• ১৪ জুলাই ২০২০ ১২:৪৪:০১
  • ১৪ জুলাই ২০২০ ১২:৪৪:০১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘এই শুনানি শেষে ফেরত আসুক জালুয়া’


সাঈদ স্যাম


১.

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের মূল চরিত্র বা নায়ক কুবের। সংসারের অভাব-দারিদ্র্য, দুঃখ-বেদনাদগ্ধ কুবের একদিকে যেমন অভিভাবক, তেমনি চিরপঙ্গু মালার স্বামী, সন্তানের স্নেহময় পিতা। শহর থেকে দূরে কেতুপুরের অজগ্রামটি পদ্মা নদীর তীরে। কুবের তাঁর সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে নদীতে মাছ ধরে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। উপন্যাসটি পড়বার সময় থেকে মাথায় তাড়না করতো কবে পদ্মার পাড়ে গিয়ে জেলেদের চিত্র দেখব। আমার মনে হয় যারা উপন্যাসটির গভীরে গিয়ে পড়েছেন তাঁদেরও এই তাড়নার বল্লমের ছেদ খুব করে বিঁদ্ধ করেছে। ছটফট নিবারণ হয়নি। এই জেলে পরিবারগুলোর জীবনদৃশ্য উপলব্ধি করবার তাড়না আমার মিটে গেল ব্রহ্মপুত্রের জেলে পরিবারগুলোর হা-হুতাশ, কোলে দুধের বাচ্চাটির মায়ের কান্নার সাথে চোখের নিষ্পাপ অশ্রু দেখে। কুড়িগ্রামের এই জেলে পরিবারগুলোর দিকে একবার তাকালে, আর দুনিয়ার কোন জেলে পরিবারের দিকে তাকাতে হবে না। দৃশ্য একই। কুড়িগ্রাম শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চিলমারীর রমনা গ্রাম। জেলেদের বসবাস। লকডাউনের ফাঁদে একই এলাকার ২৬ জন জেলে ভারতের কারাগারে বন্দি। এই ২৬ জন জেলে সংসারের অভিভাবক, স্বামী, ও স্নেহময় পিতা। ব্রহ্মপুত্র নদের মাছে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। জেলেদের অভিভাবক এই বিশাল দরিয়া– ব্রহ্মপুত্র। শহরে, গ্রামে, রেলস্টেশনের মানুষ শান্ত হয়ে ঘুমের দেশে যখন, তখন এই জেলেরা সারারাত জেগে ভদ্র মানুষের পছন্দের বাঘাড়, বাঁশপাতারি, বৈরালি ধরেন। কখনো কখনো মাছের দেখা মেলে না। মাছ ধরা না পড়লে, অনাহারে-অর্ধাহারে থাকতে হবে পবিবারের সবাইকে।  নিষ্ঠুরতা, মানসিক যন্ত্রণার সাথে ভেসে বেড়ায়, লড়াই করে, নিজেদের বাঁচিয়ে রাখে শূন্যের মাঝে। অপেক্ষায় থাকে বৃদ্ধ স্যান্টিয়াগো’র মতো। পুবদিক লাল হয়ে উঠা অবধি মাছ ধরতেই থাকে। তারপর রওনা দেয়। ততক্ষণে ব্রহ্মপুত্রের নদের  জলে, তীরে জীবনের সাড়া জাগে। রমনার ট্রেনের বাঁশির হুইসেল বাজে। জলে-স্থলে জীবন প্রবাহ অবিরাম। ঘাটে নাও ভিড়তেই মাছের ডাক বা নিলাম উঠে যায়। শেতল বাবুর মতো লোক মাছ নিয়ে বলে, ‘কাইল দিমু কইলাম যে?’ অস্ফুট স্বরে কুবের বলে, ‘হালা ডাকাইত’। ২৬ জন রমনার জেলে কখনো এভাবে বলছে কিনা জানা নেই। ২ মাস পার হয়ে যাচ্ছে কেউ তাঁদের দেখবার নেই। তাঁরা এবার স্ফুট স্বরে বলছে আমাদের, ‘হালা ডাকাইত।’

২. গত ৩ মে সকালে, ২৬ জন বাংলাদেশিকে আটক করে ভারতের আসামের ধুবড়ি জেলার পুলিশ। এই ২৬ জন বাংলাদেশির বাস কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার রমনা ইনিয়নের ব্যাপারীপাড়া গ্রামে। পাসপোর্ট ও তিন মাস মেয়াদের ভ্রমণ ভিসা নিয়ে ভারতের আসামে যায়। ৩ মে কয়েক ঘণ্টার জন্য চেকপোস্ট খুলে যাবে এমনটা শুনে এই ২৬ জন বাংলাদেশি আসামের জোড়হাট থেকে ধুবড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়। এই সময় ধুবড়ি জেলার চাপোড় থানার পুলিশ তাঁদের আটক করেন লকডাউন ভাঙ্গার অভিযোগে এবং ফরেন অ্যাপেয়ার ১৪ ধারা অনুযায়ী জেলে পাঠায়।

পুলিশ অভিযোগ করেছেন, এই ২৬ জন বাংলাদেশি টি-ওয়ান ভিসা নিয়ে ভারতের আসাম রাজ্যের জোরহাট, গোলাঘাট ও শিবসাগর এলাকায় কাজ করে ভিসার শর্ত ভঙ্গ করেছে। খেয়াল করবেন, ২৬ জন জেলে কিন্তু চুরি করেনি। পেট কি মানে লকডাউন? লকডাউনে আটকা পড়ে পেটের দায়ে না হয় এইসব এলাকায় কাজ করেছে। এই কি তাঁদের অপরাধ? সে অপরাধের ঘানি মাসের পর মাস টানতে হবে? শুধু কি তাঁরাই? – ‘না’, সমস্ত পরিবারগুলোও টানছে। তাহলে, বাংলাদেশে অবৈধভাবে ৫ লাখের মত ভারতীয়রা কাজ করে এদের বেলা কি হবে? সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ এমন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ ও ভারতের সরকারের দিকে। আপনারা জানেন, গত ১ জুলাই ২৬ জনের মধ্যে বকুল মিয়া নামে একজন জেলে মারা যান। এটি মৃত্যু নাকি হত্যা প্রশ্ন জাগে মনে। কান্নার রোল পড়েছে ২৬ পরিবারে। কান্নার জল মিশেছে ব্রহ্মপুত্রে। পিতাময় ব্রহ্মপুত্র বন্দি সন্তানের জন্য নালিশ জানাচ্ছে বঙ্গপোসাগরে। আর আমরা?

৩. এ আমার জলের দেশ। এখন বর্ষাকাল। হু-হু করে বাড়ছে পানি। জেলে পরিবারগুলো পানিতে। চারদিকে জলে জলময়। পোঁতা কাটাতারকে তোয়াক্কা না করেই জলরাশি চলছে দেশ থেকে দেশান্তরে। অথচ বৈধভাবেও মানুষ পারে না ওপারের স্বজনদের কাছে যেতে। ‘পাগল মন রে এখনো মানুষ ভজতে পারলাম না..’, তাই আটকা থাকে জেলে। জেলে বউয়ের স্বপ্ন কে পারে আটকাতে? স্বপ্নে দেখে নেংটি পরে তাঁর জালুয়া ব্রহ্মপুত্রের ভরা জলে যেতে চায়, জেলে বউ আধো স্বরে কপিলার মতন করে বলে, ‘আমারে নিবা না মাঝি?’ আবার গন্ধে ভরা আঁশটে দেহে ভোর বেলায় দুয়ারে এসে হাক দেয়, ‘কপিলা’ বলে।

‘আটক ছেলেদের ফেরত এন দ্যাও। খুব কষ্টে আছি হামরা বাবা। সরকারের যেন একনা দয়া হয়।’ এই আর্তনাদ ভারতে আটক মানেক ও রেজাউলের মা মালঞ্চ বেগমের। ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কুড়িগ্রাম শহরে এসে আটক জেলেদের  স্বজনেরা তিন-তিন বার মানববন্ধন করেছে, জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে গেছে। আর কত বার দাঁড়ালে পরে ফিরবে তাঁদের বাবা-সন্তান-স্বামীরা? শুনানির পর শুনানি হচ্ছে, আগামী ১৮ জুলাই আবার শুনানি আছে। এই শুনানিতে যেন `হামার ২৫ জালুয়া' বাড়ি ফেরে।

“তোমার জালত ধরা পড়িল মোর,

অবলার হিয়া”

ঘাড়ে জাল, মুখে গুনগুন করা ভাওয়াইয়া গানে অবলার মন ধরা পড়ে যায়। কেন, ভদ্র সমাজের হিয়ায় ধরা পড়ে না? নাকি, ঈশ্বর থাকেন ওই গ্রামে, ভদ্রপল্লীতে?

লেখক: কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান (অনার্স) চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

বাংলা/এসএ/

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0838 seconds.