• ১৬ জুলাই ২০২০ ১৪:০৩:১৯
  • ১৬ জুলাই ২০২০ ১৪:০৩:১৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

করোনার ভুয়া সার্টিফিকেট, করাপ্ট অপারেটিং সিস্টেম ও নির্বিবেক মধ্যবিত্ত

ছবি : প্রতীকী

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালেও বিক্রি হচ্ছে করোনা পরীক্ষার ভুয়া সনদপত্র, নেগেটিভ সার্টিফিকেট। আমাদের গণমাধ্যমের অবস্থা দাঁড়িয়েছে খবর দিয়েই খালাস। অথচ আধুনিক সাংবাদিকতার অন্যতম দিক হচ্ছে খবরের পর্যালোচনা। ‘মতামত’ ধরনের কলামগুলো খবর পর্যালোচনার মূল জায়গা হয়ে উঠে। বিষয় বিশ্লেষণের ধারা হয়ে উঠে। যার ফলে বিশ্বের সব গণমাধ্যমই পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের উপর জোর দেয়। এদিকে আমাদের গণমাধ্যমের বেশিরভাগই পিছিয়ে। যারা এগিয়ে তাদের মধ্যেও রয়েছে, ‘মতামতে’র নামে রাজনৈতিক মতবাদ চাপিয়ে দেয়ার জবরদস্তি চেষ্টা। তথ্য-উপাত্তের ধার না ধেরে আবেগের উপর ভাসিয়ে দেয়ার চেষ্টা। কোন ক্ষেত্রে স্রেফ স্তাবকতা। যার ফলে বিশ্বমাধ্যমে অপিনিয়নের জায়গাটা যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, আমাদের ওখানে তা হচ্ছে না।

না হলে না হোক, আমাদের কত কিছুই তো হয় না। এখন আসি খুমেক-এর করোনা সার্টিফিকেট বিক্রির কথায়। আচ্ছা বলুন তো, কেনো বিক্রি করবে না। তাদের কি শখ-আহ্লাদ নেই। কদিন আগেও যে রিকশায় চড়েছেন কিংবা কখনো পকেটে ভাড়া না থাকায় পদব্রজে পথ পাড়ি দিয়েছেন। এমন কেউ যখন দুই কোটি টাকার গাড়ি কিনে এবং তা গণমাধ্যমে খবর হয়, তখন কি অন্যদের তেমন শখ জাগে না, আহ্লাদ হয় না? হয়, নিশ্চিত হয়। আর দুই নম্বরি ছাড়া শর্টকার্টে নগদ-নারায়ণ প্রাপ্তির আর কোনো পথ নেই। সুতরাং বিক্রিযোগ্য হয়ে উঠে সব। করোনা পরীক্ষার ভুয়া সনদ থেকে, নীতি-নৈতিকতা, বিবেক-বোধ সবকিছু।

পাশের বাড়ির বখাটে বল্টু যখন গাড়ি হাঁকায়। পেটে দু’কলম বিদ্যা নেই অথচ বুদ্ধিজীবী সেজে টকশো’তে ঠকবাজি ঝাড়ে, তখন চরম মেধাবী ছেলেটারও দুর্বৃত্ত হয়ে উঠতে মন চায়। নির্বিবাদ মানুষেরও ঠকবাজ হয়ে উঠতে ইচ্ছে করে। বাটপার সাহেদের হাসপাতালে যখন একজন মেধাবী ডাক্তার কাজ করেন এবং সাহেদের ধমক-ধামক শোনেন, তখন কি সেই ডাক্তারের মরে যেতে ইচ্ছে করে না? তার মন নীতি-নৈতিকতা আর আদর্শের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠে না? করে এবং উঠে। তখনই তারা ডা. সাবরিনা হয়ে উঠতে চায়। টাকা আর ক্ষমতা চায়। এ চাওয়া পঁচে যাওয়া সমাজের নষ্ট চাওয়া। এমন পঁচা-স্খলিত সমাজে স্খলনের ইচ্ছাটাই জোরদার হয়ে উঠে, হয়ে উঠাটাই সঙ্গত।

এই স্খলন থেকে রক্ষার দায়িত্ব যেমন রাষ্ট্রের, নষ্ট হবার ব্যর্থতাটাও রাষ্ট্র ব্যবস্থার উপর বর্তায়। রাষ্ট্র হলো একটা মেশিন, ব্যবস্থা হলো তার সফটওয়্যার। আর সফটওয়্যার যারা বানান সেই প্রোগ্রামাররা হলেন রাষ্ট্রের চালক। তাদের তৈরি করা সফটওয়্যারে রাষ্ট্র নামক মেশিনটা চলে। যখন সমাজ ভেঙে পড়তে চায়। বিভিন্ন সেক্টরে অসঙ্গতি দেখা দেয়, তখন বুঝতে হবে সফটওয়্যারে সমস্যা হয়েছে। কিংবা সফটওয়্যার যথাযথ নয়। এমন অবস্থায় প্রথমে সফটওয়্যারের সমস্যা নিরসনে কাজ করা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। না হলে প্রোগ্রামার চেঞ্জ করতে হয়।

কোনো ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে কিনা সেটা প্রমাণ হয় বিপর্যয়ে। এই যে কোভিড-১৯ মহামারী এটা একটা ভয়াবহ বিপর্যয়, ডিজাস্টার। এই ডিজাস্টার পাড়ি দিতে গিয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে অসঙ্গতিগুলো। অর্থাৎ সফটওয়্যার তথা ব্যবস্থাটা ঠিক মতো কাজ করছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অস্বীকার করারও জো নেই। করলেও তা গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না। সুতরাং পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়াটাই জরুরি। না হলে, একটা সফটওয়্যারের ত্রুটির কারণে পুরো সিস্টেমটাই ক্র্যাশ করতে পারে।

অসঙ্গতির কথা বলতে গিয়ে মনে হলো, গণমাধ্যমে প্রথমে দেখলাম ঈদের আগে-পরে মিলিয়ে নয় দিন গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। ভাবলাম, যাক এবার অন্তত গত ঈদের মতন মচ্ছব লাগবে না। কিন্তু দিন ফুরোনোর আগেই শুনি, গণ নয়, পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকবে। প্রথমে মনে হলো উল্টো বুঝলাম নাকি! কারণ মহামারী ঠেকাতে গণপরিবহন বন্ধ করাটা একটা স্বীকৃত পন্থা। দেশের অর্থনীতি সচলের ক্ষেত্রে সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখাটাও স্বীকৃত পন্থা। যুদ্ধের সময়ও সাপ্লাই চেইন বন্ধ হয় না। পণ্য পরিবহনও বন্ধ হবার কথা নয়। বিপরীতে ঈদকে সামনে রেখে যখন পণ্য পরিবহন জরুরি, তখনি ‘উল্টো বুঝলি রে রাম’ অবস্থা।

বিষয়টি আসলেই গোলমেলে। যেমন গোলমেলে, না পড়ে ফাইল সই করার ব্যাপারটি। রাষ্ট্র যদি আমলাতন্ত্র দিয়ে চলতো তবে রাজনীতির প্রয়োজন হতো না। মানুষ গণতন্ত্রের চিন্তা না করে আমলাতন্ত্রেই আস্থা রাখতো। তা সম্ভব নয় বলেই জনগণের চিন্তার ধারা বুঝে দেশ চালানোর প্রয়োজনে সৃষ্টি হয়েছিলো রাজনীতির। আজকে পর্যন্ত সে ধারাকেই কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্য আবশ্যকীয় মনে করা হয়। এর বিরুদ্ধে এখন অবধি শক্ত দ্বিমতও গড়ে উঠেনি। সুতরাং না পড়ে স্বাক্ষর হলো সেই আবশ্যকীয় ধারার বিপরীতগামিতা।

আমার দেখা একজন মন্ত্রীর কথা বলি। সচিব জরুরি একটা নোট লিখে মন্ত্রীর বাসায় এসেছেন। নোটটা দেখেই মন্ত্রী খেপে গেলেন। বললেন, ‘এটা আপনার লেখার কথা না আমার?’ সচিব বললেন, ‘স্যার আপনার।’ – ‘তাহলে আপনি লিখলেন কেনো, আর ইংরেজিটাও তো ঠিক করে লিখতে শেখেননি।’ সচিব যখন কাঁচুমাচু চেহারায় নতমুখে দাঁড়িয়ে, আমি তখন মন্ত্রীর কথাগুলো শুনছিলাম, আর শ্রদ্ধায় গেঁথে নিচ্ছিলাম মগজে। একেই বলে মন্ত্রী, নীতিনির্ধারক, প্রোগ্রামার। এমনটাই হওয়া উচিত। এমন হলে সিস্টেম করাপ্ট বা ক্র্যাশ করার সম্ভাবনা থাকে না। কম্পিউটার উল্টাপাল্টা করলে আমরা বুঝি, অপারেটিং সিস্টেম করাপ্ট হয়েছে। তেমনি সিদ্ধান্তহীনতা প্রতিষ্ঠানের করাপ্ট হবার লক্ষণ। আর তাতে যদি ক্র্যাশ করে যায়, তবে অপারেটিং সিস্টেম নতুন করে ইনস্টল করা ছাড়া উপায় থাকে না। সুতরাং ক্র্যাশ করার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ।

প্রথমে শুরু করেছিলাম খুলনা মেডিক্যাল কলেজের করোনা পরীক্ষার ভূয়া সনদের ব্যাপারে। শেষে ঠেকলাম কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেমে। বুঝতে পারছি বয়স হচ্ছে। বেশি কথা বলা স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে মাঝে-মধ্যে বেশি কথা না বলে উপায়ও থাকে না। কেন থাকে না বলি। কাউকে যখন ‘রুলস অব বিজনেস’ এর কথা বললে চোখ কপালে উঠান। বলেন, ‘এর মধ্যে বিজনেস পাইলেন কই’, এমন কথা। তখন বেশি কথা না বলে বা ভয়েজ রেইজ না করে সত্যিই উপায় থাকে না।

উপায়ের কথা তুলতেই স্কুলের এক স্যারের কথা মনে হয়ে গেলো। তিনি বলতেন, ‘প্রথমে কথায় বুঝাবি। না বুঝলে পিঠ হাতায়ে বুঝাবি। তাও না বুঝলে মাথা হাতায়ে বুঝাবি। তারপরেও না হইলে কান টাইনা বুঝাবি। তাও না হইলে পিঠ ভাইঙ্গা বুঝাবি।’ নিজে শিক্ষক হতে পারিনি ঠিকই, স্যারের কথাগুলো ভুলিনি। তাই মাঝে-মধ্যে পিঠ না ভাঙতে না পারলেও অন্তত ভয়েজটা রেইজড হয়। ওই যে, রফিক আজাদ যেমন লিখেছিলেন, ‘নির্বিবেক মধ্যবিত্ত পাঠকের পরম্পরাময়/মাংসল পাছায় খুব কষে লাথি-মারা সম্ভব হয় না বলে/লাথির বিকল্পে লেখা, বারবার, মুদ্রিত পৃষ্ঠার/মাধ্যমে পাঠাই।’ রফিক আজাদের মতন অতটা বলার সাহস নেই, তবে তাকে স্মরণ করেই লিখি বা বলি আর কী।

পুনশ্চ: বলবেন তো আবার, সিস্টেমের গলদ রেখে কেনো মধ্যবিত্তদের নিয়ে পড়লাম। আমারো কি উচ্চবিত্ত মানে বিত্ত-প্রতিপত্তির প্রতি ভীতি বা লোভ আছে কিনা। নেই। সোজা জবাব। আর মধ্যবিত্তদের নিয়ে পড়েছি এ কারণে যে, অতীতে যত পরিবর্তনই দেখা গেছে তা এসেছে মধ্যবিত্তদের হাত ঘুরেই। আমাদের মধ্যবিত্তরা ক্রমেই নির্বিবেক হয়ে উঠার কারণে দীর্ঘদিন কোথাও কোনো পরির্তন নেই। মধ্যবিত্তরা ক্রমাগত উচ্চবিত্ত হবার রেসে ঘোড়া সাজায় বাজির মাঠ ছাড়া সব জায়গার গতি স্তব্ধ হয়ে গেছে। সে জন্যে মধ্যবিত্তদের জাগানোর জন্যও কখনো-সখনো লেখা লাথির বিকল্প হয়ে উঠে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

বাংলা/এসএ/

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0855 seconds.