• ০১ জুলাই ২০২০ ১৩:১৯:১৪
  • ০১ জুলাই ২০২০ ১৩:১৯:১৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

নেদারল্যান্ডের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা (পর্ব-৪)

ফাইল ছবি


অনুপম সৈকত শান্ত :


ব্যাকপেইনের সমস্যার জন্যে বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ড দু’দেশেই মাঝেমধ্যে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়েছে। এই সমস্যা নিয়ে নেদারল্যান্ডের হাউজ আর্টসেন প্রাক্টাইকের (স্থানীয় চিকিৎসকের কেন্দ্র) কাছে যাওয়ার এক পর্যায়ে প্রচণ্ড বিরক্ত ছিলাম। হাউজ আর্টস (হোম ডাক্তার বা স্থানীয় চিকিৎসক) ঘুরেফিরে পেইনকিলার বাদে কিছুই দিতেন না, আর রেস্টে থাকতে বলতেন! এই মেডিসিনের ডাক্তার কিভাবে স্পেশালাইজড সমস্যার চিকিৎসা করবেন, কিভাবে একজন স্পেশালিস্টের কাছে যাওয়া সম্ভব! - সবকিছু নিয়ে প্রচণ্ড ব্যতিব্যস্ত ও বিরক্ত ছিলাম, নেদারল্যাণ্ডের অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে মনে হচ্ছিলো, সবচাইতে ফাঁপা আর বাজে একটা ব্যবস্থা। বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যাণ্ডসহ এশিয়ার দেশগুলোতে নিজের ইচ্ছে মত স্পেশালিস্ট পছন্দ করে সরাসরি এপোয়েন্টমেন্ট নিয়ে চিকিৎসা নিতে অভ্যস্ত যারা, তাদের কাছে- নেদারল্যান্ড, জার্মানি, নরওয়ের এমন ঘুরেফিরে হাউজ আর্টস বা জেনারেল প্রাক্টিশনারের কাছ থেকে যেকোন চিকিৎসার সূত্রপাত- এমন চিকিৎসা ব্যবস্থা বুঝতে ও হজম করতে বেশ কষ্টই হবে! যাই হোক, আমার সেই অভিজ্ঞতাটা আরেকটু বিস্তারিত বলি ...

২০১৮ এর মাঝামাঝিতে এই পুরাতন ব্যাকপেইনের সমস্যাটা মনে হলো, আগের চাইতেও বেশি এবং ব্যথাটা ডান দিকে নেমে যাচ্ছে। বাংলাদেশে থাকতেই এমন সমস্যায় বছরে এক-দুইবার অর্থোপেডিক্স কিংবা নিউরো-মেডিসিন এর কাছে যেতাম, তারা বেশ কিছু ওষুধ দিতেন আর কয়েকটা ব্যায়াম শিখিয়ে দিতেন, বাসায় রেস্ট নিতাম। আবার ঠিক হয়ে যেত। ২০১৮ সালে যখন ব্যথাটা আগের চাইতে একটু বেশি মনে হলো, হাউজ আর্টসের কাছে গেলাম, প্রথম দফায় পেইনকিলার দিলেন আর রেস্টে থেকে দেখতে বললেন। কয়েকদিন পরে কিছুটা ভালো হলো, কিন্তু পুরো ভালো হলো না। মাসখানেক পরে আবার ব্যথা খুব বাড়লো। আবার গেলাম হাউজ আর্টসের কাছে, আবার পেইন কিলার দিলেন। এবারে লাভ হলো না, ব্যথার চোটে সপ্তাহ পরে আগে আবার গেলাম। বললাম, পেইন কিলারে তো লাভ হচ্ছে না, সমস্যার সমাধান দরকার, পেইনকিলার খেলে তো শুধু নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ব্যথাটা কম অনুভূত হচ্ছে। এত কথা, এত অভাব অভিযোগের পরেও হাউজ আর্টস আলাদা কোন ওষুধ দিল না, কেবল আগের পেইনকিলারে ব্যথাও বেশি কমছে না- এই কথা শুনে পেইনকিলারটা পাল্টে একটু শক্তিশালী পেইনকিলার দিলেন! একজন স্পেশালিস্টের কাছে যে আমার ট্রিটমেন্ট শুরু করা দরকার, সেইদিকে তার কোন ভ্রূক্ষেপই ছিল না। তবে, একটা কাজ করলেন- আমাকে এক্স-রে করতে পাঠালেন।

অবাক ব্যাপার হচ্ছে, ডাক্তার এক্স-রে করতে বললেন, আর আমি সাথে সাথে হাসপাতালে এক্স-রে করতে চলে যাবো, নেদারল্যান্ডে ব্যাপারটা এমন না। শুধু জিজ্ঞেস করেছেন, কোন শহরের হাসপাতালে যাওয়া সুবিধাজনক হবে (আমাদের গ্রামের তিনটা শহরের সাথে বাস সংযোগ রয়েছে- ২৫-৪৫ মিনিট সময় লাগে, প্রাইভেট গাড়ি থাকলে চারটা শহর গ্রাম থেকে সর্বোচ্চ ২৫ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত), আমি একটা শহরের নাম বললাম, চিকিৎসক অনলাইনে সেই শহরের হাসপাতালে রিকুয়েস্ট পাঠালেন। তারপরে, আমার কাজ হচ্ছে বাসায় অপেক্ষা করা। কিছুদিন পরে হাসপাতাল থেকে একটা চিঠি এলো, সেখানে কত তারিখে, কতটার সময়ে এই এক্স-রে করতে যাবো, সেটি উল্লেখ ছিল। সেদিন গিয়ে এক্স-রে করে আসলাম। এতে আবার সপ্তাহখানেক সময় গেল। কিন্তু আমার পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার লক্ষণ নেই। পেইনকিলার খেয়ে সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকলে ব্যথা কমে, কিন্তু আবার যখন এক্টিভ হতে যাই- ব্যথা বেড়ে যায়। ভার্সিটির পড়াশুনায় ছেদ পড়ে যাচ্ছে, কিছু করতে পারছি, কিন্তু চিকিৎসারও কোন খবর নেই, চরম হতাশাজনক অবস্থা! এরপরে হাউজ আর্টসের কাছে গেলে তিনি আমার বিরক্তি, হতাশা দেখে বললেন- চাইলে আমি ফিজিওথেরাপি শুরু করতে পারি। সেদিন সবকিছু দেখে- এক্স-রে রিপোর্ট, আমার সমস্যা দেখে- আবার এমআরআই করতে বললেন এবং মুখে জানালেন- তিনি আশংকা করছেন, আমার হার্নিয়া হতে পারে!

ছোটবেলায় বন্ধুদের মাধ্যমে হার্নিয়া সম্পর্কে আমার একটা ভুল ধারণা ছিল- মনে করতাম এটা একটা যৌনরোগ (ক্যাডেট ভর্তি পরীক্ষা না কোথায় জানি মেডিকেল চেকআপ করে এসে বন্ধু কইছিলো, একদম পুরা নাঙ্গা করে, লিঙ্গের সামনে টোকা মারে, যদি কিছু বের হয় তাহলে হার্নিয়া! তখনই প্রথম এই রোগের নাম শুনেছিলাম, এবং মাথায় এভাবেই ছিল)! তো, বাসায় এসে গুগল করে দেখি, হার্নিয়া হলো মেরুদণ্ডের একটা সমস্যা, কশেরুকার মাঝে যে লিকুইড থাকে, সেটা যখন ডিসপ্লেস হয়ে নার্ভের উপরে চাপ দেয়- সেটাই হচ্ছে হার্নিয়া। নেট থেকে যে জ্ঞান অর্জন করলাম, তাতে লক্ষণ, কারণ- সব মিলিয়ে আমারো মনে হলো, হার্নিয়া হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কেননা, আমার ব্যথাটা ডান দিকে মানে কোমর থেকে ডান পা বরাবর নেমে গিয়েছে, এটা হার্নিয়ার লক্ষণ। এছাড়া, ধূমপান, ওভার ওয়েট- এসবের জন্যে হার্নিয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে- সেগুলোও আমার সাথে মিলে। ফলে, আসলেই সমস্যাটা কি তা নিশ্চিত হওয়ার আগে ফিজিওথেরাপির কাছে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। যাই হোক, আবার হাসপাতাল থেকে চিঠি এলো, আবার সপ্তাহখানেকের অপেক্ষার পরে এমআরআই করালাম, রিপোর্ট হাউজ আর্টসের কাছে এলো। সেখানে যাওয়ার পরে তিনি জানালেন, হ্যাঁ, আমার হার্নিয়া হয়েছে। এর চিকিৎসা কি, কিভাবে সুস্থ হবো? তিনি এবারে আমাকে একজন নিউরোমেডিসিনের স্পেশালিস্টের কাছে রেফার করলেন। আগের মতই, আমার করার কিছু নেই, কবে কোন স্পেশালিস্টের কাছে যাবো, কোন কিছুই জানলাম না, কেবল বাসায় এসে হাসপাতালের চিঠির জন্যে অপেক্ষায় থাকা ছাড়া করার কিছু নেই। কয়েকদিন পরে প্রতীক্ষিত সেই চিঠি এলো। হাসপাতালের নিউরোমেডিসিনের একজন স্পেশালিস্ট আমাকে দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু সেই এপোয়েন্টমেন্ট প্রায় একমাস পরে। প্রথম হাউজ আর্টসের কাছে যাওয়ার পরে প্রায় ৩-৪ মাস লেগে গিয়েছে, আমার যে হার্নিয়া হয়েছে- এইটুকু বের করতেই! সেটা সহ্য করেছি, কিন্তু সমস্যাটা জানার পরেও সমাধানের ব্যবস্থা শুরু হতে হতে আরো একমাস অপেক্ষা করতে হবে- এই ব্যাপারটা কোনভাবেই মানতে পারছিলাম না, পুরোই অসহ্য লাগছিলো। ডাচ পরিচিত অনেকের সাথে সেসময়ে যোগাযোগ করেছি, কথা বলেছি, সিটি করপোরেশনের একজন পরিচিত লোক ছিলেন- খুব হেল্পফুল, তাকেও বলেছি, আমার ভার্সিটির প্রফেসর- এরকম অনেককেই বলেছি, দ্রুত স্পেশালিস্টের কাছে যাওয়ার কোন উপায় আছে কি না। কেউ আসলে প্রশ্নটাই বুঝতে পারছিলো না, কেননা এই একমাসের মধ্যে আমি এপোয়েন্ট পেয়েছি, তাদের কাছে এটাই অনেক দ্রুত। সিটি করপোরেশনের সেই লোকটার এবং আমার ভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট হেড-এরও হার্নিয়া হয়েছিলো বলে জানালো, তাদের ক্ষেত্রে অপারেশন করতে হয়েছিলো। যাই হোক, এক মাস অপেক্ষার সময় কারোর কাছেই খুব বেশি মনে হলো না। আমি জানালাম, অপেক্ষা তো করছি সেই ৩-৪ মাস ধরে, কোনরকম চিকিৎসা ছাড়াই। সেটার জন্যে সবাই দুঃখ প্রকাশ করে, এমনকি কয়েকজন নেদারল্যান্ডের এমন ওয়েটিং টাইম নিয়ে সমালোচনাও করলো- কিন্তু অপেক্ষা না করে দ্রুত স্পেশালিস্টের কাছে যাওয়ার পথ কেউ বাতলাতে পারলো না। কেবল, সিটি করপোরেশনের ঐ লোকটা জানালো, খুব ভয়ানক অবস্থা শুরু হলে- ইমার্জেন্সিতে কল দিতে, তাহলে দ্রুত নিয়ে গিয়ে অপারেশন করে ফেলবে।

ফলে, ত্যক্ত-বিরক্ত ও প্রচণ্ড হতাশা নিয়ে একটা মাস অপেক্ষা করলাম। নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ে হাসপাতালে গেলাম। স্পেশালিস্ট ভদ্রলোক বেশ বয়স্কই মনে হলো, বয়স ষাটের আশেপাশে হতে পারে। তিনি প্রথম ১০-১৫ মিনিট ধরে হার্নিয়া কি, কিভাবে হয়- এসব নিয়েই আলোচনা, মানে গল্পগুজব করলেন। ওনার কাছে একটা ডামি মেরুদণ্ড ছিল, সেটা হাতে নিয়েই ধরে ধরে এই মেরুদণ্ডের কাজ কারবার বুঝালেন। তারপরে আমার এমআরআই রিপোর্টটা ওনার কম্পিউটার থেকে দেখালেন, সেটার মানে কি, তা আবার ডামি মেরুদণ্ড দেখিয়ে বুঝালেন। সব বুঝলাম, কিন্তু মূল যে জায়গা- এই সমস্যা থেকে মুক্ত হবো কিভাবে, সুস্থ হবো কিভাবে, সেই আলোচনায় আসলেন তিনি অনেকখানি সময় পার করার পরে। জানালেন, এই হার্নিয়া ভালো করার কোন ওষুধপাতি নাই।  কেবলমাত্র পেইন কিলার খাওয়ার মাধ্যমে ব্যথাটা কমানো যায়, আর কিছু ওষুধ আছে- সেগুলো পেশিকে রিল্যাক্স করে, কিছুটা আরাম বোধ হতে পারে। কিন্তু এগুলো দিয়ে হার্নিয়া ভালো হয় না। তাহলে উপায়? উপায় হচ্ছে : শুরুর দিকে কিছুটা রেস্ট নিলে অটোমেটিক ভালো হয়ে যেতে পারে (আবার নাও পারে), অপারেশন করা যেতে পারে (কিন্তু একই সমস্যা ভবিষ্যতে আবার ফিরে আসতে পারে)। আর কষ্টটা সহ্য করে গিয়ে কিছুটা নিয়ম-কানুন আর ফিজিওথেরাপির মাধ্যমেও এটাকে কন্ট্রোলে নিয়ে আসা যায়। যেহেতু ৪-৫ মাসেও কিছু হয়নি, ফলে একটু রেস্ট নিলেই ভালো হয়ে যাবে, এটা আমার জন্যে প্রযোজ্য নয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কি করতে চাই- অপারেশন, নাকি রিভালিডাচি বা পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় চিকিৎসা নিতে আগ্রহী, সেটি জানতে চাইলেন। নিউরোমেডিসিনের স্পেশালিস্টের পুরো প্রেজেন্টেশনের মধ্যেই একটা অপারেশনবিরোধী অবস্থান ছিল, সেই সাথে অপারেশনের ব্যাপারে একরকম ভয়- সবমিলেই সিদ্ধান্ত নেই সেই রিভালিডাচি কর্মসূচিতে যাওয়ার। আবার বাসায় কিছুদিন অপেক্ষা করলাম, যদিও সেই স্পেশালিস্ট বলে দিয়েছিলেন, যেকোন ইমার্জেন্সিতে সরাসরি যেন ফোন করে এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে চলে আসি- আবার হাউজ আর্টসের কাছে যাওয়ার দরকার নেই। কিছুদিনের মধ্যে আবার হাসপাতাল থেকে চিঠি পেলাম, রিভালিডাচি সেন্টারের একজন চিকিৎসকের সাথে এপয়েন্টমেন্ট পেলাম, এবারের অপেক্ষা অবশ্য খুব বেশি না, সপ্তাহখানেকের। সেখানেও তিনি মেরুদণ্ডের নানা সমস্যা-সংকট সম্পর্কে বললেন এবং দৈনন্দিন দিনযাপন, ব্যায়াম- প্রভৃতির মাধ্যমে কিভাবে মেরুদণ্ডকে সুস্থ রাখা যায়- সেগুলো বললেন। তারপরে জানালেন- আমার জন্যে বরাদ্দ প্রতি সপ্তাহে একদিন আধা ঘণ্টার ফিজিওথেরাপি আর তার আগে পনের মিনিটের এরখোথেরাপি (ইংরেজিতে ট্রান্সলেট করে পেলাম : অকুপেশনাল থেরাপি, এটা পরের দিকে দুই সপ্তাহে একবার করে হয়েছে)। আবার চিঠি দিয়ে আমাকে আমার শিডিউল জানানো হলো যে, প্রতি শুক্রবার সকালে এই দুই থেরাপি নিতে হবে। প্রথমদিন ফিজিওথেরাপি নিতে গিয়ে দেখি, আমার জন্যে একটা কমবয়সী ছেলে আরেকটা মেয়েকে ঠিক করে দেয়া হয়েছে। তারাও, সেই একই ধরণের আলাপ দিয়ে শুরু করলো। মেরুদণ্ডের কাজ, সমস্যা সংকট ইত্যাদি। কম্পিউটারে আমার এমআরআই ছবি দেখলো। আমাকে দেখলো, কতখানি সোজা দাঁড়াতে পারছি, হাঁটাচলা, এক পায়ে দাঁড়ানো- এসব দেখে দুজন আলোচনা করে একটা প্লান তৈরি করলো এবং পরের সপ্তাহ থেকে থেরাপি শুরু হবে বলে জানালো। পরের সপ্তাহ থেকে ব্যায়াম (ফিজিওথেরাপি) শুরু হলো, একদম প্রথমে ভালোভাবেই বলে দিলো- মেরুদণ্ডকে ভালো রাখার মূল অস্ত্রই হচ্ছে মুভমেন্ট, ফলে প্রতিদিন আমাকে হাঁটতে হবে। তাদের ব্যায়ামের আধাঘণ্টার মধ্যে প্রথম দশমিনিটই রাখলো হাঁটার মেশিনে হাঁটার ব্যায়াম। ব্যথার চোটে ঐ সময়ে হাঁটাহাঁটি করাটাই ছিল সবচাইতে কষ্টের ব্যাপার, সেখানে এই হাঁটাহাঁটির মাধ্যমেই হাঁটাকে সহজ করে দিলো। এছাড়াও ছিল জিম-বল দিয়ে কিছু ব্যায়াম, মাসখানেক পরে আরো কিছু জিনিসপাতি ব্যায়াম করা শেখালো, সেগুলো বাসাতেও করা শুরু করলাম। যে দু’জন আমার দায়িত্বে দিল, দু’জনই অনেক ফ্রেন্ডলি, ব্যায়ামের পাশাপাশি নানা ধরণের গল্পগুজব করতো (এই ফিজিওথেরাপি সেশনটা আমার জন্যে একরকম ভাষা শেখার ক্লাসেও পরিণত হয়েছিলো)!

অন্যদিকে এরখোথেরাপি জিনিসটা হচ্ছে, দৈনন্দিন জীবন যাপনে মেরুদণ্ডের যত্ন কিভাবে নেয়া যায়, সে ব্যাপারে একরকম কাউন্সিলিং। সেখানে শোয়ার বিছানা থেকে, কিচেন সবকিছুই আছে। হাঁটার সময়ে কিভাবে হাঁটি, কিভাবে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকি, শোয়ার সময়ে কিভাবে শুই, কিভাবে রান্না করি, থালাবাসন ধুই, সবজি কাটাকাটি করি, বাজারের পরে বাজারের ব্যাগ বহন করি, কিচেনের উপরের বা নিচের শেলফ থেকে কিভাবে জিনিসপাতি বের করি, নিচু হয়ে কিভাবে কোন জিনিস তুলি... ইত্যকার সব ব্যাপারেই আলোচনা হতো, করে দেখাতে হতো, এবং থেরাপিস্ট সঠিকভাবে সেটি করার উপায় বাতলে দিতেন, সেটা সেখানে প্র্যাক্টিস করতে হতো! এই দুই থেরাপির মাধ্যমে আস্তে আস্তে ব্যথা কমতে থাকলো, একটা সময়ে পুরো ভালোও হয়ে গেলাম। বিশেষ করে, যেদিন ফিজিওথেরাপির শেষ সেশন হলো- মনে হচ্ছিলো, এটা আরো অনেকদিন ধরে চলুক!

এটা ঠিক যে, শুরুর দিকে এমন দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে, সে সময়ের সেই ব্যথা সহ্য করার অভিজ্ঞতা- সবমিলিয়ে বিরক্তির জায়গাটা এখনো রয়ে গিয়েছে, এখনো মনে করি- স্পেশালিস্টের একটা এপয়েন্টমেন্ট পেতে এত সময় লাগাটা এই চিকিৎসা ব্যবস্থার দ্বিতীয় বড় সমস্যা (প্রথমটা হচ্ছে- উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়), নরওয়ের এক বন্ধু জানিয়েছিলো- চিকিৎসকের এপয়েন্টমেন্টের জন্যে তাকে ৩-৪ মাস অপেক্ষা করতে হয়েছিলো, এটাকে অবশ্যই বিশাল বড় সমস্যা বা খুঁত মনে করি; কিন্তু সেই কষ্টকর অপেক্ষার পরে যেভাবে আমার সমস্যাটাকে হ্যান্ডেল করা হয়েছে এবং যেভাবে সমাধান বের করেছে, সেটা আমার জন্যে সম্পূর্ণ এক নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। বাংলাদেশেও ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা আছে, কিছু আত্মীয় গিয়েছেন- সেখান থেকে শুনেছি, কিন্তু আমার কখনো যাওয়া হয়নি। আমাকে স্কয়ারের এক নিউরোমেডিসিন স্পেশালিস্ট কয়েকটা ব্যায়াম শিখিয়ে দিয়েছিলেন- বাসায় করার জন্যে। বাংলাদেশে এরখোথেরাপি বলে কিছু আছে কি না জানা নেই, তবে অর্থোপেডিকস, নিউরোমেডিসিন, নিউরোসার্জন- এরা জীবন যাপন নিয়েও কিছু কিছু পরামর্শ দিতেন, যেমন স্থূলত্ব কমাতে হবে, ভারী কিছু বহন করা যাবে না ইত্যাদি! এখানে, এরখোথেরাপি এই দুই পরামর্শের কোনটাই দেননি। স্থূলত্ব নিয়ে কোন কথা বলেননি। ভারী জিনিস বহনের সময় লোড ব্যালান্স, নিচ থেকে তোলার সময়ে কিভাবে বসে তুলতে হবে, এগুলোই বলেছেন, এই সেই ঐ করাই যাবে না- এমন অবাস্তব পরামর্শ দেন নাই!

সবচাইতে বড় বিষয় হচ্ছে, এখানে সবাই কানেক্টেড, সেই মেডিসিনের ডাক্তার বা হাউজ আর্টস থেকে শুরু করে নিউরো মেডিসিনের স্পেশালিস্ট, রিভালিডাচি আর্টস, ফিজিওথেরাপিস্ট, এরখোথেরাপিস্ট- সবাই কানেক্টেড। আর বাংলাদেশের সব ডাক্তার আলাদা আলাদা! আমি একবার অর্থোপেডিক্সের কাছে যাচ্ছি, তিনি একবারো বলছেন না যে, আমার সমস্যাটা হাড্ডির না, কশেরুকার ঝামেলাটা নার্ভের উপরে প্রেশার তৈরি করছে, ফলে নিউরোলজিস্টের কাছে যাও! আমি নিউরোলজিস্টের কাছে যাচ্ছি, তিনি যদি মনে করেন আমার ফিজিওথেরাপি দরকার, তিনি নিজেই ব্যায়াম দিয়ে দিচ্ছেন, কিন্তু কোন ফিজিওথেরাপি আমাকে রেফার করেননি। বিখাত কিছু নিউরোসার্জন চিকিৎসক আছে বাংলাদেশে- ওনাদের কাছে যাওয়ার সাথে সাথে এমনভাবে রোগীকে কনভিন্স করবেন যে, মনে হতে অপারেশনটাই একমাত্র উপায়! এই কনভিন্স করার ক্ষেত্রে মূল হাতিয়ার হচ্ছে- ভয়। তারা ভয় দেখাবেন, এখনই অপারেশন না করলে ভয়ানক বিপদ দেখা দিবে, কয়েকমাস পরেই আরো কতবড় সমস্যা তৈরি হয়ে যাবে, ইত্যাদি।

একটা উদাহরণ হিসেবে আমার ব্যক্তিগত যে অভিজ্ঞতাটা এখানে দিলাম, সেটা আমার ব্যাকপেইন বা হার্নিয়ার সমস্যার। কিন্তু, যেকোন অসুস্থতার চিকিৎসার ক্ষেত্রেই আমার ধারণা- বাংলাদেশ আর নেদারল্যান্ডের মূল পার্থক্যের জায়গাটা এখানেই। একটা পরিপূর্ণ সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা এখানে গড়ে উঠেছে, যার শুরুটা হয় মেডিসিনের একজন চিকিৎসক বা হাউজ আর্টসের হাত ধরে। তিনিই প্রাথমিক ডায়গনসিস করে সিদ্ধান্তটা নেন, কোন ধরণের চিকিৎসাসেবা রোগীর জন্যে দরকার, কোন স্পেশালিস্টের কাছে এই রোগীকে পাঠানো হবে। এবং পরের ধাপে যে চিকিৎসকের কাছে রোগী যায়, সেই চিকিৎসকেরও কোন দায় নেই- রোগীকে নিজের হাতের মুঠোয় রাখার, অপারেশন লাগবে, না কি অন্য কোন সেবা লাগবে- এরকম যে চিকিৎসাই দরকার হোক, সেই উদ্যোগ তিনি নেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সমন্বিত চিকিৎসাটাই অনুপস্থিত। বাংলাদেশে আমরা বিভিন্ন হাসপাতালের, ক্লিনিকের, কিংবা প্রাইভেট প্র্যাক্টিসের নানান বিখ্যাত বা স্টার চিকিৎসকের নাম জানি, না জানলেও একটু খুঁজলেই, কিংবা বড় বড় কিছু হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তারদের তালিকা সংগ্রহ করে নিয়ে এসে- নীচের ডিগ্রীগুলোর দিকে চোখ বুলালেই আমরা বুঝে ফেলি- কে কত বিখ্যাত। সে অনুযায়ী আমরা একেকজন স্পেশালিস্টকে চিকিৎসার দায়িত্ব দেই। নিজেরাই স্পেশালিস্ট ঠিক করি। কিন্তু, প্রতিটা চিকিৎসক একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন, এমনকি একই হাসপাতাল, ক্লিনিকের চিকিৎসকেরাও একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রত্যেক চিকিৎসকই তার কাছে আসা রোগীকে ধরে রাখতে চান! এর ফলাফল হচ্ছে : ভুল চিকিৎসা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে অপ্রয়োজনীয় ভিড় বাড়িয়ে  রোগী প্রতি তার ইফেক্টিভ ও কোয়ালিটি টাইম একদম কমিয়ে দেয়া,  এবং একজন চিকিৎসককে মানুষকে সেবা দেয়ার মহৎ কর্তব্যের জায়গা থেকে সরিয়ে লোভের বলি করে ফেলা। সে জায়গা থেকে, আমিও মনে করি, যেকোন অসুস্থতায় চিকিৎসার শুরু হওয়া দরকার একজন হাউজ আর্টস বা জিপি বা একজন মেডিসিনের হোম ডাক্তারের হাত ধরে। প্রাথমিক চিকিৎসার বাইরে রোগ ডায়গনসিসের দায়িত্ব ও স্পেশালিস্ট যদি দরকার হয়, সেই স্পেশালিস্টের পরামর্শটাও আসা দরকার এই হাউজ আর্টসের হাত ধরেই।

ফলে, হাউজ আর্টস থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত চিকিৎসার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে যতই তিক্ত অভিজ্ঞতাই থাকুক, হাউজ আর্টসেন প্রাক্টাইকের মাধ্যমে চিকিৎসার সূত্রপাতের ব্যবস্থাকে আমি সমর্থন করি। তাহলে, এই ব্যবস্থাটার মূল সমস্যাটা কেবল থাকছে, অপেক্ষার এই দীর্ঘ সময়! এর কারণ কি আসলে? কিভাবে এটা কমানো যায়! আসলে এই ওয়েটিং টাইমটা নেদারল্যান্ডে আগে আরো অনেক বেশি ছিল, এই শতকের শুরু থেকে বেশ কিছু ব্যবস্থা নেয়ার দরুণ এই অপেক্ষাকালীন সময় অনেকখানি কমেছিলো। ইনপ্যাশেন্ট রোগীদের ওয়েটিং টাইম ৮.৬ সপ্তাহ থেকে কমে ৫.৫ সপ্তাহ হয়েছে, আর আউটপেশেন্টের ওয়েটিং টাইম ৬.৪ সপ্তাহ থেকে কমে হয়েছে ৫.১ সপ্তাহ। সার্জারির জন্যে ওয়েটিং টাইম ২০১১ সাল নাগাদ কমে হয়েছে ৫ সপ্তাহ। ওয়েটিং টাইম কমানোর জন্যে যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তার মধ্যে ছিল, হাসপাতাল কেয়ারের সরবরাহ বৃদ্ধি, হাসপাতালের জন্যে ফিক্সড বাজেটের বদলে এক্টিভিটি বেজড বাজেটের ব্যবস্থা করা, ২০০৫ সাল থেকে স্পেশালিস্টদের জন্যে পার-কেইস ভিত্তিক পেমেন্টের ব্যবস্থা করা। কিন্তু, ২০১৯ এ এসে দেখা গিয়েছে ওয়েটিং টাইম ২০১৫ এর তুলনায় আবার বেড়ে গিয়েছে। ওয়েটিং টাইম ৫ সপ্তাহ থেকে বেড়ে ৬.৭-৭ সপ্তাহ হয়েছে।  এই ওয়েটিং টাইম বৃদ্ধির বিষয় নিয়ে নেদারল্যান্ডের পেশেন্ট ফেডারেশন নামের সংগঠনের ডিরেক্টরের মতে - এর কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন প্রশিক্ষিত স্পেশালিস্টের সংখ্যা বাড়ানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তার মতে, নেদারল্যান্ডের লম্বা ওয়েটিং টাইমের আসল কারণই হচ্ছে, হাসপাতালগুলোতে স্টাফ সংকট। এই সমস্যা দূর করার উপায় নিয়ে বিভিন্ন রকম আলোচনা আছে। একজন স্পেশালিস্ট তৈরি করতে বছরের পর বছর সময় লাগে, ফলে স্পেশালিস্ট তৈরির জন্যে জনগণকে বিশেষভাবে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করা উচিৎ। একজন স্বাস্থ্য বিষয়ক অর্থনীতিবিদ বলছেন, এই শর্টেজ কাটানোর জন্যে দরকারে দেশের বাইরে থেকে স্পেশালিস্ট নিয়োগ দেয়া দরকার (ইউকে’র ৩০% চিকিৎসক বাইরের, আর নেদারল্যান্ডের ক্ষেত্রে এই অনুপাত মাত্র ২.৭%)। তবে এটাও ঠিক যে, স্পেশালিস্টের সংখ্যা বাড়ানোর সাথে সাথে সরকারের চিকিৎসা ব্যয় আরো বেড়ে যাবে,  সরকার যদি বরাদ্দ আরো বাড়াতে না চায়, তাহলে জনগণের কাঁধেই চাপটা চলে আসবে এবং ইন্সিওরেন্সের প্রিমিয়ামের দামও বাড়বে।

চলবে...

লেখক : প্রকৌশলী ও গবেষক

বাংলা/এসএ/

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1069 seconds.