• ২৩ জুলাই ২০২০ ১৬:২৫:৩৩
  • ২৩ জুলাই ২০২০ ১৬:২৫:৩৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘তেলজাতীয় ফসলের চাষ’ এবং হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

ফাইল ছবি


কাকন রেজা:


কয়েকটি গণমাধ্যমের খবরে দেখলাম চাষবাস শিখতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের চল্লিশ কর্মকর্তা বিদেশ যাবেন। ‘চল্লিশ’ সংখ্যাটাকে আবার ‘আলিবাবা’র গল্পের সাথে মিলিয়ে ফেলবেন না। এটা চল্লিশ স্যাঙ্গাতের কাহিনি নয়, একটি শিক্ষা প্রকল্প। যার খরচ সর্বসাকুল্যে দুই কোটি টাকা। এমন বেশি কিছু নয়। তবুও ‘নাই কাজ তো খই ভাজ’ গণমাধ্যমগুলো খবর করে দিলো। বলুন তো দেখি, কেমন লাগে।

এখন কী শিখতে যাবেন সেটা শুনুন। তার আগে বলে নিই, যা শিখতে যাচ্ছেন তার প্রয়োজন এই যুগে সবচেয়ে বেশি। আর তা অনেক আগেই হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নামে একজন গুণীজন জানিয়ে গিয়েছিলেন। হ্যাঁ, ওনারা ‘তেলজাতীয় ফসলে’র চাষ শিখতে বিদেশ যাবেন। তবে তেল মানে স্নেহ জাতীয় বিষয়ের সাথে মধুর যোগ হলে তো যাকে বলে মহামিলন। সেই চিন্তা করেই ছত্রিশ জনকে তেলবিদ্যা মানে তেলচাষ এবং চার জনকে মধুচাষ এই ভাবেই ভাগ করা হয়েছে। চার জন যাবেন মধুচাষ শিখতে। বাকিরা ‘তেলজাতীয়’ চাষ শিখতে।

আগে তেল অর্থাৎ স্নেহের গুণ বর্ণনা করি। এ ব্যাপারে নিজে ‍উচ্চিংড়েগিরি না করে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় থেকে সরাসরি তুলে দিই। উনি বলেছেন, ‘তৈলের মহিমা অতি অপরূপ। তৈল নহিলে জগতের কোন কাজ সিদ্ধ হয় না। তৈল নহিলে কল চলে না, প্রদীপ জ্বলে না, ব্যঞ্জন সুস্বাদু হয় না, চেহেরা খোলে না, হাজার গুণ থাকুক তাহার পরিচয় পাওয়া যায় না, তৈল থাকিলে তাহার কিছুরই অভাব থাকে না।’ বুঝলেন তো কেন ‘তৈলজাতীয় ফসলে’র চাষ শেখা এতো জরুরি। আর বর্তমান সময়ে এর কোনো বিকল্পও নাই। বিশেষ করে তৈল বিষয়ে রীতিমত যখন প্রতিযোগিতা চলছে।

এ ব্যাপারেও শাস্ত্রী মহাশয় বয়ান করেছেন, ‘যে সর্বশক্তিময় তৈল ব্যবহার করিতে জানে, সে সর্বশক্তিমান। তাহার কাছে জগতের সকল কাজই সোজা। তাহার চাকরির জন্য ভাবিতে হয় না — উকিলিতে প্রসার করিবার জন্য সময় নষ্ট করিতে হয় না , বিনা কাজে বসিয়া থাকিতে হয় না, কোনো কাজেই শিক্ষানবিশ থাকিতে হয় না। যে তৈল দিতে পারিবে, তাহার বিদ্যা না থাকিলেও সে প্রফেসার হইতে পারে। আহাম্মুক হইলেও ম্যাজিষ্ট্রেট হইতে পারে, সাহস না থাকিলেও সেনাপতি হইতে পারে এবং দুর্লভরাম হইয়াও উড়িষ্যার গভর্ণর হইতে পারে।’ কথা কিন্তু মিথ্যা নয়। ‘বাটপার’ সাহেদকে দেখুন না। কিছু না হয়েও সে অনেক কিছু। এমন কী খবরের কাগজের সম্পাদক পর্যন্ত। আর ‘টকশো’তে রীতিমতো ‘স্টার টকার’। সাহেদের কারণে আজকে ‘টকশো’গুলো ‘ঠকশো’র পরিচিতি পাচ্ছে। কেন নুরুল কবিরেরা ‘টকশো’তে ডাক পান না, তা বুঝতে অবশ্যই হরপ্রসাদ শাস্ত্রী অধ্যায়ন করা উচিত।

তবে মুশকিল হলো, তেল বিষয়ে সবাই সমান অভিজ্ঞ নন। তাই তেল বিষয়ে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা শাস্ত্রী মহাশয় গুরুত্বের সাথে জানান দিয়েছেন এই বলে যে, ‘আজকাল বিজ্ঞান, শিল্প প্রভৃতি শিখাইবার জন্য নানাবিধ চেষ্টা চলিতেছে। যাহাতে বঙ্গের লোক প্রাকটিক্যাল অর্থাৎ কাজের লোকের হইতে পারে, তজ্জন্য সকলেই সচেষ্ট, কিন্তু কাজের লোক হইতে হইলে তৈলদান সকলের আগে দরকার। অতএব তৈলদানের একটি স্কুলের নিতান্ত প্রয়োজন।’ চিন্তা করুন কী জিনিয়াস! উনিশ শতকে জন্ম নেয়া একজন মানুষ বিষয়টি এতো ভালো ভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, আর আমাদের এই একবিংশ শতকেও বসে খাবি খেতে হচ্ছে। তাই তেলবিদ্যা বিষয়ে যে কোনো কাজের ক্ষেত্রেই উৎসাহ জোগানো আবশ্যক।

‘তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি’ বিষয়ক প্রকল্প নিয়ে এমন খবর অবশ্যই আকাঙ্ক্ষিত ছিলো না। আমাদের গণমাধ্যমগুলো কেন যে তেলচাষ বা তেলজাতীয় ফসলের চাষ নিয়ে এত হৈচৈ বাঁধালো তা বোঝা মুশকিল। তাদেরও কেউ কেউ তো এই চাষের গুরুত্ব বোঝেন। বুঝদার তাদের মধ্যেও আছেন যার প্রমাণ মাঝেমধ্যেই পাওয়া যায়। সেই তাদেরও কি খবরটি চোখে পড়েনি!

যাক গে, গুরুত্ব না বুঝলে আর কী করার। অবশ্য অনেকে বুঝেও স্বীকার করেন না। সে কথাটিও মহামহিম শাস্ত্রী মহাশয় তার তৈল বিষয়ক প্রবন্ধে উদ্ধৃত করেছেন। ‘তৈল সবাই দিয়া থাকেন— কিন্তু কেহই স্বীকার করেন না যে, আমি দেই। সুতরাং এ বিদ্যার অধ্যাপক জোটা ভার। এ বিদ্যা শিখিতে হইলে দেখিয়া শুনিয়া শিখিতে হয়। রীতিমত লেকচার পাওয়া যায় না।’- এ কথাটুকু তিনি এমনি এমনি লিখেন নাই। দূরদর্শী মানুষ, দূরটা দেখতে পেয়েছিলেন। এ জিনিস শেখাবার লোক দেশে থাকলেও কেউ কাউকে শেখাবেন না তা শাস্ত্রী মহাশয় অত আগে থেকেই অবগত ছিলেন। তাই বলি, যেহেতু দেশে উপায়ন্তর নাই সুতরাং শেখার জন্য বিদেশ যেতে দোষের কি! আমাদের একটা গান রয়েছে না, ‘তেল গেলে ফুরাইয়া বাত্তি যায় নিভিয়া’। মরমী এই গানের মর্ম বুঝতে হবে। বাত্তি নিভিবার আগেই তেল বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট ।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.7364 seconds.