• ২৭ জুন ২০২০ ২২:০৪:৩৮
  • ২৭ জুন ২০২০ ২২:০৪:৩৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

নেদারল্যান্ডের স্বাস্থ্য খাত, পর্ব- ১

ছবি: সংগৃহীত


অনুপম সৈকত শান্ত :


নেদারল্যাণ্ডের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সংক্ষেপে তুলে ধরতে- প্রথমেই পাঁচটা সংখ্যা লেখছি, আপনারা মনে মনে তার পাশে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পাঁচটা সংখ্যা কত- সেটি বসিয়ে নিলেই পার্থক্যটা বুঝতে পারবেন।

জনসংখ্যা- ১৭ মিলিয়ন (১ কোটি ৭০ লাখ), জিডিপি- ৭০০ বিলিয়ন ইউরো, বছরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ- ৭০ বিলিয়ন ইউরো (৬ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা), স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ- জিডিপি’র ১০ শতাংশ, হেলথ সেক্টরের সাথে যুক্ত লোকসংখ্যা ১.১ মিলিয়ন (৬.৫ শতাংশ)। এর সাথে আরো দুটো তথ্য এখানে উল্লেখ্য-

এই ১৭ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার জন্যে সারাদেশে আছে ৩০২ টি হাসপাতাল, যেখানে স্পেশালিস্ট চিকিৎসক পাওয়া যায়, জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে এবং ক্রিটিকাল রোগীদের যাদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দরকার বা অপারেশন দরকার হয়- তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। এই হাসপাতালের বাইরে সারাদেশে আছে হাউজ আর্টস প্রাক্টাইক বা স্থানীয় চিকিৎসকের কেন্দ্র। যেকোন অসুস্থতায় প্রথমে যেতে হয় এসব চিকিৎসা কেন্দ্রে এবং প্রাথমিক চিকিৎসা পরামর্শ দেন সেখানকার হাউজ আর্টস বা স্থানীয় চিকিৎসক (জেনারেল প্রাক্টিশনার)। এনারা সাধারণত মেডিসিনের ডাক্তার। এনারাই প্রাথমিক ডায়গনসিস করেন, দরকার মনে করলে ডায়গনসিস টেস্ট দেন এবং সেসবের উপরে মনে করলে- হাসপাতালের স্পেশালিস্টকে রেফার করেন।

অর্থাৎ আমার ইচ্ছে হলেই নিজে নিজে স্পেশালিস্ট পছন্দ করে বের করে আজ কল করে এপোয়েন্টমেন্ট নিয়ে কাল ডাক্তারের কাছে যাওয়ার স্কোপ এখানে কম (বাংলাদেশে তো দেখেছি, তিন সপ্তাহে তিনজন স্পেশালিস্ট- অর্থোপেডিক্স, নিউরো মেডিসিন, নিউরো সার্জন দেখিয়ে- তারপরে স্যাটিসফায়েড না হয়ে ভারতে চলে গিয়েছে চিকিৎসার জন্যে)। আয়তনে বাংলাদেশের প্রায় সমান কিন্তু জনসংখ্যায় বাংলাদেশের প্রায় দশ ভাগের একভাগ নেদারল্যান্ডে এরকম হাউজ আর্টসেন প্রাক্টাইক আছে ৪ হাজার ৭৪৫টা। প্রতিটা গ্রামের মানুষ সাইকেলে ম্যাক্সিমাম ৩০-৩৫ মিনিটের দূরত্বে এরকম একটি হাউজ আর্টসেন প্রাক্টাইক বা স্থানীয় চিকিৎসা কেন্দ্র খুঁজে পাবে (আমাদের বাসা থেকে সাইকেলে ৫ মিনিট, হেঁটে ১৫-২০ মিনিট দূরত্বে অবস্থিত), বাংলাদেশের সাথে তুলনা করলে বলা যায়, প্রতিটা ইউনিয়নে একটা হাউজ আর্টসেন প্রাক্টাইক আছে। জনসংখ্যার অনুপাতে, প্রতি ৩৬০০ জনের জন্যে আছে এরকম একটা চিকিৎসা কেন্দ্র।

দ্বিতীয়ত, এখানে চিকিৎসা খরচ অনেক বেশি। অর্থাৎ, হেলথ সেক্টরে চিকিৎসার খরচ হিসেবে জনগণের কাছ থেকেও বিশাল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে, সরকারি ৭০ বিলিয়নের বরাদ্দের পাশাপাশি চিকিৎসা খরচ বাবদ বিশাল অর্থ সংগ্রহ করে। ইন্সুরেন্স পলিসির মধ্য দিয়ে প্রাইভেট ইন্সুরেন্স কোম্পানিগুলো জনগণের কাছ থেকে এই অর্থটা সংগ্রহ করে। ১৮ বছরের বেশি প্রতিটা জনগণের জন্যে বেসিক হেলথ ইন্সুরেন্স করা বাধ্যতামূলক, যার খরচ প্রতিমাসে ১০০-১২০ ইউরো, মানে বছরে ১২০০-১৪৪০ ইউরো। ৯৯ শতাংশ জনগোষ্ঠী এই ইন্সুরেন্স কাভারেজের অন্তর্ভুক্ত (লো-ইনকাম পাবলিকের জন্যে আয় অনুপাতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা পায়। অর্থাৎ, আয় কম হলে মাসে হেলথ ইন্সুরেন্সের অর্ধেক টাকা অর্থাৎ ৫০-৬০ ইউরো একাউন্টে চলে আসবে। কিন্তু ইন্সুরেন্স কোম্পানিকে দিতে হবে পুরো ১০০-১২০ ইউরো)।

ইন্সুরেন্স কোম্পানিগুলো প্রাইভেট হলেও এগুলোকে বলা হচ্ছে ‘মুনাফার জন্যে নয়’ এমন কো-অপারেটিভস (all health insurance companies in the Netherlands are not-for-profit cooperatives that allocate any profits they make to the reserves they are required to maintain or return them in the form of lower premiums.)। তার মানে দাঁড়াচ্ছে- ইন্সুরেন্স কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা ও অন্যান্য খরচ বাদ দিলে- জনগণের কাছ থেকে নেয়া এই অর্থের প্রায় পুরাটাই চলে যাচ্ছে হেলথ প্রোফাইডারের কাছে। সরকারের সেই বরাদ্দ এবং এই বিপুল চিকিৎসা খরচ বাবদ জনগণের কাছ থেকে নেয়া অর্থ- এই দুই দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে, দুনিয়ার মধ্যে অন্যতম সেরা, অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা!

ব্যক্তিগতভাবে নেদারল্যান্ডের এই ইন্সুরেন্স সিস্টেমের চাইতে নরওয়ের ব্যবস্থা আমার বেশি পছন্দের। সেখানে জনগণকে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার জন্যে কোন হেলথ ইন্সুরেন্স করতে হয় না। কিন্তু যেকোন জনগণই সেখানে পকেট থেকে টাকা খরচ করে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে পারে। ওষুধ কিনতে পারে। নেদারল্যান্ডের চাইতে নরওয়ের এই চিকিৎসা খরচটাও কম (মানে নেদারল্যান্ডে প্রতিবার ভিজিটে, ইমার্জেন্সিতে বা অন্যান্য সেবায় ইন্সুরেন্স কোম্পানির কাছ থেকে যে অর্থ সংগ্রহ করে সেটা অনেক)। সবচাইতে মজার বিষয় হচ্ছে, এই একচুয়াল চিকিৎসা খরচ বছরে ২০৪০ ক্রোনার (২০০ ইউরোর কম) হয়ে গেলে, তার বেশিটা সরকার বহন করে।

ফলে, নেদারল্যান্ডে জনগণের কাছ থেকে বছরে যেখানে কমপক্ষে ১২০০-১৪৪০ ইউরো ইন্সুরেন্স কোম্পানিগুলো নেয়। সেখানে নরওয়েতে একজনকে ম্যাক্সিমাম ২০০ ইউরো খরচ করতে হচ্ছে (যে বছরে চিকিৎসা গ্রহণের দরকার হচ্ছে না- সে বছর খরচ শুন্য টাকা)। সেটাও কোন প্রাইভেট ইন্সুরেন্স কোম্পানিকে না- সরাসরি হেলথ প্রোভাইডাররা পাচ্ছে। ফলে, সেখানে বৈষম্যটাও অনেক কম হয়। নেদারল্যান্ডে ১৮ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের জনে ফ্রি, নরওয়েতে ১৬ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের জন্যে ফ্রি। সেই সাথে নরওয়েতে সমস্ত রকম মাতৃত্বকালীন চিকিৎসা সেবা ফ্রি, সকল নার্স ও মিডওয়াইফের চিকিৎসা সেবা ফ্রি (জনসংখ্যা অনুপাতে নার্স ও মিডয়াইফের সংখ্যা ইউরোপের মধ্যে নরওয়েতে সবচাইতে বেশি)।

আরো উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, নরওয়েও তাদের জিডিপি’র সাড়ে ১০ শতাংশ হেলথ সেক্টরে খরচ করেই জনগণকে এরকম স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, নরওয়েতেও ইন্সুরেন্স সিস্টেম একটা আছে। সেটা জনগণকে সরাসরি টাকা দিতে হয় না- যে ট্যাক্স দেয়, সেটাই যথেষ্ট। এই স্বাস্থ্য ও সামাজিক বীমার নাম ‘জাতীয় ইন্সুরেন্স স্কিম বা National Insurance Scheme (NIS)’। এটা থেকেই বাই ডিফল্ট প্রতিটা জনগণের চিকিৎসার জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়। অর্থাৎ, এখান থেকেই বাস্তবে হেলথ প্রোভাইডাররা যাবতীয় চিকিৎসার খরচটা পেয়ে যাচ্ছে। নরওয়ের ২০১৫ সালের বাজেটের তথ্য অনুসারে, দেশটির বাৎসরিক বাজেটের ৩৫ ভাগ বরাদ্দই চলে যায় এই ন্যাশনাল ইন্সুরেন্স স্কিমে। যেখান থেকে স্বাস্থ্য খাতে এবং জনগণের সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় হয়।

নরওয়ের এই ব্যবস্থাকে বেশি জনবান্ধব মনে করলেও, নেদারল্যান্ড, জার্মানির এই ইন্সুরেন্স পলিসির বড় সুবিধা হচ্ছে (নরওয়ের তুলনায় নয়, যেসব দেশে নেই, সেসব দেশের তুলনায়)- রোগী নির্বিশেষে চিকিৎসা খরচের লোডটা সমস্ত জনগণের উপরে সমান পড়ছে। অর্থাৎ, একজন সুস্থ সবল- যার কয়েক বছরে এক দুবার স্থানীয় চিকিৎসা কেন্দ্রে যেতে হয়েছে, হাসপাতালে বা স্পেশালিস্টের কাছে যেতে হয়নি, তাকেও মাসে মাসে ইন্সুরেন্সের টাকা দিয়ে যেতে হচ্ছে, যেখান থেকে একজন যার লম্বা সময়ের জন্যে অনেক ব্যয়বহুল চিকিৎসা করাচ্ছেন বা মাসে মাসে ডাক্তারের কাছে যেতে হচ্ছে, তার খরচের বোঝাটা কমানো সম্ভব হচ্ছে।

প্রতিটা জনগণকে প্রতি বছরে কমপক্ষে ১২০০-১৪৪০ ইউরো দিতে হচ্ছে। মানে, এটাকে হেলথ ট্যাক্স হিসেবে ধরে নিলে বুঝতে সুবিধা হবে। অথাৎ, প্রতি বছর এই পরিমাণ হেলথ ট্যাক্স দিয়ে, প্রতিটি জনগণ বেসিক চিকিৎসা সেবাটা বিনামূল্যে গ্রহণ করছেন, এভাবে ধরা যেতে পারে। শুধু একটাই পার্থক্য- সেটা হচ্ছে ট্যাক্সের টাকাটা সরাসরি সরকারের কাছে চলে যায়। আর সেখানে এটা যাচ্ছে প্রাইভেট কোম্পানির কাছে। এতে জনগণের উপরে বাড়তি খরচের বোঝা বাড়ছে ঠিকই- কিন্তু এটিই আবার কিছুটা কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করছে।

(চলবে)

লেখক: প্রকৌশলী ও গবেষক

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.7315 seconds.