• ০৯ জুলাই ২০২০ ০৯:০৭:১৫
  • ০৯ জুলাই ২০২০ ০৯:০৭:১৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

গরু, বাংলা একাডেমি ও বাংলা ভাষার প্রগতিকরণ

ছবি : প্রতীকী


আনিস রায়হান :


বাংলা ভাষার বিকাশের পথে বাংলা একাডেমি এক ভয়াবহ প্রতিবন্ধক। বাংলার অনেক ক্ষতি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। 'গরু'-কে 'গোরু' লিখতে বলাটা তার মধ্যে পড়ে কিনা সেটা খতিয়ে দেখার প্রশ্ন। তবে কেউ যদি কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে ভাষার মতো একটি জ্ঞানকাণ্ডের বিষয়কে মূল্যায়ন করে, সেটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ভাষার গাঠনিক আকার থেকে দেখে এবং ইতিহাসে ভাষার বিকাশের প্রক্রিয়াকে আমলে নিয়ে এ প্রশ্নে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। আমি মনে করি, এটাকে দেখতে হবে বাংলা ভাষার প্রগতিকরণের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।

জ্বি, হ্যাঁ, বাংলা ভাষার প্রগতিকরণের প্রশ্ন আছে। কারণ এটাকে হাতে ধরে প্রতিক্রিয়াশীলতার দিকে ধাবিত করা হয়েছে। বাংলা একাডেমি এই অকাজে নবীন একটি পক্ষ। অতীতে এ কাজে ভূমিকা রেখেছেন মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যিকরা, শ্রী চৈতন্য থেকে দীনবন্ধু মিত্র এবং বিদ্যাসাগর-উইলিয়াম কেরি গং ও তাদের ভাবশিষ্যরা।

মধ্যযুগে জনগণের মুখের ভাষা থেকে লিখিত বাংলার পৃথকীকরণের ঘটনাটি সংঘটিত হয়। তখন নবদ্বীপ-এর সেন রাজাদের তত্ত্বাবধানে নদীয়ার ভাষাকে সাহিত্যিক ভাষার ভিত্তিরূপে এবং বানান ও শব্দের বিষয়াদিকে সংস্কৃতের নিয়মনির্ভর করে তৈরি করা হয়। এই ধারাই কালক্রমে লিখিত বাংলার মূলধারা হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীকালে বিদ্যাসাগর আর উইলিয়াম কেরি গং এই বাংলার আধুনিকীকরণে হাত লাগায় এবং লিখিত বাংলার বাক্যগঠনের নিয়মাবলীকে ইংরেজি ভাষার নিয়মাবলীর ওপর দাঁড় করিয়ে দেয়। এসব কাণ্ডের ফলে ঊনিশ শতকে লিখিত বাংলা ভাষা জনগণের মুখের ভাষা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এটাই বাংলা ভাষার প্রতিক্রিয়াশীলতার দিকে যাত্রার ইতিহাস।

পাকিস্তান গঠনের পর পূর্ববাংলার ভাষাবিদ ও সাহিত্যিকরা বাংলা ভাষার এই সংকট মোচনের ব্যাপারে খানিক চিন্তা করেছিলেন, ইতিহাসে এর নমুনা মেলে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসককূল ও তাদের ভাবশিষ্যদের আগ্রহে বাংলার উর্দুকরণ ও ইসলামীকরণ গতি পেলে নতুন সংকট হাজির হয়। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটিও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বাংলা ভাষার অন্তর্গত সংকট তথা গাঠনিক সমস্যা সমাধানের প্রশ্নটি আড়ালে চলে যায় এবং রাষ্ট্রে ভাষার অবস্থানগত সংকটটি প্রাধান্য পেতে থাকে। ভাষার ইসলামীকরণের প্রতিক্রিয়ায় এর বিপরীতে সাহিত্যিক ও ভাষাবিদদের একটি অংশ কলকাতা থেকে প্রাপ্ত বাংলার পক্ষেই অবস্থান নেয় এবং এভাবে পূর্ববঙ্গের জনগণের মুখের ভাষার সঙ্গে লিখিত ভাষার সম্পর্ক-সংঘর্ষ বিশ্লেষণের সমস্যাটি চাপা পড়ে যায়। এটা আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি, এখনও না।

বাংলাদেশ পর্বে বাংলা বাংলা একাডেমি স্বয়ংক্রিয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং ওই শ্রেণী-গোষ্ঠীটির প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে বাংলা ভাষার ইংরেজিকরণ-সংস্কৃতকরণকে টিকিয়ে রাখে ও বিকশিত করে। পরিভাষার ক্ষেত্রে, নতুন শব্দের ক্ষেত্রে, ভিন্ন ভাষার শব্দ আত্মীকরণের ক্ষেত্রে তারা ইংরেজির ওপরই ভর করে। এই প্রক্রিয়া থেকে বাংলা লিখিত ভাষাকে বের করে এনে জনগণের মুখের ভাষার সঙ্গতিপূর্ণ করা তোলাটাই বাংলা ভাষার প্রগতিকরণের মূল প্রশ্ন।

অবয়বগত দিক থেকে দেখলে উচ্চারণঘনিষ্ঠ শব্দ ও বানান রীতি, মানভাষাকে পূর্ববাংলার স্থানীয় ডায়ালেক্টগুলোকে (ডায়ালেক্ট অর্থ উপভাষা নয়, বরং স্থানীয় আদিভাষা, এটাকে) ভিত্তি করে এগিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়াই এই প্রগতিকরণের মূল কর্মসূচি। বাংলা একাডেমি এই কাজে বাধা দেয়, আবার কখনো কখনো এর পক্ষেও দাঁড়ায়- বিভ্রান্তের মতো আচরণ করে। একেকবার একেকজনের হাতে প্রকল্প দেয়া হয়, তারা তাদের ইচ্ছামতো কাজ করে। আগের কাজ বা পরের কাজের মধ্যে সঙ্গতি থাকে না।

তবে 'গরু'কে 'গোরু' বলে কি তারা অপরাধ করেছে? আমার কাছে মোট ২৪টি বাংলা অভিধান আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন হলো শ্রীজ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’, এটি ১৩২৩ সনে অর্থাৎ এখন থেকে ১০৪ বছর আগে প্রণীত ঢাউস এক শব্দ সংকলন। এতে দেখলাম ‘গোরু’র উৎসনির্দেশে সংস্কৃতে ‘গো’, হিন্দি ভাষায় ‘গোরু’ এবং বাংলা ভাষায় ‘গরু’ ও ‘গোরু’ উভয়টিকেই সঠিক নির্দেশ করা হয়েছে।

এদিকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ প্রণীত বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধানে কোথাও ‘গোরু’ উচ্চারণটি নেই। ‘গরু হিনান’ বলে সেখানে ঢাকা অঞ্চলের একটি শব্দ এসেছে, উচ্চারণে কোথাও আলাদা করে ‘গ-ওকার (গো)’ নেই। এ থেকে আমার মনে হয়েছে, সংস্কৃত গো এবং হিন্দি গোরুর লেজ ধরে লিখিত বাংলা ভাষায় ‘গোরু’ ঢুকে পড়েছে, যা আসলে পূর্ববঙ্গে ‘গরু’ বৈ কিছু নয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে যেতে ভয় হয়, কারণ বিভিন্ন অঞ্চলের উচ্চারণ ধ্বনিগুলো পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ আমার হয়নি। নিজে যে অঞ্চলের উচ্চারণরীতি অনুসরণ করি- যশোর-খুলনা- তা অনেকটা কলকাতানির্ভর এবং এতে গরুর উচ্চারণ ‘গোরু’-ই করা হয়। অন্য অঞ্চলগুলোতে উচ্চারণে তফাত কতখানি, সে বিষয়ে আমার কোনো জ্ঞান নেই।

তাহলে বিষয়টা কী দাঁড়াল? সম্ভবত বাংলা একাডেমি পুরনো অভিধানে বানানটা পেয়ে অর্থাৎ চোথা দেখে তা নকল করেছে মাত্র। তারা আসলে এই শব্দের ব্যাপকভিত্তিক গ্রহণযোগ্য উচ্চারণধ্বনি কী, তা খুঁজে বের করার প্রয়াস চালাননি। অথচ বাংলা ভাষার প্রগতিকরণের প্রশ্ন এটাই- জনগণের কাছে যাও, লিখিত ভাষাকে তাদের কাছে ফেরত দাও- শিল্প-সাহিত্য-দাপ্তরিক কাজ, সবই স্থানীয় আদিভাষার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ করে গড়ে তোলো। বাংলা একাডেমি এটা কখনো করবে না, সমাজে এজন্য বিরাট ভাঙচুর দরকার। বড়োসড়ো গণউত্থানই কেবল পারে এই বিশাল বোঝাটাকে সরাতে।

হ্যাঁ, বর্তমানে চালু লিখিত বাংলা ভাষা অবশ্যই এ অঞ্চলের জনগণের জন্য ভয়ানক এক বোঝা। এই বোঝা সরাতে আমাদের হাত লাগাতে হবে।

বাংলা/এসএ/

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1730 seconds.