ১৯৩০ সালে চিকিৎসকদের মধ্যে ৮০ ভাগই ছিলেন জেনারেল প্র্যাকটিশনার। ১৯৪৭ সালে সব জেনারেল প্র্যাকটিশনার মিলে তৈরি করেন 'আমেরিকান একাডেমি অব জেনারেল প্র্যাকটিস'। বর্তমানে ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড এবং কমনওয়েলথ রাষ্ট্রগুলোর বেশিরভাগে জেনারেল প্র্যাকটিস চিকিৎসা পদ্ধতি প্রচলিত আছে।

বর্তমানে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় রেফারেল সিস্টেম না থাকায় রোগীরা অসুস্থ হলে সাধারণত প্রথমত ওষুধের দোকান বা হাতুড়ে চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসা নিতে যান। এরপর সুস্থ না হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বার অথবা জেলা বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শরণাপন্ন হোন। এতে করে একদিকে যেমন বিশেষজ্ঞ চেম্বার ও হাসপাতালে রোগীদের উপচেপড়া ভিড় হওয়ায় আশাতীত সেবা প্রদান সম্ভব হয় না, অন্যদিকে যে কোনো অসুস্থতায় জেলা সদর বা বিভাগীয় শহরে যাওয়া ব্যয় সাপেক্ষ হওয়ায় অনেকের পক্ষে তা সম্ভব হয় না।

আমাদের দেশে পারিবারিক চিকিৎসা ব্যবস্থা বা জেনারেল প্রাকটিস এখনো বিশদভাবে শুরু হয় নাই। যার ফলশ্রুতিতে যেকোনো রোগী যেকোনো চিকিৎসককে দেখাতে পারেন আবার যেকোনো চিকিৎসক যেকোনো ধরনের রোগী দেখতে পারেন। এলোমেলো চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে রোগীরা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। কারণ তারা অসুস্থ হলে চিকিৎসক পাচ্ছেন না, তাদেরকে চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ধরনের অপচিকিৎসার শিকার হতে হচ্ছে, বিনা প্রয়োজনে এন্টিবায়োটিক দেয়া হচ্ছে যা তাদের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। 

করোনার এই দুর্যোগ পরিস্থিতিতে সারা পৃথিবীর মানুষ এখনো ঘরে বন্দী। এই সময় করোনা ছাড়া অন্যান্য রোগের চিকিৎসার জন্য মানুষ ভয়ে হাসপাতাল বা চিকিৎসকের চেম্বারে যেতেও ভয় পাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোতে যেখানে পারিবারিক চিকিৎসক ব্যবস্থা বা জেনারেল প্রাকটিস ব্যবস্থা চালু আছে, সেখানে পারিবারিক চিকিৎসকদের মাধ্যমে সকল রোগী সকল ধরনের চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন। 

প্রতিটি পারিবারিক চিকিৎসক তাদের নির্দিষ্ট রোগীদের ঘরে বসে মোবাইল, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ইত্যাদির মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা প্রদান করছেন। এতে প্রধান সুবিধা হচ্ছে ওই সকল রোগীর সমস্যার কথা তাদের নির্দিষ্ট পারিবারিক চিকিৎসক এর জানা আছে অথবা কম্পিউটার বা ল্যাপটপে সংরক্ষিত আছে। তাই রুগীকে না দেখে অথবা ভিডিওতে দেখে একটা মানসম্মত চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। এজন্য ওই দেশগুলোতে করোনা ছাড়া অন্য রোগীদের চিকিৎসা নিয়ে কোন প্রকার জটিলতা তৈরি হচ্ছে না। শুধুমাত্র যারা করোনা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অথবা যাদের করোনা সাসপেক্ট করা হচ্ছে শুধু তারা হাসপাতালগুলোতে যোগাযোগ করছেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা পাচ্ছেন। অন্যদিকে যে দেশগুলোতে পারিবারিক চিকিৎসা ব্যবস্থা বা জেনারেল প্রাকটিস ব্যবস্থা চালু নেই সেসব দেশের সাধারণ মানুষদের চিকিৎসায় এক মারাত্মক জটিলতা তৈরি হয়েছে।

লেখক: ডা. রতীন্দ্র নাথ মন্ডল, এমবিবিএস, এফসিপিএস (মেডিসিন)।

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0713 seconds.