• নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২৭ মে ২০২০ ২১:৫৮:৫২
  • ২৭ মে ২০২০ ২১:৫৮:৫২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

সিকদারদেরও আছে ‘পারিবারিক’ ব্যাংক-বিমা

গ্রাফিক্স: বাংলা

কথামত কাজ না করায় এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অতিরিক্ত এমডিকে গুলি করে হত্যার করার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে সিকদার গ্রুপের দুই পরিচালকের বিরুদ্ধে। তারা হলেন- সিকদার গ্রুপের মালিক জয়নুল হক সিকদারের ছেলে এবং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রন হক সিকদার ও তার ভাই দিপু হক সিকদার।

অভিযোগে জানা যায়, বেসরকারি খাতের এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়াকে অস্ত্রের মুখে ধরে এনে রন হক সিকদার হুমকি দেন- ‘তোর কত বড় সাহস যে আমার কথা অমান্য করিস। গুলি করে জন্মের মতো খোঁড়া করে দিব।’ 

শুধু তা–ই নয়, ব্যাংকটির এমডি ও অতিরিক্ত এমডি মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেনকে গুলি করে হত্যার চেষ্টাও করেন তাঁরা। চালানো হয় নির্যাতন। জোর করে সাদা কাগজে সইও নেওয়া হয়। এ ঘটনায় রাজধানীল গুলশান থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।

রন হক সিকদার নিজেও বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালক। তার বাবা জয়নুল হক সিকদারের ব্যাংকটির পরচিালক পর্ষদের চেয়ারম্যান। সিকদার পরিবারের হাতে রয়েছে বিমাও। সিকদার ইন্সুরেন্সের মালিক হলেন জয়নুল হক সিকদার।

ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও নির্বাহী কমিটিতে রয়েছে সিকদার পরিবারের একচ্ছত্র আধিপত্য।দেশের আইন অনুযায়ী কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের সর্বোচ্চ চারজন সদস্য থাকতে পারেন। কিন্তু ন্যাশনাল ব্যাংকে সিকদার পরিবারের রয়েছে ছয়জন সদস্য। তারা হলেন- জয়নুল হক সিকদার, তার স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার, মেয়ে পারভীন হক সিকদার, দুই ছেলে রিক হক সিকদার ও রণ হক সিকদার, জয়নুল হক সিকদারের নাতি জোনাস সিকদার খান।

সিকদার পরিবারের আরেকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিকদার ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। এই বিমা প্রতিষ্ঠানটিরও পরিচালক পদেও রয়েছেন সিকদার পরিবারের একঝাঁক সদস্য। চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন সিকদার পরিবারের নাসিম হক সিকদার, পরিচালক পদে রয়েছেন শহীদুল হক সিকদার। এ ছাড়া স্বতন্ত্র পরিচালক পদে রয়েছেন মনিকা সিকদার, মান্ডি খান সিকদার, জেফেরি খান সিকদার, জোনাস খান সিকদার, জন হক সিকদার ও সিয়ান হক সিকদার।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ঋণের জন্য অন্য ব্যাংকের এমডির সঙ্গে যারা এমন কাণ্ড করেন তারা নিজেদের ব্যাংক বিমার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিয়ম করেন কিনা?

ব্যাংক, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, নির্মাণ, এভিয়েসনসহ বিভিন্ন খাতে সিকদার গ্রুপের বিনিয়োগ রয়েছে। এ ছাড়া দেশের বাইরে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সিকদার গ্রুপের ব্যবসা রয়েছে বলে গ্রুপটির ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে। জয়নুল হক সিকদারের ছেলেরা ব্যবসায় যুক্ত, আর মেয়ে পারভিন হক সিকদার সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য।

সিকদার পরিবার ছাড়াও অনেক পরিবারের হাতেই ব্যাংক-বিমা আছে। তবে অন্তত তিনটি পরিবারের হাতে একাধিক ব্যাংক-বিমা রয়েছে। বাকি দুই পরিবার হলো- এস আলম পরিবার ও হাসেম পরিবার।

এস আলম পরিবার

চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্প গ্রুপ এস আলম। ব্যবসায়িক গ্রুপটির চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ। তিনি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান। তার স্ত্রী ফারজানা পারভীন রয়েছেন ব্যাংকটির পরিচালক পদে।

শুধু এই ব্যাংকটিই নয়, আরও অন্তত ছয়টি ব্যাংকে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, পরিচালকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন সাইফুল আলম মাসুদের পরিবারের সদস্যরা। 

২০১৭ সালে ইসলামী বাংকের ১২ ভাগেরও বেশি শেয়ার বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে কিনে নেয় এস আলম গ্রুপ। এ নিয়ে গণমাধ্যমে বিভিন্ন খবর প্রকাশ পায়। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেনার সময় এস আলম গ্রুপ তাদের প্রতিষ্ঠিত কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করেনি। 

ইউনিয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শহিদুল আলম। তিনি সাইফুল আলম মাসুদের ভাই। এই ব্যাংকের পরিচালক পদে আছেন সাইফুল আলমের ছেলে আহসানুল আলম। এ ছাড়া ব্যাংকের শেয়ার হোল্ডার হিসেবে রয়েছেন সাইফুল আলমের ছেলে আহসানুল আলম ও স্ত্রী ফারজানা পারভীন।

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকেরও মালিকানা এস আলম গ্রুপের হাতে। ব্যাংকটির ৪০ শতাংশ শেয়ারের মালিক চট্টগ্রামের এই ব্যবসায়ী গ্রুপ। 
 
এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের অনেক শেয়ার কিনেছে এস আলম গ্রুপ। এই ব্যাংকে ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সাইফুল আলমের জামাতা বেলাল আহমেদ। 

এ ছাড়া আল আরাফা ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের ভাই আবদুস সামাদ। সেই সঙ্গে এই ব্যাংকের স্পন্সর শেয়ার হোল্ডার হিসেবে রয়েছেন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ।

এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকও রয়েছে এস আলম পরিবারের হাতে। 

এম এ হাসেম পরিবার

পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান শিল্পপতি এম এ হাসেমের দুই ছেলে রুবেল আজিজ ও আজিজ আল কায়সার এবং ছেলেদের স্ত্রীরা সিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। এম এ হাসেমের আরেক ছেলে আজিজ আল মাহমুদের স্ত্রীও আছেন সিটি ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে। আজিজ আল কায়সারের স্ত্রী তাবাসসুম কায়সার এখন সিটি ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান।

রুবেল আজিজের স্ত্রী সৈয়দা শাইরিন আজিজ ব্যাংকটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আজিজ আল মাহমুদের স্ত্রী সাভেরা এইচ মাহমুদও ব্যাংকটির পরিচালক।

সিটি ব্যাংকের পাশাপাশি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকেও (ইউসিবি) রয়েছে হাসেম পরিবার। শিল্পপতি এম এ হাসেম এই ব্যাংকের পরিচালক। ছেলে শওকত আজিজ রাসেলও এর পরিচালক ছিলেন।

জনতা ইন্স্যুরেন্সেও আছে হাসেম পরিবারের নিয়ন্ত্রণ। বিমা কোম্পানিটির উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এম এ হাসেম নিজেই। এ ছাড়া তার স্ত্রী সুলতানা হাসেম রয়েছেন পরিচালক হিসেবে। তাদের আরেক ছেলে আজিজ আল মাসুদ কোম্পানিটির চেয়ারম্যান। এম এ হাসেমের অন্তত দুজন পুত্রবধূ জনতা ইন্স্যুরেন্সের পরিচালক।

এক্সিম ব্যাংকের মামলা

গুলশান থানায় করা এক্সিম ব্যাংক কর্তৃপক্ষের মামলা সূত্র জানা যায়, ঘটনাটি ঘটে গত ৭ মে, বনানীর ১১ নম্বর সড়কের সিকদার হাউসে।এক্সিম ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকা ঋণ চেয়ে না পাওয়ায় এ ঘটনা ঘটায় সিকদার পরিবার।

এক্সিম ব্যাংকের করা মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বেশ আগে এক্সিম ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকা ঋণ পেতে আবেদন করে সিকদার গ্রুপ। এ জন্য ৭ মে সকালে গুলশানে এক্সিম ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আসেন রন হক সিকদার ও ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডি চৌধুরী মোসতাক আহমেদ। তারা ব্যাংকটির এমডি ও অতিরিক্ত এমডিকে ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে রূপগঞ্জের আদি নওয়াব আসকারি জুট মিল পরিদর্শনে নিয়ে যান। পরিদর্শনে গিয়ে জামানত হিসেবে ওই সম্পত্তির বন্ধকি মূল্য নথিপত্রে দেখানো মূল্যের চেয়ে কম উল্লেখ করেন ব্যাংকটির এমডি ও অতিরিক্ত এমডি। এরপর রন হক সিকদার তাদের পূর্বাচলের ‘আইকন টাওয়ার’ পরিদর্শনে যেতে বলেন। কিন্তু টাওয়ার পরিদর্শনে গিয়ে রন হক সিকদার ও চৌধুরী মোসতাক আহমেদকে না পেয়ে এবং প্রকল্পের ভেতরের সড়ক অপরিচিত হওয়ায় এক্সিম ব্যাংকের এমডি ও অতিরিক্ত এমডি ৩০০ ফিট সড়ক ধরে ঢাকায় ফিরতে শুরু করেন।

ওই সড়কে রন হক সিকদার ও ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডিকে দেখতে পান তারা। এসময় ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডি এক্সিম ব্যাংকের এমডি ও অতিরিক্ত এমডিকে বলেন, ‘রন হক সাহেবের বলে দেয়া নির্ধারিত স্থানে আপনারা উপস্থিত হতে ব্যর্থ হয়েছেন বিধায় উনি অত্যন্ত মনঃক্ষুণ্ন ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন।’ এরপর রন হক সিকদারের কাছে এক্সিম ব্যাংকের এমডি ও অতিরিক্ত এমডিকে মাফ চাইতে বাধ্য করা হয়। এর কিছুক্ষণ পরেই রন হক সিকদার গাড়ির গ্লাস নামিয়ে এক্সিম ব্যাংকের এমডির উদ্দেশ্যে গুলি ছোড়েন। তবে তা এমডির বাম কানের পাশ দিয়ে চলে যায়। এরপর আবারও তাকে গুলি করতে উদ্যত হলে এক্সিম ব্যাংকের এমডি গাড়ির পেছনে আশ্রয় নেন।

এরপর এক্সিম ব্যাংকের এমডির গাড়িতে ব্যাংকটির অতিরিক্ত এমডিকে তোলা হয়। তারপর গাড়িতে রন হক সিকদারের একজন নিরাপত্তাকর্মীকে তোলা হয়। তিনি এমডি ও অতিরিক্ত এমডির মোবাইল ফোন কেড়ে নেন এবং অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাদের বনানীর সিকদার হাউসে নিয়ে যান।

মামলার নথি আরো উল্লেখ করা হয়, তাদের সিকদার হাউসে নেয়ার পর রন হক সিকদার ব্যাংকটির এমডির উদ্দেশে বলেন, ‘তোর কত বড় সাহস যে আমার কথা অমান্য করিস। গুলি করে জন্মের মতো খোঁড়া করে দিব।’ সেখানে তাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ঋণ দেয়ার জন্য হুমকি দেয়া হয়।

আর ব্যাংকটির অতিরিক্ত এমডিকে নিয়ে যাওয়া হয় ৬ষ্ঠ তলায়। সেখানে রন হক সিকদার ও দিপু হক সিকদার মদ পান করছিলেন। অতিরিক্ত এমডির উদ্দেশ্যে রন হক সিকদার বলেন, ‘প্রতি কাঠা জমির দাম আড়াই কোটি টাকা, আর তুই কেন বললি প্রতি বিঘার দাম আড়াই কোটি টাকা। এখনই তোকে শেষ করে ফেলব।’ এ সময় দিপু হক সিকদার ব্যাংকটির অতিরিক্ত এমডিকে মারধরের চেষ্টা করেন।

মারধরের পর রন হক সিকদার ও দিপু হক সিকদার ব্যাংকটির এমডির কাছে একটি সাদা কাগজে জোর করে স্বাক্ষর আদায় করে নেন। স্বাক্ষর না করলে বিদেশি নিরাপত্তাকর্মী দিয়ে টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন চালানো হবে বলে হুমকি দেয়া হয়। আবার আর এই স্বাক্ষরের সাক্ষী করা হয় অতিরিক্ত এমডিকে।

এরপর বিকেল সাড়ে ৫টায় সিকদার গ্রুপের চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদারের কাছে নিয়ে তার সঙ্গে ছবি তোলা হয়। এরপর রাত সাড়ে ৭টার দিকে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0595 seconds.