• ০২ জুন ২০২০ ১৭:১০:২১
  • ০২ জুন ২০২০ ১৭:১০:২১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

করোনা, মাস্ক ও আমরা

মাইদুল ইসলাম। ফাইল ছবি


মাইদুল ইসলাম :


কলেরা কালীন সময়ে জুতা কোম্পানিগুলো জুতা ব্যবহার করার জন্য বিজ্ঞাপন প্রচার করেছিলো। সেটা মানুষের সুরক্ষার জন্য। গ্রামের সামান্য কিছু মানুষ এখনোও জুতা ব্যবহার করেন না, তাদের দু'এক জনের জন্য আইন করে জুতা ব্যবহার করার তাগিদ দেয়ার দরকার হয়নি। সে সময়ে মানুষের আর্থিক সঙ্কট থাকায় বেশিরভাগ মানুষ জুতা কিনতে পারেনি কিন্তু অভ্যাসটা আস্তে আস্তে তৈরী হয়ে গেছে। ঢাকা শহরসহ দেশের বেশিরভাগ শহর দুষিত মানে ধুলোবালিময় শহর। ধুলোবালি থেকে বাঁচার জন্য হলেও আমাদের মাস্ক ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। বিভিন্ন শহরগুলোতে ধুলোবালি থেকে বাঁচতে সাধারনত এই মাস্কের ব্যবহার দেখা যায়।

১৯১৯ সালের স্পেনে ফ্লু দেখা দিলে একজনের ফ্লু যাতে অন্যকে আক্রান্ত করতে না পারে সে জন্য মাস্ক উদ্ভাবনে মনোনিবেশ করে। ১৯১৯ সালের পরে সাধারন জনগণের হাতে মাস্ক আসে। ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে সেন্ট জর্জেসের ড. ডেভিড ক্যারিংটন মনে করেন, ঢিলেঢালা মাস্ক ভালোভাবে বায়ু ফিল্টার করতে পারে না তবে হাঁচি বা কাশি থেকে ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে এই মাস্ক। আর হাত থেকে মুখের সংক্রমণের বিরুদ্ধেও কিছু সুরক্ষা দিতে পারে। (সূত্র: বিবিসি)

করোনা মহামারীতে বলা হলো বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করুন। শুরুতে মাস্ক ব্যবহার নিয়ে মোটামুটি সবাই সচেতন। ছোট বাচ্চারা বাইরে বের হলেও তাদের মুখে মাস্ক দেখেছি। বাজারে মাস্কের এতো চাহিদা বেড়ে গেলো যে বাজার থেকে মাস্ক লাপাত্তা। এতো বেশি মাস্ক শঙ্কটে পরতে হলো যে গাজীপুরে অসাধু ব্যাবসায়ীরা ব্যবহৃত মাস্ক শ্যাম্পু দিয়ে পরিষ্কার করে বিক্রয়ের জন্য প্রস্তুত করছিলো। আগে যে পরিমান মাস্ক উৎপাদন হতো তা আবার বেশি হতো বলে উৎপাদন আগের মতই ছিলো। সে জন্য কিছু কিছু পোশাক কারখানা নতুন চাহিদা মেটাতে মাস্ক উৎপাদন শুরু করলো। 

মাস্ক যখন হাতের লাগালে আসলো তখন মাস্ক ব্যবহার সীমিত হলো। হাট বাজারে মানুষজন মাস্ক ছাড়া অবাধে চলাফেরা করছে। স্বাস্থবিধি মেনে হাঁচি কাশি দেয়াটা সবাই জেনেছে কিন্তু মানছে না। এই না মানা ততক্ষণই থাকবে যতক্ষন নিজের পরিবারের একজন অসুস্থ হয়নি।

‘ট্রেইন টু বুসান’ সিনেমাতে দেখেছি; আক্রান্ত ব্যাক্তি অন্যের শরীরে কামড় দিলে ভাইরাসটি নতুন শরীরে তাৎক্ষণিক কাজ শুরু করে দিয়ে আক্রান্ত করে। করোনা ভাইরাসটি সিনেমার ভাইরাস থেকে আরো বেশি ভয়ঙ্কর। যার শরীরে প্রবেশ করে প্রাথমিকভাবে ব্যাক্তি বুঝতে পারেন না, তিনি চলাফেরা করার সময় তার সংস্পর্শে আসা ব্যাক্তিদের আক্রান্ত করে থাকেন। এভাবে স্থানীয় পর্যায়ের অজানা ব্যাক্তি থেকে ব্যাক্তি পর্যন্ত এই ভাইরাসের পরিব্যাপ্তি ঘটে।

৩১ মে ২০২০ তারিখে অফিস পাড়ায় প্রথম কর্ম দিবস ছিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, সেই দিনই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ৪০ জনের মৃত্যুসহ মোট মৃত্যু ৬৫০ জন এ দাঁড়ায়। একই দিনে আক্রান্ত হলো ২৫৪৫ জন সহ মোট ৪৭১৫৩ (সূত্র: আইইডিসিআর)। যত দিন যাচ্ছে তত বেশি ঝুঁকি বৃ্দ্ধি পাচ্ছে। যত্রতত্র চলাফেরা, আড্ডা ও অপ্রয়োজনীয় লোক সমাগম যেন শোক বার্তার পূর্বাভাস।

সরকারকে সুরক্ষার জন্য মাস্ক ব্যবহারের সার্কুলার জারি করতে হলো। এতে বলা হয়েছে;
‘বাইরে চলাচলের ক্ষেত্রে সবসময় মাস্ক পরিধানসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, অন্যথায় নির্দেশ অমান্যকারীর বিরুদ্ধে সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ (২০১৮ সালের ১৯ নং আইন) এর ধারা ২৪ (১), (২) ও ধারা ২৫ (১) (ক, খ) এবং ধারা ২৫ (২) অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।' আইনে বলা আছে; মাস্ক পরিধান না করা ব্যক্তিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে অথবা  ৬ মাসের হাজত বাস। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার আশংকাও রয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যবিধির অন্য যে কোনো একটি না মানলে দেওয়া হবে ৩ মাসের জেল অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা। এক্ষেত্রেও উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। (সুত্র: স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত সাকুর্লার)

যাদের মাস্ক ব্যবহার করার অভ্যেস নেই তাদের উশখুশ করবে এটা একেবারেই স্বাভাবিক। কারো কারো দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এমন মনে হতে পারে। আবার কেউ মাঝে মাঝে মাস্ক কানে লটকিয়ে কিছুটা সময় নেন যা একেবারেই মাস্ক অনুপযোগী অভ্যাস। একজন মানুষের নতুন কোন অভ্যাসের সাথে খাপ খেতে সপ্তাহ খানেক সময় লাগতে পারে। মুখে মাস্ক ব্যবহারের অভ্যাস না থাকলেও নতুন ব্যবহার খুব কষ্টকর নয়। মানুষ অসুস্থ হলে বুঝতে পারে বিছানায় থাকার যন্ত্রণা। তাই অসুস্থ হওয়ার আগে প্রস্তুতি নেয়া শ্রেয়।

মাস্কের ব্যবহার নিয়ে যেখানে আইন করা হচ্ছে সেখানে অবশ্যই জনগনের কল্যাণ রয়েছে। আর এই কল্যাণের কথা চিন্তা করে হলেও মাস্ক ব্যবহার অতীব জরুরী। ধরে নিচ্ছি আপনি আমি করোনায় আক্রান্ত হইনি। কোন কোনও বিশেষজ্ঞ বলছেন শুধু আক্রান্ত ব্যক্তি মাস্ক ব্যবহার করবেন। তাহলে আপনি আমি কেন মাস্ক ব্যবহার করবো? ব্যবহার করতে হবে। কারন আমাদের চারপাশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এখন উপসর্গ ছাড়া আক্রান্তের সংখ্যা কম নয়। তাদের স্পর্শে আমি আপনি আক্রান্ত হতে পারি নিমিষেই। তিনি পাশ ফিরে হাঁচি দিয়েছেন, সেটি কোন খুটিতে জমে গেলো। অনিচ্ছাকৃতভাবে সেখানে আমার আপনার স্পর্শ হতে পারে। অভ্যাসবশত সে হাত চলে গেলো নাকে, মুখে অথবা চোখে। মাস্ক থাকলে অন্ততঃ নাক ও মুখ সুরক্ষিত থাকবে। আর যাদের চোখের সমস্যা নেই তারাও চশমা ব্যবহার করলে আশঙ্কাটা একটু হলেও কমে যাবে। 

নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ৩১ মে '২০ থেকে সব অফিস আদালত তাদের কার্যক্রম চালাতে পারবে এবং অফিস চলছে। অফিসের কলিগরা বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছে। ৩'শ ৪'শ কিঃমিঃ পথ পাড়ি দিয়ে। পরের দিন থেকে দিব্বি অফিসে বা মাঠে কাজ করছে। অনেক দিন পর কলিগকে পেয়ে গল্প করছেন, আড্ডা দিচ্ছেন। এসব আমাদের স্বভাবজাত অভ্যাস। সরকারী নির্দেশে ২ মাসের বেশি ছুটি কাটিয়ে ১৪ দিনের হোম কোয়ারিন্টিন এখন আর কেউ মানছেন না। যা আমাদের জন্য এক ভয়ানক পরিস্থিতির সম্মুখিন করবে। তবে অফিসে যতক্ষন অবস্থান করতে হবে ততক্ষণ মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। নির্দিষ্ট দুরুত্ব বজায় রাখতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি না জানা থাকলে জানতে হবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। অফিসে থাকলে হাত ধোয়া বা স্যানিটাইজড করতে হবে।

কুইন্স ইউনিভার্সিটি অব বেলফাস্টের ওয়েলকাম-উল্ফসন ইনস্টিটিউট ফর এক্সপেরিমেন্টাল মেডিসিনের ড. কনর বামফোর্ড মন্তব্য করেন; যখন হাঁচি দিচ্ছেন তখন মুখটি ঢাকুন, তারপর হাতটি ধুয়ে নিন এবং ধোয়ার আগ পর্যন্ত মুখের ভেতরে হাত না ঢোকান - শুধুমাত্র এটুকুতেই নিঃশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ানো ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখবে"। (সূত্র: বিবিসি)

সর্বোপরি যেখানে সামান্যতম সুরক্ষা নিশ্চিত হয় সেটা আমাদের লুফে নিতে হবে। আইন প্রণয়ন হবে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বাস্তবায়ন করবে এটাই নিত্য নীতি। একটি পরিবারের কেউ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে পরিবারটির এই শোক অন্য কারো মনে দাগ কাটবে না। তাই সাবধান হতে হবে এখুনি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি, সুস্থ জীবন যাপন করি।

লেখক : স্বেচ্ছাসেবক ও রেডিও কর্মী।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0948 seconds.