• ২৪ মে ২০২০ ০১:১৪:৩১
  • ২৪ মে ২০২০ ০১:১৪:৩১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

মৃত্যু একটা সংখ্যা নয় কেবল!

ডা. ফারহানা নীলা। ফাইল ছবি


ডা. ফারহানা নীলা :


আলীবাবা চল্লিশ চোর গল্পটাতে তেলের ড্রামে ডাকাত লুকিয়ে ছিল।এই গল্পটা ছোটবেলায় পড়েছি। তেলের ড্রামে ডাকাত বিষয়টা কল্পনার ছিল। আজ মাছের ড্রামে চারজন করে মানুষের ঈদ যাত্রা কিন্তু গল্প নয়। একটা পিক আপে চারটা ড্রামে মোট বারোজন মানুষ.... ঐকিক নিয়মটাও ঝালাই করা হলো।

মানুষ মোটরসাইকেল নিয়ে দূর দূরান্তে ছড়িয়ে যাচ্ছে। নসিমন করিমনও থেমে নেই।
ঢাকা,নারায়নগঞ্জ, গাজীপুর... করোনার হটস্পট। এইসব জায়গা থেকে মানুষ ঈদে স্বজনের কাছে ছুটছে।
উপসর্গহীন রোগীদের আলাদা করার উপায় নেই। উপসর্গ থাকলেও নাপা খেয়ে রওনা হয়েছে। রেন্টে কারের ব্যবসা এখন জমজমাট।

বিষয়টি দেখে আমার মনে হলো ঢাকায় কোনো যুদ্ধাবস্থা চলছে। ১৯৭১ সালে এইভাবেই মানুষ ঢাকা ছেড়েছিল। তখন আর এখন....পার্থক্য অনেক। ভিন্নমাত্রার যুদ্ধ করতে কৌশলও ভিন্ন হতে হয়। এই যুদ্ধ ঘরে থাকার যুদ্ধ। এই যুদ্ধ নিজেকে আবদ্ধ রাখার যুদ্ধ।

চট্টগ্রাম করোনার হটস্পট হয়ে উঠেছে। এরপর আরো কোথাও হবে হটস্পট। আমরা অসহায় হয়ে খবর দেখবো।
মানুষ আইসিইউ খুঁজছে। মানুষ ভেন্টিলেটর খুঁজছে। খুঁজছে প্লাজমা ডোনার।

সাংবাদিকদের জন্য হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। করোনা যোদ্ধা সাংবাদিকদের জন্য এটা স্বস্তির খবর।
পুলিশের জন্য ইমপালস হাসপাতালে চিকিৎসা করার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। কি নিরুপায় আমাদের পুলিশ সদস্যরা।

ডাক্তারদের জন্য কোনো হাসপাতাল এখনো নির্দিষ্ট নেই। পরিবার পরিজন রেখে স্বাস্থ্য কর্মীদের যুদ্ধ চলছে। অবিবেচক জনগোষ্ঠীর খেসারত টানছে হাসপাতাল। ডাক্তাররা ক্লান্ত হতে শুরু করেছে। তাদের কোনো ঈদ নেই,তাদের জীবন হাসপাতালের রোগী আর রোগে বন্দী।

জনগণের এই অবিবেচনা কতটা ঝুঁকি নিয়ে আসছে সেটা দেখতে আরো দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নাজুক হতে শুরু করবে। এখন মানুষ টেস্ট করতে আগ্রহী নয় আর। কারণ এটাও আরেক বিড়ম্বনা।

সারাদিন প্লাজমার সন্ধানে মানুষ ফোন করে। আমাদের প্লাজমা ব্যাংক তৈরী হয়নি। ডোনার ছাড়া প্লাজমা ব্যাংক সম্ভব নয়। বিএসএমএমইউ প্লাজমা নিয়ে কাজ করছে। আজ পুলিশ হাসপাতাল কাজ শুরু করেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ কাজ করছে।

চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ওষুধের নাম আসছে। কোনোটাই পরীক্ষিত ওষুধ নয়। সবখানেই গবেষণা চলছে। ভ্যাক্সিন নিয়ে দেশে দেশে গবেষণা চলছে।

চিকিৎসার উপর নির্ভরশীল হওয়ার চাইতে বেশী প্রয়োজন ছিল সচেতনতার।
প্রতিরোধই একমাত্র চিকিৎসা হিসাবে বিবেচনা করলে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা হয়তো কমিয়ে আনা যেতো।

মাস্ক পরে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিয়ে নিজেকে সুরক্ষিত ভাবায় বিপদ আরেক ধাপ বেড়েছে। সামাজিক এবং শারীরিক দূরত্ব....
থাকছে না। করোনা মানবদেহ থেকে আরেক মানবদেহে যায়। মানবদেহ না পেলে করোনা এমনিতেই মরে যায়। আমরা এই সাধারণ কথাটা বুঝতে বা বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি।

নিজেদের চালাকচতুর ভেবে নিয়ে দুঃসাহসিক কাজ করতে দ্বিধা করছি না। সব সাহস কিন্তু ভাল নয়। সব সাহস কিন্তু কাম্য নয়। বরং ভয় পেয়ে সচেতন হলে করোনাকে জয় করতে পারতাম আমরা!

এখন কি হেরে যাওয়াই ভবিতব্য?
বাড়তি টাকা খরচ করে সবাই বাড়ী চলেছে। তবে টাকা নেই... কাদের?
মধ্যবিত্ত পরিবারের বিপদ দেখছি। নিম্নবিত্ত ত্রাণ পায়। উচ্চবিত্ত আড়ংয়ে যায়। আর মধ্যবিত্ত ভীতুর ডিম.... ঘরে সেঁধিয়ে যায়। তারা ভয় পায়। তাদের ঘরে খাবার থাকে না,কিন্তু বলতেও পারে না।

অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। অনেকে নিজে রান্না করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে খাবার দিচ্ছেন।

কিন্তু এসব কাদের জন্য?
যারা অবিবেচক হয়ে করোনাকে সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, তাদের জন্য?
ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, সাংবাদিক, প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের ব্যক্তিরা... কাদের জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করছে?
একবারো কি ভেবেছেন?

আপনারা এতই সাহসী যে আপনাদের কানে কোনো কথাই ঢুকছে না। এতটা বোবাকালা কেমন করে আপনারা?
ফেরী ভর্তি হয়ে ঈদ করতে চলে গেলেন। একবার ভাবুন... আপনজন মারা গেলে আপনারই যাবে। মৃত্যু একটা সংখ্যা নয় কেবল! যার যায় তার শতভাগই যায়।
আপনার কি করোনা যোদ্ধা খেতাবটা খুব প্রয়োজন?

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0805 seconds.