• ৩০ মে ২০২০ ০০:৫৯:০৫
  • ৩০ মে ২০২০ ০০:৫৯:০৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘করোনায় যাত্রা বন্ধ, জীবিকার জন্য তাই রিকশা চালাই’

অটোরিকশা চালাচ্ছেন যাত্রাশিল্পী ঢুলী মাস্টার লেবু মিয়া। ছবি : বাংলা

আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি :

যাত্রাদলে যোগ দিবেন বলে ১১ বছর বয়সেই ঘর ছাড়েন তিনি। শিল্পী সত্বা তার রক্তে। শত প্রতিকূলতাও কখনো রঙ্গমঞ্চ ছেড়ে অন্য কোন মাধ্যমে যাননি। কিন্তু করোনার দুর্যোগে কর্মহীন হয়ে জীবিকার জন্য যাত্রার মঞ্চ ছেড়ে এখন অটোরিকশা চালান মোহম্মদ লেবু মিয়া।

২৬ মে বিকেলে কথা হয় যাত্রাশিল্পী ঢুলী মাস্টার লেবু মিয়ার সাথে। তার রিকশার যাত্রী ছিলাম। চলছে রিকশা আর কাঁধ ছুই ছুই চুল বাতাসে উড়ছে। তখনই কথায় কথায় জানলাম তার শিল্পী জীবনের কথা। রিকশা চালাতে চালাতেই বললেন, ‘যাত্রার টানে ঘর ছাড়ছি ১১ বছর বয়সে। তখন ড্যান্স (নাচ) করতাম। ছেরি (মেয়ে) সাইজ্যা আছিলাম ৯ বছর। কানে ফুটা আছে। রিং পরতাম। দলে নাচ করতাম। পরে আস্তে আস্তে তবলা বাজাইতে শুরু করি। এইভাবেই অনেক কিছু করে যাত্রা দলে কাটাইছি ৩৫ বছর। আমার রক্তে মিইশ্যা আছে এইসব...’

জানতে চাইলাম তাহলে ছাড়লেন কেন? লেবু মিয়া সাথে সাথেই উত্তর দিলো, ছাড়ি নাইতো! ছাড়বো কেন? করোনার কারণে এখন সব বন্ধ। কোথাও কোন অনুষ্ঠান হয় না। যাত্রা বন্ধ, জীবিকার জন্য তাই রিকশা চালাই।

কথায় কথায় জানা গেলো, লেবু মিয়ার আসল বাড়ি গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈয়র থানার মেদিকাঞ্চনপুর এলাকায়। যাত্রা দলে যোগ দিবেন বলে শৈশবে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। বর্তমান বাড়ি কালিয়াকৈর থানার মধ্যপাড়া ইউনিয়নের হাটুরিয়াচালা গ্রামে। সেখানেই থাকেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘অনেক জায়গায় অনুষ্ঠান করছি। অনেক বড় বড় প্রতিযোগিতায় অংশ ননিয়া পুরস্কার পাইছি। শিল্পকলায় একবার একটা কম্পিটিশনে সেকেন্ড হইছি। আমি অনেকের সাথেই কাজ করছি। তবলা বাজাইছি। রবি চৌধুরী, ডলি সায়ন্তনি এদের সাথেও অনুষ্ঠান করছি। সিনামাতেও কাজ করছিলাম ওমরসানি ছিলো নায়ক।’

সারাদেশেই বিভিন্ন জায়গায় শো করে বেড়াতেন লেবু মিয়া। যাত্রা দল থেকে গানের অনুষ্ঠান সবখানেই তার বিচরন। গান-নাচের দল নিয়েও বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মেলায় অনুষ্ঠান করতেন। ঈদের মৌসুমে অনেক অনুষ্ঠান থাকে তাদের। এবার সব বন্ধ।

দুই মাস ধরে গাজীপুরের মির্জাপুর কালিয়াকৈর এলাকায় রিকশা চালান তিনি। কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে রিকশা থামিয়ে কয়েকটি ছবি তুলে আরো কিছুক্ষন আলাপ করি। শুনতে থাকি তার জীবন বৃত্তান্ত। এমন সময় পাশ দিয়ে যাওয়ার পথে স্থানীয় এক ব্যক্তি জানালেন, লেবু মিয়াকে সবাই ঢুলী-তবলার মাস্টার হিসেবেই ডাকে। বুঝলাম তার পরিচিতি আছে বেশ। ১১ রকম বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারেন তিনি। এই তথ্যের সত্যতা জানতে চাইলে লেবু মিয়া বিনয়ের হাসি হেসে বলেন, শিখছি অনেক কিছুই বাজাতে পারি বাজাইও...।

কিছুক্ষন আলাপ-সালাপের পর আবার আমার এগুতে থাকি। কিন্তু কথা চলতেই থাকে। শিল্পী লেবু মিয়া জানালো এইসব অঞ্চলে এক সময় অনেক বন-জঙ্গল ছিলো। গাছ কেটে রাস্তা হয়েছে। কারখানা হয়েছে। বিল্ডিং হয়েছে। লেবু মিয়া অল্প কথায় শোনালো স্থানীয় আধ্যাত্বিক গল্প। তিন পাগলের আস্তানার কথা। বর্তমান সমাজের কথা। সাই সাই করে তীব্র গতিতে ছুটে চলা অল্প বয়সী মটরসাইকেল চালকদের কান্ডকারখানার কথা। এসবের ফাকে শুনলাম তার একমাত্র ছেলেটি আত্মহত্যা করে মারা যাওয়ার ইতিহাস।

বিকেলটা আগে থেকেই মেঘলা ছিলো। সন্ধ্যা তখন ঘনিয়ে এসেছে। থেমে থেমে বাতাস বইছে। সেই বাতাসে উড়ছে লেবু মিয়ার চুল। গাঢ় নীল-কালোমেঘ আকাশের নিচে সুলোয়েড আলোয় সেই দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিলো যাত্রার ঝকমকে পোশাক পরিহিত কোন নিঃসঙ্গ সেনাপতি দলছুট হয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছে দিগন্তের দিকে। বাতাসে উড়ছে তার চুল...। ময়দানে পরে আছে খোলা তরবারি...আত্মরক্ষার শেষ অস্ত্রটিও।

মেঘলা সন্ধ্যার শেষ আলোটুকুও মিলিয়ে যেতে যেতে আমরা গন্তব্যে পৌঁছে যাই। অন্ধকারে রিকশা ঘুরিয়ে চলে যায় একজন লেবু মিয়া।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0988 seconds.