• ০১ জুন ২০২০ ১৫:৩৭:০৯
  • ০১ জুন ২০২০ ১৫:৫৩:৫৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

কী হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে

যূথিকা গোলদার। ছবি : সংগৃহীত


যূথিকা গোলদার :


পুলিশের হাতে একের পর এক কৃষ্ণাঙ্গের অস্বাভাবিক মৃত্যু আর বিচারহীনতার সীমাও লঙ্ঘিত হয়ে চলেছে বারবার। সবশেষ পুলিশের সহিংসতার শিকার জর্জ ফ্লয়েড। মিনেসোটা অংগরাজ্যের মিনিয়াপলিস শহরের জর্জ ফ্লয়েডের অপরাধ ছিলো খাবার দোকানে তার দেয়া বিশ ডলারের বিল নাকি ছিলো নকল। দোকানের মালিকের নির্দেশনায় কর্মচারী পুলিশকে ফোন করেন এবং চার পুলিশের সদস্য এসে জর্জ ফ্লয়েডকে গ্রেপ্তার করে।

পথচারীদের ধারণকৃত ভিডিও থেকে এটাই স্পষ্ট যে এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ জর্জ ফ্লয়েডকে মাটিতে উপুড় করে তার ঘাড়ের ওপর হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে রেখেছিলেন। জর্জ ফ্লয়েডের আকুতি ছিলো, ‘আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছিনা।’ জীবনের কঠিনতম সময়ে যেমন মায়ের মুখটাই স্মরণে আসে, ৪৬ বছর বয়সী জর্জ ফ্লয়েড ঠিক তেমনি একজন অসহায় শিশুর মত নিজের মা’কেই ডাকছিলেন।

পুলিশ মহাশয় সে দিকে ভ্রূক্ষেপ করেন নি, একটানা প্রায় ৮ মিনিটের মত হাঁটুচাপা দিয়ে রাখবার পর নিস্তেজ হয়ে পড়ে জর্জ ফ্লয়েডের বিশাল দেহ।

এর পরবর্তী ঘটনাও সুখকর নয়। প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে মিনিয়াপলিস শহর। অল্পসময়েই সে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে গোটা আমেরিকাতে।

হ্যাঁ, প্রতিবাদ হতে পারতো শান্তিপূর্ণ। কিন্তু উত্তাল জনতার প্রতিবাদের ভাষা আজ আর নীরব নেই। বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ পুলিশ বা সাধারণ কমিউনিটি গার্ডের কৃষ্ণাঙ্গদের উদ্দেশ্যে নির্বিচারে বুলেট নিক্ষেপ কিংবা শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার নজির ছাড়িয়ে যাচ্ছে মানবাধিকারের সকল সীমা। একের পর এক কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার বিচারহীনতায় অতিষ্ঠ জনতা আজ পথে নেমেছে। এই উত্তাল পরিস্থিতিতে ঘোলা জলে মাছ শিকার করবার জনতাও কিছু রয়েছে। এই মাছ শিকারীরা জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর বিচার চাইতে পথে নামেনি, তারা জনতার ভিড়ে মিলে গিয়ে পথের ধারের দোকান পাট লুটতরাজে মত্ত হয়েছে। ফলস্বরূপ সুস্থ প্রতিবাদে লাগছে ‘ধ্বংসাত্বক কার্যক্রমের’ কালিমা।

প্রতিবাদের মিছিল গুলোতে আজ আর শুধু কৃষ্ণাঙ্গ জনতাই নেই। বর্ণভেদে তারুণ্যের উদ্দীপ্ততায় ভরপুর তরুণ তরুণীদের শ্লোগানে মুখরিত হচ্ছে মার্কিন শহরের রাজপথ।

এদের মাঝে রয়েছে এশিয়ান, আফ্রিকান অথবা অন্য কোন জাতিভুক্ত ছেলেমেয়েরা। রক্ষনশীলতার ঊর্ধ্বে উঠে থাকা ভিন্নবয়সের শ্বেতাঙ্গরাও আজ পথে নেমেছেন। কড়া রোদে তিন-চার বছর বয়সের পুত্র সন্তানকে কাঁধে নিয়ে হেঁটে চলা শ্বেতাঙ্গ পিতার দৃপ্ত চলন বলে দেয় যে বর্ণবাদ সবকিছুকে গ্রাস করতে পারেনি।

মুখ ভর্তি শুভ্র শ্মশ্রু, পরনে পাঞ্জাবী পায়জামা আর মাথাতে টুপি পরিহিত বয়স্ক ভদ্রলোক হয়তো বা আমাদের উপমহাদেশের কেউ হবেন, তাঁর এই মিছিলে সামিল হওয়া মানে একটাই - বর্ণবাদীদের বিরুদ্ধে আমরা এক হতে জানি।

হিজাব পরা মেয়েটিও আজ শত শত জনতার সাথে পথে নেমেছে, চাওয়া একটাই - ন্যায় বিচার আর শান্তি।
আজো বেঁচে রয়েছে সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্নসাধকেরা।

এই বর্ণবাদহীন স্বপ্নসাধকদের স্বপ্নগুলোর গলাচেপে শ্বাসরুদ্ধ করবার মত অসুন্দরের সাধকেরও অভাব নেই। বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গেদের কেউ কেউ মিছিলের ভেতরে ঢুকে পড়ছে, প্রতিবাদের মুখোশ পরে অরাজকতাতে উস্কানী দিয়ে কেটে পড়ছে তারা। কোথাও বা পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ আবার কোথাও পুলিশের উদ্দেশ্যে পাথর নিক্ষেপ করে ভিড়ের মাঝে তারা হারিয়ে যাচ্ছে । কেউবা পিস্তল বা রাইফেল নিয়ে মিছিলে হাজির হচ্ছে। ফলাফল স্বরূপ শুরু হচ্ছে ভয়াবহ অস্থিরতা, পুলিশের টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ সহ আরো কঠিন অবস্থার অবতারনা ঘটে চলেছে।

এসবের পরিণাম কম বেশী সকলেরই জানা, গোটা প্রতিবাদের মোড় পাল্টে দেওয়া হবে, সরকারী দলের মদদে সমগ্র মিছিল আর স্লোগানকে ‘দুষ্কৃতিকারীদের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম’ বলে ট্যাগ লাগানো হবে, তারপর সব থেমে যাবে। দেশের মহারাজ বুঝিয়েই দিয়েছেন যে গুন্ডামী মেনে নেওয়া হবেনা, অতএব কঠোর হাতে এ পরিস্থিতি দমন করা হবে।

তবুও বলবো, আমরা আশাবাদী। ওপরে হেলিকপ্টারের অবিরত টহল, রাস্তাতে কয়েক শত গজ পরপর পুলিশের গাড়িতে হৃদকম্পন তুলবার মত লাল আর নীল বাতির ঝলমলে জ্বলন, রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশ ভিডিও ক্যামেরাতে রেকর্ড চলছে জেনেও দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া জনতা পথে নেমেছে। যুগে যুগে চলে আসছে রাজনৈতিক নোংরা খেলা, তবুও সত্য সুন্দরের সাধনা থমকে যায়না। ফ্লয়েড হত্যার বিচার হবে কিনা জানিনা, তবুও আশা এমনি প্রতিবাদগুলো আনুক ইতিবাচক পরিবর্তন। আমাদের সন্তানদের গায়ের রং না হোক বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গদের রোষের কারণ।

লেখক : ট্রাফিক ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার, ডিপার্টমেন্ট অফ ট্রান্সপোর্টেশন, যুক্তরাষ্ট্র।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.3849 seconds.