• ২৯ মে ২০২০ ১৭:০৯:৪৬
  • ২৯ মে ২০২০ ১৭:০৯:৪৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

নিজের চিকিৎসা করতে পারবো না এমন হাসপাতাল বানাবো কেন?

কাকন রেজা। ফাইল ছবি


কাকন রেজা :


করোনা আক্রান্ত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে প্রশ্ন করা হলো, ‘আপনি প্লাজমা থেরাপি কোথায় নিয়েছেন।’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে।’ আবার তাকে বলা হলো, সেখানে প্লাজমা থেরাপির ব্যবস্থা রয়েছে কিনা। তার এই উত্তরটাই হলো মূল বিষয় যা নিয়ে আমি লিখতে চাচ্ছি।

তিনি বললেন, ‘আমরা একটা হাসপাতাল বানিয়েছি সেই হাসপাতালে যদি আমাদের নিজেদের চিকিৎসাই করতে না পারি, তাহলে তা থাকারই কোনো অর্থ নেই। যে হাসপাতালে আমরা নিজেদের চিকিৎসা করতে পারবো না, সেই হাসপাতাল রাখবো কেন? সেই হাসপাতাল তৈরি করবো কেন?’

প্রশ্নের বিপরীতে ছুড়ে দেয়া ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ‘কেন’টিই এখন আলোচ্য বিষয়। নিজেরা যে হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারবো না সে হাসপাতাল বানাবো কেন? আমাদের জেলা শহরগুলোর হাসপাতালগুলোর দিকে তাকাই। কী অবস্থা সেসব হাসপাতালের। একটা আইডিইউ নেই। ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা নেই। কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা নেই। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক তথা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ম্যানেজ করার ন্যূনতম ব্যবস্থা সে হাসপাতালগুলোতে নেই। নেই ব্রেন তথা ‘নিউরো’ বিষয়ক কোনো চিকিৎসাই।

এখন প্রশ্ন হলো, একজন ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকের রোগীর চিকিৎসা প্রয়োজন তাৎক্ষণিক। প্রয়োজন ঢাকার মতন চিকিৎসা সুবিধার। অথচ ঢাকায় পৌঁছানো পর্যন্ত রোগীর বেঁচে থাকা অনেকটাই অসম্ভব। আর ব্রেন ইনজুরির ক্ষেত্রে কিছুই করার নেই। বাধ্য হয়েই জেলা হাসপাতালের চিকিৎসকদের রোগীকে ঢাকা বা বিভাগীয় হাসপাতালগুলোতে পাঠানো ছাড়া আর কোন কিছুই করার থাকে না। আর ঢাকা ও বিভাগীয় হাসপাতালগুলোতেও যে সব চিকিৎসা দেয়া সম্ভব তাও বুকে হাত দিয়ে কেউ বলতে পারবেন না। বলা সম্ভব নয়।

আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এমন অবস্থা কেন? ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ‘কেন’ এর সাথে এই কেন’টা এখন উঠে আসা সঙ্গত এবং স্বাভাবিক। আমাদের রথী-মহারথীদের কিছু হলেই সিঙ্গাপুর-ব্যাংককের হাসপাতালে দৌড়ানোর প্রবৃত্তি এই ‘কেন’র একটি সম্পূরক উত্তর হতে পারে। আমরা আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসা না নিয়ে দৌড়ে যাই দেশের বাইরে। অর্থাৎ আমাদের নিজেদের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আমাদের ভরসা নেই। অথচ এই ভরসা গড়ে তোলার দায়িত্ব ছিলো আমাদেরই। কথা পরিষ্কার সে দায়িত্বে আমরা ফেল মেরেছি।

এই করোনাকাল আমাদের সেই ফেল মারার বিষয়টি নিশ্চিত ভাবেই প্রমানিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমাদের বেশ কয়েকজন রথী-মহারথীর অসহায় মৃত্যুই সেই ফেলের দৃশ্যমান নজির। মাহাথির যখন মালয়েশিয়ার ক্ষমতায় তখন নিজের চিকিৎসা বিদেশে না করিয়ে নিজেদের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে সেই পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন। তারপর দেশেই নিজের চিকিৎসা করিয়েছেন। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীও তার নিজের চোখের অপারেশন নিজের হাসপাতালেই করিয়েছেন। বিদেশে করানোর সকল সুবিধা থাকা সত্বেও, নিজের কিডনি প্রতিস্থাপনও নিজ হাসপাতালে করাতে চাচ্ছেন। সদিচ্ছা থাকলে সবই সম্ভব হয়।

সব অমঙ্গলেই কিছু মঙ্গল নিহিত থাকে। এই করোনাকালের মঙ্গল হলো, আমাদের নিজ ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করতে পারা। আর তা করতে হচ্ছে অনেক মানুষের জীবনের বিনিময়ে। এরপরেও যদি সেই ত্রুটি মেরামতের ব্যবস্থা না হয়, তবে আমাদের মতন দুর্ভাগা আর কেউ থাকবে না। এই করোনাকাল পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দিয়েছে, ভরসাটা নিজের ওপরই করতে হয়। সময়ে সঙ্গতি থাকলেও অন্যের ওপর ভরসার উপায় থাকে না। যেমন এখন উপায় নেই সঙ্গতি থাকা সত্বেও কারো ব্যাংকক-সিঙ্গাপুর দৌড়ানোর।

নিজের ভালো নাকি পাগলেও বোঝে। অথচ আমরাই এতদিন বুঝিনি। তবে কি আমাদের মানসিক অবস্থা তথা চিন্তার জায়গাটি পাগলের চেয়েও ভয়াবহ? না হলে, সুস্থ দাবি করা সত্বেও কেন আমরা নিজের ভালোটাও বুঝতে পারছি না!

পুনশ্চ : গণস্বাস্থ্যের কিটের বিষয়টি এ লেখায় কেন আসলো না, এমন ‘কেন’র অবতারণা হতে পারে বলেই বলছি। অনেকেই তাদের লিখায় এ বিষয়টিকে ‘কিট আর কীটের লড়াই’ বলে অভিহিত করেছেন। মানুষের চোখে ঘটনাটি পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। এতটাই পরিষ্কার যে, তা আর ব্যাখ্যা করে বলতে হয় না।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিজে করোনায় আক্রান্ত হয়ে বিষয়টিকে আরো খোলাসা করে দিয়েছেন। তার আক্রান্ত হওয়াকে অবশ্য অনেকে বিজনেস পলিসি হিসাবেও আখ্যা দিয়েছেন। তার প্রচার কৌশল বলেছেন। এমন ‘ধীমান’দের কী বলি বলুনতো। করোনার এই কালে এদের প্রতি করুণা করতেও করুণা হয়। যাক গে, বাদ দিন। সাথে কিটের প্রসঙ্গটাও আপাতত বাদ থাক।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

হাসপাতাল কাকন রেজা

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0763 seconds.