• ০৮ জুলাই ২০২০ ০১:২৫:৩৬
  • ০৮ জুলাই ২০২০ ০১:২৫:৩৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

নিগৃহীত গণমাধ্যমকর্মী, রাষ্ট্রের কল্যাণহীনতার প্রতিচ্ছবি

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

গণমাধ্যমকর্মীদের পেটানো এখন সবচেয়ে সোজা কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুগদা হাসপাতালে আনসাররা পেটালো সেদিন। আবার দেখলাম, কুমিল্লার মুরাদনগরের এক ইউপি চেয়ারম্যান এক গণমাধ্যমকর্মীকে কুপিয়েছেন সহযোগিদের নিয়ে। ওই গণমাধ্যমকর্মী মুরাদনগর প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বেও রয়েছেন। শুধু তাকে আহত করেই ক্ষান্ত হননি চেয়ারম্যান, তার মুক্তিযোদ্ধা বাবা, এমন কী মাকেও পিটিয়েছেন। ওই গণমাধ্যমকর্মীর দোষ হলো, তিনি চেয়ারম্যানর দুর্নীতির কিছু চিত্র তুলে ধরেছিলেন তার প্রকাশিত খবরে।

এমন ঘটনা বেশ কিছু দিন ধরেই ঘটে আসছে। দুর্নীতির খবর প্রকাশ পেলেই দুর্নীতিবাজগণ খবরের কর্মীদের উপর চড়াও হচ্ছেন। মারধোর করছেন, না হয় হুমকি দিচ্ছেন। এছাড়া মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া তো রয়েছেই। গোঁদের উপর বিষ ফোঁড়া হিসাবে রয়েছে তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক আইন। এই করোনাকালেও বেশ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী এই আইনের ধারায় অন্তরীণ হয়েছেন।

এখন প্রশ্নটা হলো গণমাধ্যমকর্মীদের কাজটা কী? তারা কি শুধু বাতাবি লেবুর বাম্পার ফলনের খবর করবেন, নাকি তাদের আরো কিছু করার রয়েছে? খবরের মূল কাজটাই হচ্ছে অনুসন্ধান। আর অনুসন্ধানের সাথে জড়িত সমাজের অদেখা অংশটি। যা সাধারণত মানুষের দৃষ্টির অগোচরে থেকে যায়। আর অগোচরে যা থাকে, তার বেশি সিংহভাগ অংশই কালো। কালোবাজার, কালোটাকা সবই দৃশ্যের বাইরের বিষয়, ব্যাকস্টেজের ঘটনা। সঙ্গতই খবরের মূল টার্গেট হলো এই কালোকে দৃশ্যমান করা। আর এচিভমেন্ট হলো সমাজকে সাদা রাখার প্রয়াস।

আজকে যদি গণমাধ্যম এবং তার কর্মীরা অনুসন্ধানটা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারতেন তবে এই ‘কালো’ বিষয়গুলো অনেকটাই সাদা হয়ে উঠতো। সঙ্গতই মাফিয়াতন্ত্র এতো শক্তিশালী হয়ে উঠতো না। এই মাফিয়াতন্ত্র দেশটাকে তাদের পরগণায় ভাগ করে নিয়েছে। সেখানে অলখে তাদের প্রভাবই চলে সব। একজন আনসার, একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এমনকি পরিষদের সদস্য পর্যন্ত খবরকর্মীর গায়ে হাত তোলার সাহস পায়।

উন্নত বিশ্বের চিত্রটা দেখি। প্রেস কনফারেন্সে একজন খবরকর্মীর কথার জবাব না দিতে পেরে বাধ্য হয়েই কনফারেন্স শেষ করে চলে গিয়েছিলেন ট্রাম্প। যিনি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রধান। সেই খবরকর্মীর মানসিক জোরটা দেখেছিলেন। এই মানসিক জোরের উৎস হলো সেখানকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। আর সেই স্বাধীনতার উৎস হলো বস্তুনিষ্ঠতা। সে কথায় পরে আসছি। আগে ট্রাম্পের আরেকটি ঘটনা বলি। ট্রাম্প সিএনএন এর এক খবরকর্মীকে হোয়াইট হাউসে নিষিদ্ধ করেছিলেন। সেই কর্মী মামলা করেছিলেন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এবং তার প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ সিএনএন তার পাশে দাঁড়িয়েছেল শক্ত ভাবে। আইন সেই খবরকর্মীর পক্ষে রায় দিয়েছিলো। তিনি আবার হোয়াইট হাউসে গিয়েছিলেন খবর সংগ্রহে। অতএব বুঝুন পার্থক্যটা। ওখানে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে লড়া যায়, আর আমাদের এখানে আনসার, চেয়ারম্যান, মেম্বার যে পারে সেই পেটায় খবরের কর্মীদের। ‘সরল ভাবে’ ব্যাখ্যা করে বলতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চেয়ে আমাদের চেয়ারম্যান, মেম্বারদের ক্ষমতা বেশি।

এখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে বস্তুনিষ্ঠতার কথা বলি। স্বাধীনতার উৎসের সাথে সততার প্রশ্নটা জড়িত। আর সততার সাথে সত্য বলার সাহসের। আমাদের চিত্রটা কী, বস্তুনিষ্ঠতার ক্ষেত্রে আমাদের শুদ্ধতা কতটুকু, প্রশ্নটা এখানেই। নৈতিকতার ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থানটাই বস্তুনিষ্ঠতার পথে অন্তরায়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে নিজেদের তরফ থেকে ব্যর্থতা বা বাধার একটি বড় দিক। আর এই ব্যর্থতাই মূলত সফল করেছে গণমাধ্যমের প্রতিপক্ষকে। যারা ‘কালো’ জগতের বাসিন্দা। যাদের ‘কালো কর্ম’কে আলোতে আনাই খবরকর্মীদের কাজ।

এই যে খবরের কর্মীরা নিগৃহীত হচ্ছেন, লাঞ্ছিত হচ্ছেন, আহত এবং নিহত হচ্ছেন। তাদের পেছনে দাঁড়াচ্ছেন কারা। গণমাধ্যমের মালিকরা দাঁড়াচ্ছেন কিংবা গণমাধ্যমকর্মীদের নেতরা? না, দাঁড়াচ্ছেন না। বিচ্ছিন্ন ভাবে দু’একটা ঘটনায় তাদের রিয়েকশন থাকলেও সার্বিক ভাবে তাদের মধ্যে বিরাজ করছে বিচ্ছিন্নতা, বিভাজন। এই বিভাজন প্রতিপক্ষের একটি বড় শক্তি। আর খবরের কর্মীদের জন্য আত্মঘাতের বিষয়। তাদের এই নিগ্রহ, মৃত্যু সেই আত্মঘাতেরই দৃশ্যমান রূপ।

তবে খবরের কর্মীদের মধ্যে যারা আত্মঘাত ছড়িয়েছেন তাদের জন্যও এমন দৃশ্যপট মঙ্গলজনক নয়। বস্তুনিষ্ঠ খবর তা যদি বিপক্ষেরও হয় তাও রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক। রাষ্ট্রযন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণে এমন খবরের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। আর সে জন্যই গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থস্তম্ভ। যারা মনে করেন এই আখ্যা অহেতুক, বাহুল্য, তাদের প্রতি ইতিহাস বড় কঠোর। চটজলদি উদহারণ হলো হিটলার ও তার প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলস। ইতিহাসের দুই খলনায়ক। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে, মানুষের স্বাধীনতা। আর মানুষের স্বাধীনতা মানে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা। মূলত স্বাধীনতার চিন্তা মানুষেরই। যেহেতু সংগঠিত মানুষই সৃষ্টি করে রাষ্ট্রের। না হলে রাষ্ট্র শুধুমাত্র জড় একটা বিষয়। মানুষ না থাকলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অর্থহীন। আর গণমাধ্যম সেই মানুষের কথা বলে, সে জন্যেই গণমাধ্যমের উপস্থিতি ও স্বাধীনতা এত প্রয়োজনীয়।

সুতরাং যে দেশে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি নিপীড়ন যত বেশি সে দেশ তত বেশি পশ্চাতপদ। আমাদের দেশের এগিয়ে যাবার এত যে কাহিনি সবই মিথ্যা হয়ে দাঁড়াবে যদি গণমাধ্যমকর্মীরা এভাবে আক্রান্ত হন। গণমাধ্যম যদি মিথ্যা বলতে শুরু করে, বস্তুনিষ্ঠতা হারায়। গণমাধ্যম মিথ্যাবাদী হলে, বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে সাথে সকল উন্নতির বর্ণনাও মিথ্যা হয়ে যাবে, বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। সুতরাং নিজ স্বার্থে হলেও গণমাধ্যমকে স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ রাখতে হবে। প্রবাদ বলে, নিজ স্বার্থ পাগলেও বোঝে। আমাদের চিন্তা নিশ্চয়ই ওই পর্যায় ছাড়ায়নি। 

লেখক : সাংবদিক ও কলামিস্ট।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

গণমাধ্যম কাকন রেজা

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0778 seconds.