• ২০ মে ২০২০ ১৫:৫০:২৭
  • ২০ মে ২০২০ ১৫:৫২:২৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

এই মৃত্যু মহামারী খল রাজনীতিরই দৃশ্যচিত্র

কাকন রেজা। ফাইল ছবি


কাকন রেজা :


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে অনেক বিষয়েই মতপার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে আমার অন্তত মিল রয়েছে। সে হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিষয়টিতে। ট্রাম্প খেপেছেন এই সংস্থার ওপর। আমারও গোস্বা তাদের প্রতি। করোনাকালের প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত মানুষকে আতঙ্কিত করা ছাড়া আর কি করেছে এই সংস্থাটি। তাদের কাজই ছিলো প্রথম থেকে আতঙ্ক ছড়ানো। দু’দিন আগেও তারা বললেন, ভ্যাকসিন বেরুতে আরো দেড় থেকে দু’বছর লাগতে পারে। এর আগে বলা হলো ভ্যাকসিন নাও বের হতে পারে।

অথচ যখন লিখছি তখন গণমাধ্যম জানালো, মার্কিন প্রতিষ্ঠান মডার্নার তৈরি করা ভ্যাকসিনে সাফল্য মিলেছে। আর সে সাফল্য প্রপাগান্ডা নয়, সত্যিকারের সাফল্য। ৮ জন মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা এই ভ্যাকসিন সফলভাবে করোনার বিরুদ্ধে কাজ করেছে। আরেকটি পরীক্ষার পরই এ বছরের শেষের দিকে বা আগামী বছরের শুরুতেই এ ভ্যাকসিন বাজারে আসবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিপরীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বক্তব্য ছিলো রীতিমত সংশয়পূর্ণ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা নিয়েও সংস্থাটির প্রতিক্রিয়া ছিলো বরাবরই নেতিবাচক। তারা কোন কিছুকেই মেনে নিবে না এমন একটা মনোভাব নিয়ে বসে আছে, অথচ নিজেরা করতে পারছে না কিছুই। কোনো কার্যকর বা আশাপ্রদ কোন কিছুই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তরফ থেকে পাওয়া যায়নি। এই ‍দুর্যোগে বিপন্ন মানুষেরা তাই হতাশ হয়ে পড়েছে সংস্থাটির প্রতি।

জানি, কোনো ম্যাজিক বুলেট নেই করোনার বিরুদ্ধে। বলতে বাধা নেই, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তরফে ম্যাজিক বুলেট পাবার চেষ্টাও হয়তো নেই। বরং এই সংস্থাটিকে এখন কেন যেন রাজনৈতিক মনে হচ্ছে। তারা ভ্যাকসিন বা ওষুধের পেছনে ছোটার চেয়ে পড়ে আছেন ট্রাম্প ও চীনের দ্বন্দ্ব নিয়ে। এ স্বাস্থ্য সংস্থার কাজ ট্রাম্পের বক্তব্যের দীর্ঘ প্রতিক্রিয়া জানানো নয়। তাদের কাজ এই দুর্যোগ থেকে বের হওয়ার রাস্তা বাতলে দেবার চেষ্টা করা। সেই চেষ্টার প্রতি তাদের কমিটমেন্ট আর ডেডিকেশনের নিম্নগতি মানুষকে ক্রমেই দ্বিধায় ফেলছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন এফডিএ অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এন্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ওপর ক্রমেই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। চিকিৎসকরা তাদের নির্দেশাবলী অনুসরণ করছেন।

কেন এমন হলো, এর কারণ ঘাটতে গেলে বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে কথা বলতেই হয়। বর্তমান বিশ্ব এতটাই কর্পোরেট হয়ে উঠেছে, এখানে সব কিছুর ওপর জোর দেয়া হচ্ছে অর্থকে। আর অর্থ উপার্জনের লক্ষ্য হচ্ছে বাণিজ্য। সাধারণ কথাই বলি, মানুষের ফ্যাশনের প্রতি যতটা গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, ততোটা স্বাস্থ্যের প্রতি দেয়া হচ্ছে না। একটি অ্যাপল বা স্যামসাং মোবাইল ফোনের টাকায় হাসপাতালে একটি ভেন্টিলেটর কেনা যায়। প্রতিদিন সারা বিশ্বে হাজার হাজার অ্যাপল বা স্যামসাং মোবাইল ফোন বিক্রি হচ্ছে, উল্টো দিকে হাসপাতালগুলোতে বছরে একটা ভেন্টিলেটরও বাড়ছে না। আজকে সারা বিশ্বকেই তার ফল ভুগতে হচ্ছে। ধনী দেশগুলোকেও পড়তে হচ্ছে চিকিৎসা সামগ্রীর সংকটে। অথচ সারা বিশ্বে ফ্যাশন সামগ্রীর কোনো সংকট নেই!

অস্ত্রেরও কোনো সংকট নেই। বিশ্বের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো ইচ্ছে করলেই অস্ত্র কিনতে পাচ্ছে। প্লেন থেকে মিসাইল সবই সহজলভ্য। ওষুধের সংকটের বিপরীতে মাদকের ততটা সংকট নেই। হাতের কাছেই রয়েছে মাদকদ্রব্য। কেনার জন্য বাইরেও যেতে হয় না, চাইলে হোম ডেলিভারিতেও পাওয়া যাচ্ছে। অথচ এই সংকটের সময়ও ওষুধের হোম ডেলিভারি সম্ভব নয়। কিন্তু মাদক চাইলেই পাওয়া যায়। এ সবই কর্পোরেট চিন্তা ও ব্যবস্থার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। বামেরা বলবেন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ফল। ভাই, পুঁজিবাদ একে বলে না। কিউবাও মাদকের জন্য বিখ্যাত। ভিয়েতনামও। দোষ হলো লোভের। রাষ্ট্র ব্যবস্থা এর জন্য যতটা না দায়ী তারচেয়ে বহুগুন দায়ী শাসকের চিন্তার খলতা। লোভ। অর্থের লোভ, ক্ষমতার লোভ।

দেশে দেশে আজ যে খল-শাসকদের উত্থান ঘটেছে তারই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি আমরা দেখতে পাচ্ছি চোখের সামনে। যা বাগাড়ম্বরের আতিশয্যে মানুষ ভুলে ছিলো এতদিন। যখন সত্যিকার বিপদ এলো তখনই চোখ খুলতে শুরু করলো তাদের। চোখ খুলে দেখতো পেলো, হাসপাতালে তাদের শ্বাস নেবার জন্য একটা ভেন্টিলেটর নেই। তাদের বাঁচানোর জন্য আইসিইউ নেই। ওষুধ নেই। কোন কোন ক্ষেত্রে হাসপাতালের সাধারণ শয্যাও নেই।

ক্ষমতা আর অর্থের লোভ শাসকদের এতটাই অন্ধ করে ফেলেছিলো যে, মানুষ বাঁচানোর দৃশ্যত তাদের কোনো প্রচেষ্টাই ছিলো না। তারা মানুষ বাঁচানোর প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের ক্ষমতা আর লোভের কাছে বলি দিয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। যার ফলেই রাজনৈতিক বিষয় না হয়েও ট্রাম্পের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ট্রাম্প বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অভিযুক্ত করছেন। এই অভিযোগ আর অভিযোগ খন্ডনের দৃশ্যপট, খল রাজনীতিরই চালচিত্র। যে খলতার থেকে হাতেগোনা কিছু দেশ ছাড়া বাকি কোন দেশই মুক্ত নয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1452 seconds.