• ২৬ মে ২০২০ ১৭:৫৭:৫২
  • ২৬ মে ২০২০ ১৭:৫৭:৫২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

বিবর্ণ ঈদ, অপগন্ড সংস্কৃতি এবং সামাজিক পান্ডা

ফাইল ছবি


কাকন রেজা :


ঈদ টা এবার বাংলা একাডেমির ‘ইদ’ এর মতন কেমন যেন অচেনা হয়ে উঠেছিলো। বিবর্ণ হয়ে উঠেছিলো। ঈদ মানেই সম্প্রীতির একটা বাঁধন। পরম শত্রুকেও বুকে টেনে নেয়ার দিন। ছোট বেলার কথা বলি। স্কুলে মারামারি হয়েছে কথা বন্ধ, আড়ি। ঈদ হলো সেই আড়ি ছোটানোর দিন, বন্ধ কথা খোলার দিন। অবশ্য বড় বেলায় অনেক কিছুই হিসাব মতন চলে না। স্বার্থের সংঘাত জীবনকে জটিল করে তোলে। তারপরও অনেক ক্ষেত্রেই মিটে যায় অনেক পুরানো বিবাদ। শত্রুকেও বুকে টেনে নেয়া হয় এই দিনটিতে। ঈদের মেসেজটাও তাই।

কিন্তু করোনাকাল সবকিছু বিবর্ণ করে দিয়েছে। সেই নামাজ নামের সামাজিক সম্মিলন শেষে কোলাকুলির আনন্দ। আত্মীয়স্বজনের সাথে পুনর্মিলন, কোনো কিছুই নেই এবারের ঈদে। অনেকে নামাজ বাসাতেই সেরেছেন। মসজিদেও যাওয়া হয়নি। যারা গিয়েছেন তারাও তাড়াহুড়ো করেছেন বাড়ি ফেরার জন্য। সবার ভেতরই আতঙ্ক, মৃত্যু ভয়। কী ভয়াবহ অবস্থা। ভাগ্যিস অনলাইনটা ছিলো। ভার্চ্যুয়ালি হলেও ঈদের কিছুটা স্বাদ পাওয়া গেছে। সে অনুযায়ী এবারের ঈদকে ভার্চ্যুয়াল ঈদও বলা যায়।

এমন দিনে সত্যিকার ঈদটা বড় প্রয়োজন ছিলো। মানুষের সম্প্রীতির বড় দরকার ছিলো। কেনো ছিলো, সেইটাই বলছি। ঈদের দিনে গণমাধ্যম জানালো, লালমনিরহাটে মৃত এক পোশাককর্মী নারীকে করোনা আক্রান্ত সন্দেহে গ্রামে দাফন করতে দেয়া হয়নি। বাধ সেধেছিলেন গ্রামের সামাজিক পান্ডারা। বাধ্য হয়েই সেই পোশাককর্মীর বাবা মেয়েকে দাফন করতে এক অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভারের সাথে পাঁচ হাজার টাকায় চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু সেই ড্রাইভার ওই পোশাককর্মীকে দাফন না করে লাশ তিস্তায় ফেলে দিয়েছিলো। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে তা দাফনের ব্যবস্থা করে। লাশ দাফনে বাধার এমন অসংখ্য খবর গণমাধ্যমে রয়েছে। এই বাধা কারা দিচ্ছেন, খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে এরা হয় স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বার কিংবা গ্রামের মোড়ল শ্রেণির সামাজিক পান্ডা। এই যে, এতদিন ধরে আমরা শুনে আসছি এমন অমানবিকতার কথা, এদের কারোরই কি শাস্তির বিষয়ে জানা আছে কারো? নেই। শাস্তি নেই বলেই এই সামাজিক পান্ডারা এতটা সাহস সঞ্চয় করতে পেরেছে। অথচ এই অমানবিকতার বিরুদ্ধে শাস্তিটা জরুরি ছিলো।

সামাজিক পান্ডা শুধু এই লেভেলেই নয়, উপরের লেভেলেও রয়েছে। হাই প্রোফাইলড এইসব সামাজিক পান্ডাদের দৌরাত্মে দেশটারই নাভিশ্বাস উঠছে। নিচু লেভেলের সামাজিক পান্ডাদের দৌড় লাশ দাফন করতে না দেয়া অথবা করোনা আক্রান্ত পরিবারকে হেনস্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর বেশি দূর যাবার ক্ষমতা তাদের খুব একটা নেই। বিপরীতে হাই প্রোফাইলড পান্ডারা পুরো একটি সমাজকে কবরস্থ করে দিতে পারে। একটা সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢেকে দিতে পারে।

তারা কত কী করতে পারে তার সাম্প্রতিক ‍উদাহরণ হলো, আম্ফান বিধ্বস্ত খুলনার কয়রা উপজেলার ঈদের নামাজ। এই উপজেলাটির আশি ভাগ এলাকা তলিয়ে গেছে জোয়ারের পানিতে। বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় এমনটা হয়েছে। বাধ্য হয়েই মানুষ ঈদের জামায়াত আদায় করেছে পানির মধ্যেই। শখ করে নয় মানুষ বাধ্য হয়েই করেছে। এটা বৈশাখে শখ করে পান্তা খাবার মতন ঘটনা নয়। অথচ হাই প্রোফাইলড পান্ডারা এই ঈদ জামায়াতের পেছনেই লেগেছে। কেনো নামাজ পড়তেই হলো, কিংবা উঁচু জায়গা কী ছিলো না, এমনসব বাংলা একাডেমির ‘ইদ’ মার্কা অদ্ভুত প্রশ্ন তাদের। ‘ঈদ’ এর জায়গায় জোর করে যেমন ‘ইদ’ কে প্রতিস্থাপন করা যায় না, তেমনি এদেশের মানুষের সম্প্রীতির সংস্কৃতি ঈদের জামায়াতকে এক কথায় না বলে দেয়া যায় না। এদেশের সংস্কৃতিই এই রকম, বিধ্বস্ত জনপদে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়ে নেমে যায় মানুষ পুনর্গঠনের কাজে। হিন্দু সম্প্রদায় নেমে পড়ে ‘দুগ্গা দুগ্গা’ বলে। এটাই আমাদের জনপদ, দেশ। এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আমাদের আলাদা করেছে অন্যদের থেকে। যে সংস্কৃতির কথা বলে আমরা গর্ব করি।

মুশকিল হলো সেই সব হাই প্রোফাইলড পান্ডাদের নিয়ে, তারা যে কোন সংস্কৃতির  কথা বলেন তাই আমরা বুঝে উঠতে পারি না। তাদের বৈশাখের পান্তাভাত যে কোন সংস্কৃতির কথা বলে তা নিয়েও আমরা দ্বিধায় থাকি। আসলে তাদের সংস্কৃতিটা চিহ্নিত করতেই আমাদের বিভ্রান্ত হতে হয়। বৈশাখের লালপেড়ে শাড়ির সাথে কথিত ব্যক্তি স্বাধীনতার মিনি-মিডি-টপস মেলে না। যার ফলেই বিভ্রান্ত হতে হয়। যে সংস্কৃতির আশি ভাগ ধর্ম থেকে উৎসারিত সেই সংস্কৃতি থেকে ধর্মকে বাদ দেয়ার অপগন্ডতা কেনো সেটা বুঝতে গিয়েই বিভ্রান্ত হওয়া।

ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে যতটুকু বোধ হয়, এর মূল হলো ধর্ম বিদ্বেষ। বিশেষ করে ইসলাম বিদ্বেষ। বিশেষ করে বললাম এই কারণে যে, ইসলামের প্রতি এই বিদ্বেষটা মূলত রাজনৈতিক। যার সীমানা দেশের গন্ডি পেড়িয়ে অনেকদূর পর্যন্ত। এই আলোচনাটা বিশাল এবং সামগ্রিক। তাই আপাতত এটা তোলা থাক। তারচেয়ে বরং আমরা দেশীয় পান্ডাদের বোঝাতে চেষ্টা করি, নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করি আত্মঘাতের এই পদযাত্রা থেকে। সাথে ‘ঈদ’ আবার পরিপূর্ণ সম্প্রীতিময় হোক সেই প্রার্থনা করি নিজের গভীর হতে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1324 seconds.