• ২১ জুলাই ২০২০ ১৯:৪৬:২১
  • ২১ জুলাই ২০২০ ১৯:৪৬:২১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

আমাদের বাঁশ বিদ্যা, অবিশ্বাস এবং নিউইয়র্ক টাইমস

কাকন রেজা। ফাইল ছবি


কাকন রেজা:


অবিশ্বাস। শব্দটা এখন সব জায়গাতেই। মৃত্যুটাও এখন অবিশ্বাসের ব্যাপার। কোভিডের মৃত্যুর সরকারি সংখ্যা কতজন মেনে নেয় তা হিসাব করে দেখুন তো। আর কোভিড টেস্টের বিষয়টি কতটা অবিশ্বাসের জায়গায় দাঁড়িয়েছে তা কি বলার অপেক্ষা রাখে! বিশ্ব মিডিয়াতে আমাদের বাটপারি’র খবর দেখলেই টের পাওয়া যায়। নিউইয়র্কস টাইমস লিখলো, করোনো পরীক্ষার ভুয়া সার্টিফিকেট বাংলাদেশে বড় ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলা যায়, এই বিষয়ে আমরা পাথ ফাইন্ডার। সারা বিশ্বে নিজের পশ্চাতদেশে বাঁশ দেয়ার এত বড় উদাহরণ সম্ভবত আর নেই। বিশেষ করে এই মহামারীকালীন সময়ে।

বাঁশ প্রসঙ্গে বলি। বাঁশ আমাদের বরাবরই পছন্দের। দেখুন, বিভিন্ন সময় গণমাধ্যম খবরের মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছে অমুক নির্মাণকাজে রডের বদলে বাঁশ দেয়া হয়েছে। বিল্ডিংয়ে বাঁশ, সেতুতে বাঁশ, রাস্তায় বাঁশ, নিজেদের ‘ইয়ে’তে বাঁশ, আমাদের বাঁশ প্রেম বলে শেষ করা যাবে না। সুতরাং ভুয়া করোনা সার্টিফিকেটের নামে বাঁশ দেয়া সেই প্রেমেরই ধারাবাহিকতা। বাঁশের বাঁশিকে হয়তো সেজন্যেই সর্বনাশী বলে। যার সুরে অনেকেই অভিযুক্ত সাবরিনার মতন ‘কলঙ্কিনী’ হয়ে উঠেন।

নিউইয়র্ক টাইমস তো আর জানে না, আমরা সব সময় উদ্যোক্তা খুঁজি। এই যে ভুয়া সার্টিফিকেটের জমজমাট ব্যবসা এটাও এক ধরণের উদ্যোগ বলতে পারেন। আর সাহেদ-সাবরিনা’রা তার উদ্যোক্তা। আর সাহেদ-সাবরিনা তৈরির উদ্যোক্তারা থাকেন অদৃশ্যে। তারা রীতিমত অলখ নিরঞ্জন হয়ে বসে আছেন। তাদের ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না। এমন কী তাদের কথা বলাও যাবে না! বলতে গেলেই সেই বাঁশের কলে পড়বেন। আর সেই কল ঠেলে নিয়ে যাবে আপনাকে অন্তরীণে। না হয় জীবন অতিষ্ঠ করে তুলবে।

এবারের ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ফ্রিডম অ্যাওয়ার্ড পাওয়া ড. শহিদুল আলমের কথাই ধরুন। বিশ্বখ্যাত ফটো সাংবাদিক, তার কী হলো। পুরা জীবন অতিষ্ঠ। শুধু জেলে নয়, তার চৌদ্দ-গোষ্ঠীর পোস্টমর্টেম করা হলো। এক রকম পালিয়ে বাঁচলেন তিনি। অথচ তাকেই দেয়া হলো সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সম্মানজনক এই পুরস্কার। আমাদের সাথে বাইরের ‍পৃথিবীর পার্থক্যটা এখানেই।

অবিশ্বাস কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে বলি। করোনা আক্রান্ত একজনের কয়েকদিন নরক যন্ত্রণা ভোগার পর শেষমেশ রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। এ কথা তিনি তার প্রিয়জনকে ফোনে জানালেন। সেই প্রিয়জনের প্রতিক্রিয়া ছিলো, ‘তুমি কি রিপোর্ট বিশ্বাস করো? এই যে নেতিবাচকতা, এর জন্যে কি সেই রোগী বা তার প্রিয়জন কিংবা সাধারণ মানুষ দায়ী, না দায়ী সিস্টেম? অবশ্য উল্টো প্রশ্ন করতে পারেন, এই সিস্টেম তো আপনাদেরই গড়া। একেবারে মিথ্যা নয়, গড়া না হলেও মেনে নেয়া। মেনে নেয়া সিস্টেমের বিচ্যুতি নিয়ে কথা বলাও হয়তো অনুচিত। জেনে শুনে বিষ পান করলে তো আর বিষকে দোষ দেয়া যায় না। রফিক আজাদ সেজন্যেই আমাদের নির্বিবেক মধ্যবিত্ত বলেছিলেন।

অবিশ্বাসের প্রশ্নে অবস্থা এখন সেই রাখাল বালকের মতো। বাঘ এলেও আমাদের কথা কেউ বিশ্বাস করে না। আমরা যাই বলি সবাই অবিশ্বাসের চোখে দেখে, অবিশ্বাসের কানে শোনে। আমরা যতই বলি না কেনো, সারাবিশ্বে আমাদের পরিচিতি দুর্যোগ-দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনার একটি দেশ হিসাবে। করোনা ভাইরাসের ভুয়া রিপোর্টের ঘটনাটি আমাদের প্রতি বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার কিছুটা খোলাসা করেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের দুটো লাইন সরাসরি তুলে দিই। তারা বলছে, ‘Bangladesh is one of the poorest countries in Asia. Millions of Bangladeshis work overseas, sending billions of dollars back home, keeping the economy afloat.’ উদ্ধৃত প্রথম লাইনেই আমাদের বাগাড়ম্বরের মুখে কালি দিয়ে দেয়া হয়েছে। আমাদের জিডিপি’র হিসাব, আয়ের পরিসংখ্যান সব এক লাইনেই ধুয়ে-মুছে একাকার হয়ে গেছে। আর বাগাড়ম্বেরর অর্থনীতির চালিকা শক্তি অনেকটাই যে জোগান দেয় প্রবাসীরা তাও কিন্তু স্পষ্ট করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। সুতরাং অর্থনীতির উত্থান বিষয়ক গল্প সম্পর্কে অবিশ্বাস থাকাটাও স্বাভাবিক।

সব অবিশ্বাসের উৎস অহেতুক বাগাড়ম্বর। একেবারে চোখের সামনে রয়েছে সে উদাহরণ। মার্চে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানালেন, সব প্রস্তুতি রয়েছে তাদের। কিন্তু দেখা গেলো উল্টোটা। প্রস্তুতি তো নেই-ই, সাথে প্রস্তুতি নেয়ার জন্য প্রয়োজন যে সমন্বয়, তাও নেই। উল্টো নিজেই শোকজ খেয়ে বসে আছেন। চারিদিকে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। গণমাধ্যমে উঠে এসেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে টানাপোড়েনের কথা। দেখুন, প্রথমে বলা হলো করোনা বাংলাদেশে আসবে না। তারপর, আসলেও খুব ভয়ের কারণ নেই। যারা বললেন তারাই এখন রিভার্স পজিশনে। এই যে কথার দ্বৈত চরিত্র, তা মূলত চরিত্রহীনতারই নামান্তর। আর চরিত্রহীনতা’র বিপরীতে হলো অবিশ্বাস। সেই অবিশ্বাসেরই শিকার আমাদের গোটা সিস্টেম। যে কারণে অনেক ভালো কাজও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে।

বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে আমাদের গণমাধ্যমও। অতিরিক্ত অনুরক্তি আর আনুগত্য গণমাধ্যমের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। এখন গণমাধ্যমের নাম শুনলেই মানুষ বলে দেয়, খবর কী ধরণের হবে। শুধু শিরোনাম দেখেই হেড থেকে টেইল পর্যন্ত খবরের নিখুঁত বর্ণনা দিয়ে দেন অনেক পাঠক। গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর ফলে ক্ষতি হয়েছে সামগ্রিক সিস্টেমের। মানুষের কাছে গণমাধ্যমের কাজ বাহক হিসাবে তথ্য পৌঁছে দেয়া। কখনো বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা যারা করেন তাদের মতামত। আর সেই বাহকের কাজটি হবে একেবারে নিরাসক্ত। সে  জায়গায় মারাত্মক ব্যর্থ হয়েছে আমাদের গণমাধ্যম। গণমাধ্যমের সাথে জড়িতরা সরাসরিই ব্যক্ত করেছেন অনুরক্তি আর আনুগত্যের কথা, সেটাই ব্যর্থতার মূল কারণ। এই ব্যর্থতার ফলে অনেক ভালো কাজের খবরও মানুষের কাছে মিথ্যা মনে হয়েছে। কিংবা সেই কাজের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এই ব্যর্থতায় রাষ্ট্রের সাথে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গণমাধ্যম নিজেও। দেখুন, গণমাধ্যমকে এখন খবরের জন্য সামাজিকমাধ্যমের পেছনে ছুটতে হয়। অথচ উল্টোটা হওয়ার কথা ছিলো। আজকে আমরা নিউইয়র্ক টাইমসের খবর পড়ে বা দেখে সামাজিকমাধ্যমে আলোচনা করছি। মূলত তাই হওয়া উচিত। সামাজিকমাধ্যম হলো মানুষের মত প্রকাশের জায়গা। খবর বিশ্লেষণের ভালো প্লাটফরম। বিপরীতে খবর প্রকাশের জন্য খারাপ প্লাটফরম। কারণ এখানে খবর সম্পাদনার কেউ থাকে না। সিটিজেন জার্নালিজম বা নাগরিক সাংবাদিকতার দোষটাই এখানে। কিছু খবর রয়েছে যা প্রকাশে ভালোর চেয়ে খারাপ বেশি হয়। গণমাধ্যম সেটা জানে বলেই তা সম্পাদনায় বাদ পড়ে যায়। নাগরিক সাংবাদিকতায় সেই বালাই নেই। অথচ সেই সিটিজেন জার্নালিজমের উপরই নির্ভর করতে হচ্ছে এখন মানুষকে। মেইনস্ট্রিম জার্নালিজম বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে অবস্থা এমনটাই হয়। মানুষ খবর আর গুজবের পার্থক্য ‍গুলিয়ে ফেলে। খবরের মাধ্যমই যখন বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, তখন সেখানে প্রকাশিত খবরের কী অবস্থা সেটা অনুমান করা খুব কঠিন নয়।

মূল কথা হলো আমাদের নিজ সৃষ্ট অবিশ্বাস ‘বাঁশ বিদ্যা’কে রীতিমত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। আমরা আমাদের নিজেদের ‘ইয়ে’তে ক্রমাগত বাঁশ দিয়ে চলেছি। সাথে মনে মনে বলে চলেছি, ‘জয়তু বাঁশ বিদ্যা’।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1270 seconds.