• ০২ জুন ২০২০ ২০:১২:৩৫
  • ০২ জুন ২০২০ ২০:১৬:২১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘এটা একটা শ্রেণী সংগ্রামও’

ছবি : সংগৃহীত


জসুয়া ফ্রাংক :


লস এঞ্জেলসের সবচেয়ে পরিচিত কেনাকাটার জায়গা, মেলরোজ এভিনিউতে যে দৃশ্য দেখা গেল সেটি হল প্রতিশোধের। ফুটপাত ছেয়ে গেছে কাঁচের টুকরায়। গ্রাফিতি এঁকে দেয়া দোকানের সম্মুখভাগ। ভোরের বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ এখনো তাজা। মেয়র এরিক গারসেট্টি শহরজুড়ে জরুরি অবস্থা এবং রাত আটটার পর কারফিউ ঘোষণার কিছু আগে শনিবার রাতের লুটের ঘটনার এটাই ছিল মূলকেন্দ্র।

১৯৯২ সালে রডনি কিংয়ের রায় প্রকাশের পরে লস এঞ্জেলসের রাস্তায় ন্যাশনাল গার্ড নামার পর এই প্রথমবারের মতো গারসেট্টি গভর্নর নিউসমকে আহ্বান করেন ন্যাশনাল গার্ডকে আনার জন্য। রবিবার, সপ্তাহ শেষের গণরোষ এবং ক্ষয়ক্ষতির পর বাকি যা অবশিষ্ট আছে সেটাকে রক্ষা করে সামরিক হামভি (এক ধরনের বিশেষ সামরিকযান - অনুবাদক) এবং সেনারা।

জন আতঙ্ককে উস্কে দিয়ে, ফক্স নিউজ শনিবারের বিক্ষোভ পরবর্তী এই ধ্বংসযজ্ঞকে আখ্যায়িত করেছে ‘সহিংস দাঙ্গা’ হিসেবে। লস এঞ্জেলস টাইমস এই দিকটি বলা নিশ্চিত করেছে যে ‘বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বিভাজন ছিল’, এবং তারপর তারা লুটপাটকারীদের অপরাধী বানানোর লাইনে গেছে। আর রবিবার সকালে, ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে তার সরকার অ্যান্টিফাকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করবে। বাস্তবিক, বিক্ষোভকারীরা, যারা লস এঞ্জেলসের রাস্তায় বিক্ষোভ দেখিয়েছে জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে, তাদের সামষ্টিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে, তারা ছিল একদম লস এঞ্জেলসের মতোই, বিভিন্ন অভিপ্রায়সহ একটি বৈচিত্রময় জনগোষ্ঠী।

যেসব মানুষ লুটপাটকারী হিসেবে পরিচিত হয়েছে তারা ছিল তাদেরই একটি অংশ যারা শুরুর বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার সময় পেছনের দিকে ছিলো। এরা এখন বিবেচিত হচ্ছে ‘গুন্ডা’ এবং ‘চোর’ হিসেবে তাদের দ্বারা যারা এদের পরিস্কার-স্পর্শযোগ্য হতাশাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাকে সহজ মনে করেছেন, যে হতাশা রবিবার সন্ধ্যার মধ্যেই ছড়িয়ে গেছে সান্টা মনিকা এবং লং বিচ জুড়ে। যাইহোক, পাশ কাটিয়ে যাওয়া, কেবল আমেরিকার কাঠামোগত বর্ণবাদকেই উপেক্ষা করে না, বরং আমাদের ভয়াবহ সামাজিক স্তরবিন্যাসকেও উপেক্ষা করে। যেমনটা এই গত সপ্তাহের শেষে লস এঞ্জেলস এবং অন্যান্য স্থানের রাস্তায় দৃশ্যমান হল, সারা দেশ জুড়ে যে অভ্যুত্থান চলছে, সেটি এখন ততটাই শ্রেণী সম্পর্কিত যতটা বর্ণবাদী ন্যয়বিচারহীনতা এবং পুলিশের বর্বরতার সাথে সম্পর্কিত।

ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ হ্যাডমওয়ালা সুরে, এই আশা প্রকাশ করেছেন যে তিনি একজন ‘যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট’ হতে চান। তার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর থেকে যে আগুনে ট্রাম্প হাওয়া দিয়ে গেছেন সেটি আমেরিকার কাঠখড়ির বাক্সে স্ফুলিঙ্গ তৈরি করেছে এবং আগুন এখন তার দোরগোড়ায়। আমরা এখন যা দেখছি সেটি হল একটি পুরো মাত্রার শ্রেণী যুদ্ধ। কোন সন্দেহ নেই, এটি ঘটনাবলীর নিখুঁত একটি ঝড়; কোভিড-১৯ এর ফলে উদ্ভুত ব্যাপক বেকারত্বের প্রভাব, প্রায় ৪০ মিলিয়নের কাজ হারানো, ভাইরাসটিতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে বৈষম্য, একটি কর্পোরেটকৃত সরকার, যেটি ইচ্ছাকৃতভাবে এর সবচেয়ে ভঙ্গুর নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ, সেটিকে সাথে নিয়ে একটি সামরিকীকরণ করা পুলিশ বাহিনী দিয়ে ধারাবাহিকভাবে কালোদের জীবনের উপর আক্রমণ চালানো। 

দোকান লুট করা অন্তর্গতভাবে একটি শ্রেণী ইস্যু, আপনি এটাকে সহানুভুতির সাথে দেখুন আর নাই দেখুন (অবশ্যই সবসময়ই ব্যতিক্রম থাকে)। লুট করা আমেরিকার দীর্ঘকালের ট্রাডিশন, এর শুরু নেটিভদের জমি চুরি করা এবং আফ্রিকানদের দাস বানানোর সময় থেকে। আর বর্তমানে, ধনীরা যখন শপিং মলগুলো লুট করছে না, তারা এখন পশ্চিম ভার্জিনিয়ার কয়লার খনি থেকে শুরু করে জেফ বেজোসের অ্যামাজনের ওয়্যারহাউজগুলো পর্যন্ত সবখানে প্রাকৃতিক সম্পদ আর শ্রম লুট করায় পারদর্শী। গরীবেরা, তাদের সামান্য ক্ষমতার প্রয়োগ করে — এমনকি একটি ধ্বংসাত্মক ও সহিংস উপায়ে হলেও — ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতাহীন থাকার প্রতি একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেছে। তাদের কাছে, লুট করা হল সাহায্যের জন্য আকুতি, আশাহীনতার একটি বহিঃপ্রকাশ। 

আমরা সবাই সেই অসহ্য ভিডিওটি দেখেছি। মিনিয়াপলিসের পুলিশ অফিসার ডেরেক চৌভিন পরিস্কার দিনের আলোয় জর্জ ফ্লয়েডকে খুন করেছে; ফ্লয়েড, দম আটকে হাঁসফাঁস করে, তার মায়ের সাহায্যের জন্য আকুতি জানিয়েছিলেন। আমরা সবাই সেই উদাসীন সাদা পাহারাদারকে দেখেছিলাম, একজন সাবেক গোয়েন্দা, যে জগিংয়ে বের হওয়া আহমাদ আরবেরিকে খুন করার আগে একটি পিক আপ ট্রাক থেকে গুলি চালিয়েছিল। গুলি চালিয়ে কালো মানুষদের হত্যা করার লম্বা তালিকার সাথে আমরা সবাই পরিচিত, হত্যা করার হারটি হতভম্ব করে দেয়ার মতো — সাদাদের থেকে ২.৫ গুণ বেশি। আমরা এটাও জানি যে, কালো জনসংখ্যার ২০%, প্রায় ৯ মিলিয়ন মানুষ, এমনকি কোভিড সংকটের আগেও চরম দারিদ্রের মধ্যে বসবাস করত।  দেশজুড়ে পরিস্থিতি এখন আরো খারাপ হয়েছে, আর তার ফলে সহিংসতা বিস্ফোরিত হতেই থাকবে। 

অবশ্যই গরীবদের মধ্যে টগবগ করে ফুটতে থাকা এই রুক্ষতা এবং সরকারের মদত দেয়া গ্যাংস্টারদের দ্বারা কালোদের উপর চালানো বর্বরতা উভয়ই ট্রাম্প প্রশাসনের আমল থেকে পুরনো। কর্নেল ওয়েস্ট শুক্রবার রাতে অ্যান্ডারসন কুপার ৩৬০ তে এটি চিহ্নিত করে লিখেছেন: 
‘আপনারা ডেমোক্রেটিক পার্টির একটি নবউদারবাদী শাখাকে পেয়েছেন যেটি এখন চালকের আসনে… আর তারা আসলেই জানে না কি করতে হবে কারণ তারা যা কিছুই করতে চায় তা হল আরও বেশি কালো চেহারা দেখানো —আরো বেশি কালো চেহারা দেখানো। কিন্তু প্রায়শই সেই কালো চেহারাগুলোও তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে কারণ ব্লাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল একজন কালো প্রেসিডেন্ট, একজন কালো অ্যাটর্নি জেনারেল, একজন কালো হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (সেক্রেটারি)র  আমলেই এবং তারা কিছু দিতে পারেননি।’

আপনারা কি মনে করছেন এই গত সপ্তাহের শেষটাই ছিল ভয়ংকর? স্রেফ অপেক্ষা করুন। যদি জর্জ ফ্লয়েডকে খুন করার দায় থেকে ডেরেক চৌভিনকে খালাস দেয়া হয় তাহলে এই সাম্প্রতিক বিক্ষোভকেও মনে হবে ক্ষুদ্র। নিশ্চিতভাবেই, এই বিস্ফোরণগুলোর কয়েকটি, সংখ্যালঘুদের ব্যবসা লুট করার মতো ঘটনাগুলো, প্রতিক্রিয়াশীল। যেকারণে বামদের একটি বাধ্যবাধকতা আছে সংগঠিত করার এবং এই ক্রোধকে সত্যিকারের অপরাধী যারা সেই পুঁজিবাদী শ্রেণী এবং তাদের প্রত্যক্ষ রক্ষাকর্তাদের দিকে চালিত করার। 

আমেরিকায় অর্থনৈতিক এবং বর্ণবাদী নিপীড়ন অবশেষে টগবগ করে ফোটার পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্যবস্থগত পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় একটি ব্যবস্থাগত পুনঃনির্মাণকে গ্রহণ করবে। জ্বালাও-পোড়াও থেকে জানালা ভাঙ্গা পর্যন্ত এসব ক্রিয়ার কোন কোনটা হয়তো পরিচালিত হবে হতাশা থেকে। তবুও, এটি হল অন্তর্নিহিত বর্ণ ও শ্রেণীর গতিসূত্র, একটি পরাজিত জনগোষ্ঠী হওয়ার ফলাফল, যা বিদ্রোহের জ্বালানী সরবরাহ করা অব্যাহত রাখবে — যা হবে একটি গুরুতর এবং বর্ধিত অভ্যুত্থান যেটিকে কোন শহরের মেয়র কারফিউ জারী করে বেশিদিন আটকে রাখতে পারবে না।

লেখক : জসুয়া ফ্রাংক কাউন্টারপাঞ্চ এর ম্যানেজিং এডিটর।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0734 seconds.