• ২৬ জুন ২০২০ ১৪:২০:১৩
  • ২৬ জুন ২০২০ ১৪:২০:১৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

প্রেরণার নাম কামাল লোহানী

কামাল খান লোহানী। ফাইল ছবি


অমল আকাশ :


পারিবারিক পুরো নাম আবু নাইম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। যাকে আমরা কামাল লোহানী নামেই চিনি। বেঁচে ছিলেন আমার প্রায় দ্বিগুণ বয়স পযর্ন্ত। এই বিরাট বয়সের পার্থক্যের পরেও আমার কাছেও তিনি ছিলেন লোহানী ভাই। এটা তাদের ক্ষেত্রেই হয় যাদের আর সকল পরিচয়কে ছাপিয়ে মূলত সংগঠক পরিচয়টাই প্রধান হয়ে টান টান সীনায় দাঁড়িয়ে থাকে।

এটা তাদের ক্ষেত্রেই হয়, শরীরের বয়স যাদের তারুণ্য-তাড়নার ত্রিসীমানায় প্রবেশ করতে পারেনা। আর তারুণ্য হচ্ছে জীবনের সেই প্রাণশক্তি যা সর্বদা  টগবগ করছে প্রবল উদ্দীপনায়। যা প্রতিনিয়ত নতুন চিন্তা উৎপাদনে সক্ষম। সংগঠকদের বেলায় এই চিন্তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লিখিত রূপে থাকে না। আমাদের দেশের অভিজ্ঞতা এমনটাই বলে। ফলে এই দেশে সংগঠকদের চিন্তক বা বুদ্ধিজীবী হিসেবে আমলে নেয়া হয় না। অন্তত সনাতন প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিজীবীরাতো তাই মনে করেন। যারা সমাজের অধিকাংশ মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষে কাজ করে যান, তারাইতো প্রকৃত বুদ্ধিজীবী ! ক্ষমতার সাথে দ্বন্দ্ব ছাড়া কখনোই জনতার বুদ্ধিজীবী হওয়া সম্ভব নয়। প্রকৃত বুদ্ধিজীবীতো নিরপেক্ষ নন! তিনি জিনতার পক্ষ এবং রাষ্ট্রের দমন নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। আর সেই বিবেচনায় কামাল লোহানী আমার কাছে একজন জনতার বুদ্ধিজীবী।

বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে কিশোর ত্বকী হত্যার প্রতিবাদে চলমান আন্দোলনে সংপৃক্ততা পর্যন্ত তিনি কাজের ক্ষেত্র এবং মাধ্যম পরিবর্তন করেছেন বহুবার। কিন্তু একটি মৌলিক বৈশিষ্ট তার কখনোই পরিবর্তিত হয়নি, সেটি তার আপোষহীন দৃঢ়তা। তিনি ষাটের দশকে সাংবাদিকতার পাশাপাশি, নৃত্যকলায়, আবৃত্তি, লেখালেখির সাথে যুক্ত থেকেছেন। ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ‘৬২ থেকে’৬৫ তিনি ছায়ানটে থাকাকালীন প্রশিক্ষণ তালিকায় গণসংগীতকে অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন।

‘৭১ এ বার্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কাজ করেছেন। সেই সময় তিনি বিভিন্ন জনের কাছ থেকে গান সংগ্রহ করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের দিতেন গাইবার জন্য। বেতারে ১৬ ডিসেম্বর তার লেখা বিজয়ের বার্তা তারই কন্ঠেই শুনতে পায় বাঙালি জাতি। যুদ্ধের পর সেই বেতারেই আর বেশি দিন থাকলেন না। চলে গেলেন পত্রিকায় এবং তাও ছেড়ে দিলেন ‘৮১ তে। ‘৯১ এ শিল্পকলার মহাপরিচালক হয়ে ষোল মাসের বেশি থাকতে পারলেন না। পরে ২০০৯ থেকে ২০১১ দুইবছরের জন্য আবার শিল্পকলার মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। অপর দিকে সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুলবার ইতিহাসও তার খুব সংক্ষিপ্ত নয়।

‘ক্রান্তি’র পর স্বাধীন দেশে সভপতির দায়িত্ব পালন করেছেন গণ শিল্পী সংস্থা এবং শেষ জীবনে উদীচীর সভাপতি, পাশাপাশি ‘আমার বাংলা’ গবেষণা ও অনুশীলন চক্র গঠন করেছেন। আর এসবের মাঝে আরো কতো কতো সংগঠনের সাথে তার সংপৃক্ততা, বলে শেষ করা যাবে না।। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গড়ে তুলতে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছেন, ভূমিকা রেখেছেন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিতে। ছাত্র রাজনীতে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন তারপর ভাসানী ন্যাপ এবং মৃত্যুর আগ পযর্ন্ত সদস্য ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির। আর শেষ জীবনে অসুস্থ শরীর নিয়ে বাড়িতে যখন চিকিৎসাধীন তখনও তিনি ভাবছেন আবার কোনো নতুন সংগঠন গড়ে তুলবার কথা।

সে সময় একদিন আমি আর বীথি ঘোষ গিয়েছিলাম তার সাথে দেখা করতে। আমরা গেলে তিনি খুশি হতেন বুঝতাম। চার পাঁচ বছর আগে আমি আর রেবেকা নীলা দুদিন ধরে তার এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার অডিও রেকর্ড করতে গিয়ে তার ধৈর্য্যের পরিচয় পেয়েছিলাম। তিনি বিরক্ত না হয়ে বরং প্রবল উৎসাহে ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপ করে গেছেন। তো বীথির সাথে যেদিন লোহানী ভাইকে দেখতে গেলাম, তখন তার শরীর বেশ খারাপ। তার কয়দিন আগেই শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে বাথরুমে পড়ে গিয়েছিলেন। তবু তিনি দীর্ঘ আলাপ জুড়ে দিলেন। সেদিন আলাপ প্রসঙ্গে তার বহুবার পরিবর্তিত কর্ম জীবন নিয়ে বলতে গিয়ে একটা ইঙ্গিত করেছিলেন, ‘আমার আত্মজীবনী মূলক বইটা প্রকাশিত হলে অনেক কিছুই পরিষ্কার হবে তোমাদের কাছে।’ সর্বগ্রাসী করোনা অনেকের মতো লোহানী ভাইয়ের কোনো কোনো পরিকল্পনাকে ভেস্তে দিয়ে গেলো কি? জানিনা তার বইয়ের শতভাগ কাজ শেষ হয়েছিলো কিনা! তবু সেই বইয়ের প্রকাশের অপেক্ষায় রইলাম আমরা।

তবে লোহানী ভাইয়ের কর্ম জীবনের জার্নিকে আমার কাছে বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক ইতিহাসেরই জার্নি মনে হয়। একের পর এক পরিবর্তন এসেছে এখানে। দেশভাগ, বায়ান্ন, ঊনসত্তর, একাত্তর, নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং তারপর বিএনপি-আওয়ামী লীগের পালাবদল। বহু প্রতিষ্ঠান, বহু কর্ম ক্ষেত্রেই লোহানী ভাই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু যখনই মতাদর্শিক আপোষকামীতার, মোসাহেবির প্রশ্ন এসেছে, তখনই তিনি বিদ্রোহ করেছেন অথবা সেখান থেকে সরে এসেছেন। আর মনে রাখতে হবে কামাল লোহানীর মৌলিক গুণ তার সততা, কর্ম নিষ্ঠা, চরিত্রের দৃঢ়তা। তিনি আপাদমস্তক একজন কাজের মানুষ। ফলে কোনো অকাজে সময় নষ্ট করবার মতো ব্যক্তি তিনি নন। যার ফলে দমন নিপীড়ননের এই সমাজ-রাষ্ট্রের কোন অন্যায়কে তিনি মেনে নেননি। সব সময় প্রতিবাদ করেছেন প্রবল সাহসের সাথে। তারই একটা উজ্জ্বল উদাহরণ কিশোর ত্বকী হত্যার প্রতিবাদে তার সাহসী অংশগ্রহণ। সাহস শব্দটা উচ্চারণ যতটা সহজ, প্রদর্শণ ততটাই কঠিন।

আওয়ামী ফ্যাসিবাদের যুগে যখন দেশের বিপুল অধিকাংশ লেখক, সাংবাদিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী সবাই মোসাহেবিতে ব্যস্ত, চাকরি হারাবার ভয়ে পুরোটা মাথা বিকিয়ে দিয়ে বসে আছে, আত্ম মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে যখন ক্ষমতার ননী মাখন চাটতে ব্যস্ত, তখন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস লাগে, কইলজ্জা লাগে! যখন পুরো একটা জাতিকে গুম, খুন, নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে বিকার গ্রস্থ করে ফেলা হয়েছে, তখন সাহসই পারে মানুষকে ভয় নামক বিকার থেকে বাঁচাতে। আর জনগণের সেই সাহস ফিরিয়ে দেবার দায়িত্ব কার? কে অটল দাঁড়িয়ে থাকবে প্রবল ঝড় বাদলেও সাহসের প্রতীক হয়ে? নিশ্চয়ই তিনি জনগণের সংগঠক, লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী। আর এই সাহসই হচ্ছে তারুণ্যকে উজ্জীবিত করবার বিকল্পহীন শর্ত।

সেই শর্ত পূরণ করতে পারেন বলেই কামাল লোহানী আমাদের সময়েরও সংগঠক, বুদ্ধিজীবী। যে বিরাণ ভূমিতে একে একে প্রায় সকল মহীরুহ শুকিয়ে ভেঙে পড়েছে, বিলীন হয়ে গেছে, যেখানে উদাম তাপদাহে টিকে থাকাটা বড়ই কঠিন কাজ। কামাল লোহানী ছিলেন সেখানে টিকে থাকা অবশিষ্ট বৃক্ষের মতো। যার ছায়ায় বসে বুক ভরে অক্সিজেন টেনে নেয়া যায়। বহুদূর হাঁটার পথে কিছুটা ক্লান্তি জুড়িয়ে নেয়া যায়। কামাল লোহানী আমাদের সেই অতীত, বুকে ভয় অথবা সুবিধাবাদ বাসা বাঁধতে চাইলে যেখানে তাকিয়ে আমরা পড়তে শিখি কি করে ভয়কে জয় করতে হয় চেতনায় অটল থেকে। কামাল লোহানী আমাদের সেই বর্তমান যাকে সাথে নিয়ে আমরা আজো একটা গডফাদারতন্ত্রের বিরুদ্ধে, একটা হীরক রাজার রাজত্বে কিশোর ত্বকী হত্যার প্রতিবাদে লড়াই করে চলেছি। মেধাবী কিশোর ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছিলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থে। সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আন্দোলনের একদম শুরু থেকেই কামাল লোহানী আমাদের পাশে ছিলেন।

কামাল লোহানী মৌলবাদ বিরোধীতা বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের নামে আওয়ামী সাংস্কৃতিক ও ত্বাত্ত্বিক যে বলয় তার থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পেরেছেন সব সময়, সে দাবী আমি করবো না। অবশ্য তিনি একা কেনো, আমাদের অধিকাংশ আন্দোলনের ফসলইতো ইচ্ছা কি অনিচ্ছায়, প্রত্যক্ষ কি পরোক্ষ ভাবে আওয়ামী গোলাতেই উঠেছে। কিন্তু আমার মতে ব্যক্তি কামাল লোহানীকে বুঝতে গেলে তার চরিত্রের সর্বদা আপোষহীনতার বৈশিষ্ট্যকে মাথায় রাখা খুব প্রয়োজন।

ত্বকীকে নিয়ে লেখা এক প্রবন্ধে লোহানী ভাই লিখছেন, ‘শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৗশলীদের হত্যা করেছিলো পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর জল্লাদ বাহিনী- আল-বদর, আল-শামস, রাজাকার। আর আজ আদর্শবোধে উদ্বুদ্ধ তীক্ষ্ণ  মনন ও মেধার সংমিশ্রণে গড়ে-ওঠা প্রবল প্রাণের কিশোর ত্বকী কি তাহলে এমনি কোন পরিকল্পনার শিকার, যার কোন বিচার হবেনা। ...জাতীয়তাবাদী নামে কথিত এই সরকার কিংবা প্রশাসনকে দখলদার সেই পাকিস্তান বাহিনীরই প্রেতাত্মাসদৃশই প্রতীয়মান হচ্ছে না?’

যে সরকারের আমলে তিনি দুই বছর শিল্পকলার মহাপরিচালক ছিলেন, যাদের হাত থেকে তিনি একুশে পদক গ্রহণ করেছেন, ত্বকী হত্যার ঘটনাকে তিনি সেই ক্ষমতাসীনদের বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের সাথে তুলনা করতে কুন্ঠা বোধ করেন না। আর তখন মনে পড়ে, তিনি কামাল লোহানী, যিনি ‘৭৫ বাকশালে নাম লেখাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এই হচ্ছেন কামাল লোহানী, যিনি শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ের ময়দানেই থাকেন, সংগঠিত হতে শেখান। আমরা যতদিন সংগঠিত হতে ভুলে যাবোনা, লড়াই করতে ভুলে যাবো না, ততদিন দীর্ঘ দেহে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি ঝুলিয়ে তিনি মিছিলে আমাদের সাথে হাঁটবেন।

আজ তার ৮৭ তম জন্মদিন। তার প্রতি এই দিনে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

লেখক: শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কামাল লোহানী অমল আকাশ

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0807 seconds.