• নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ০১ জুন ২০২০ ২০:৩৩:০৪
  • ০১ জুন ২০২০ ২০:৩৩:০৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

করোনা তাদের শেখালো এক সাথে বেঁচে থাকার গল্প

ছবি : বাংলা

করোনা দুর্যোগের প্রভাবে কর্মহীন হয়ে পরা কিছু মানুষ বেঁচে থাকার এক যৌথচর্চা শুরু করেছে। যার নাম দেয়া হলো যৌথ রান্নাঘর। খাদ্যের জোগানও তারা একসাথে সংগ্রহ করেন এবং সবার রান্না এক সাথে হয়। আর সেই খাবারই ভাগ করে খাচ্ছেন তারা।

সবাই মিলে পতিত জমিতেও শাক-সবজির চাষও করেছেন। সেখানে এখন ফসল হয়েছে। এই ফসল তাদের সবার। কারো একার না। কোন পরিবারের ফলন বেশি কোন পরিবারে ফলন কম এই ভেদাভেদও নেই এখানে। এই ফসলই এখন তাদের খাদ্যের জোগানের আরো একটি উৎস হয়েছে। এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে ইসরাত শিউলি নামে সাংস্কৃতিক সংগঠন সমগীতের একজন সংস্কৃতিক কর্মী। যিনি কিছু শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ে গড়ে তোলেন এই যৌথ রান্নাঘর প্রকল্প।

শুরুটা প্রায় দুই মাস আগে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে। রাজধানীর রামপুরা-বাড্ডা এলাকার আফতাব নগরে বাস করেন ১০০ শ্রমজীবী পরিবার। যাদের সদস্য সংখ্যা ৩২০ জন। যখন করোনার প্রকোপে সব কিছু স্থবির হয়ে পরলো অঘোষিত লকডাউনে, তখন কর্মহীন হয়ে পরে এই শ্রমজীবীরা। এই পরিস্থিতিতে কিভাবে কাটবে সামনের দিনগুলো কিভাবে তাদের দৈনন্দিন খাদ্যের জোগান আসবে তা নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। ঠিকই তখনই সাংস্কৃতিক সংগঠক-কর্মী ঈশরাত শিউলি এই শ্রমজীবীদের নিয়ে যৌথরান্না ঘরের উদ্যোগ নেন। তিনি এই মানুষদের পাশে এসে দাঁড়ান যৌথ জীবন চর্চার ধারনা নিয়ে।

এই শ্রমজীবীদের এক সাথে করে সবাইকে নিয়ে একত্রে বাঁচার একটা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। যা রান্না হবে তা সবাই এক সাথে ভাগ করে খাবে। যে যতটুকু খাবার জোগার করতে পারবে তা অন্যদের নিয়েই খাবে। তারা সবাই মিলে খাদ্য সংস্থানের উদ্যোগ নেন। এসময় পাশে এসে দাঁড়ায় আরো বেশি কিছু বন্ধু সংগঠন-ব্যক্তি। তারাও বিভিন্ন সময় খাবার দিয়ে সাহায্য করেছেন। তারা আফতাব নগরেই গড়ে তুলেছেন এক বিশাল রান্না ঘর। হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পরা মানুষগুলো নতুন করে কর্ম তৎপরতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরে। সবাই মিলে মিশে রান্না করেন। একসাথে খাওয়া দাওয়া করেন। নগর বিলাসি জীবনের যে বনভোজন আমরা করে থাকি, আজ বেঁচে থাকার জন্য এই মানুষগুলোর জীবনে যেন নিত্য বনভোজনই নিত্য দিনের আয়োজন হয়ে উঠলো।

এর মাঝেই তাঁরা উদ্যোগ নিলেন আরো একটি প্রকল্পের। পতিত জমিতে শাক-সবজি চাষ করা। যেসব প্লট পতিত ভাবে সেগুলোর মালিকদের সাথে যোযোগ করেন। এই আপাতত পরে থাকা জমিতে তাঁরা ফসল ফলাতে চান। যতদিন প্লট মালিকরা এখানে কোন কাজ না করছেন ততোদিন তাঁরা এই সবজির চাষ করে তাদের খাবারের জোগানটা সংগ্রহ করতে চান। অনেক প্লট মালিকরা রাজিও হলো। ব্যস অনুমতি পেতেই পতিত জমিতে সাবল কোদাল কাস্তে নিয়ে এই নগর শ্রমিকরাই হয়ে উঠলেন পুরোদুস্তর কৃষক। নানা ধরনের শাক সবজির চাষও করলেন। এখন নিয়মিত এই সবজিই তাদের খাবারের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। নিজ বাগানের তাজা সবজি রান্না হচ্ছে...।

এই বিষয়ে কথা হয় এই যৌথ রান্না ঘরের উদ্যোক্তা ইশরাত শিউলির সাথে। তিনি বাংলা’কে বলেন, ‘ছাত্র জীবনে সমাজতান্ত্রিক একটি ছাত্র সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলাম। সেখান থেকেই আসলে এক সাথে বেঁচে থাকার যে জীবন চর্চা আছে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় তার একটি শিক্ষা পেয়েছিলাম। করোনার এই পরিস্থিতিতে এসে মনে হলো এই নিঃস্ব মানুষগুলোকে নিয়ে যৌথ রান্নাঘর আমরা চালু করতে পারি। যেখানে সবাই একসাথে বাঁচার একটি শক্তি খুঁজে পাবে। তখনই পরিকল্পনা করে তাদের নিয়ে শুরু হয় আমাদের বেঁচে থাকার এই সংগ্রাম।’

আফতাব নগরে এখন তাদের সবজি বাগানে অনেক ধরনের সবজি হয়েছে, লাল শাক, পাট শাক, কুমরা, বেগুন, মরিচ আরো কত কিছু...। রমজান মাসে সবাই এক সাথে সেহেরি খেয়েছে ইফতার করেছেন। ঈদের আনন্দও তারা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। যারা ত্রাণ সহযোগিতা করেছেন তাও সবাই একসাথে পেয়েছেন। কেউ পেয়েছে কেউ পায়নি কেউ খেয়েছে কেউ খায়নি এমনটা এখানে হয়নি। এভাবেই চলছে তাদের যৌথ রান্না ঘর আর যৌথ জীবন চর্চা। করোনা এসে যেন তাদের শিখিয়ে গেলো কিভাবে একসাথে বাঁচতে হয়ে। আর সবাই মিলে বেঁচে থাকার আনন্দটা কেমন...। এই শ্রমজীবী মানুষগুলো জানলো- এভাবেও বেঁচে থাকা যায়।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0846 seconds.