• ২৭ জুলাই ২০২০ ২০:৫৩:০৩
  • ২৭ জুলাই ২০২০ ২০:৫৩:০৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

গণমাধ্যম ও ব্যক্তি স্বাধীনতার পার্থক্য, প্রায়োগিকতা এবং বোঝার ভুল

ছবি : প্রতিকী

কাকন রেজা :

রিপোটার্স উইদাউট বর্ডারের প্রেস ফ্রিডম সূচকে আমাদের অবস্থান ভালো নয়। ২০২০ সালে আমাদের অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫১তে। গত বছর ছিলো ১৫০। ক্রমাবনতি আমাদের আমাদের ভাগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে অনেকের। অনেক বিদগ্ধজনও বাক আর গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে গুলিয়ে ফেলেন। ব্যক্তির বাক স্বাধীনতা আর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যে আলাদা বিষয় তা অনেকেরই বোধে আসে না। বলার স্বাধীনতা আর প্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে বিস্তর ফারাক।

এটা বলতে গেলে হালের সিটিজেন জার্নালিজমের কথা বলতে হয়। সিটিজেন জার্নালিজম বা নাগরিক সাংবাদিকতা হলো ‘আনফিনিশড প্রডাক্ট’। করোনাকালের ভ্যাকসিনের যে ট্রায়াল হচ্ছে সেটা ধরে নিয়ে বলতে পারেন, তখনি ভ্যাকসিনটি অনুমোদন পাবে যখন তা রোগ সারাবে এবং পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াহীন হবে। মেইনস্ট্রিম জার্নালিজম বা মূলধারার গণমাধ্যমের কাজও তাই। ‘ফিনিশড প্রডাক্ট’ বাজারজাত করা। আর সিটিজেন জার্নালিজম যেটা করে তা হলো ‘আনফিনিশড প্রডাক্ট’, পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াসহ।

ধরুন কারো বেডরুমে গোপন ক্যামেরা বসিয়ে তাদের ব্যক্তিগত দৃশ্যচিত্র রেকর্ড করা হলো। প্রশ্ন দাঁড়ায়, এটা খবর কিনা। কোনটা খবর আর খবর নয়, তা বোঝার বোধ অতিরিক্ত উত্তেজনায় অনেকেই হারিয়ে ফেলেন। কেউ হয়তো এটাকেই খবর বানিয়ে ছেড়ে দেন। সম্প্রতি করোনার নকল সনদপত্রের খবরের ক্ষেত্রে জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনার শরীর ও পোশাক নিয়ে যা হলো, তেমন আর কী। সাবরিনার দুর্নীতিটা খবর, তার শরীর নয়। দুর্নীতির বিষয়টা মানুষকে সচেতন করে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত গঠনে কাজ করে। উল্টো দিকে সাবরিনার শরীর নিয়ে কথা বা প্রদর্শন নারীদের অবমাননা করে, তাদের স্বাধীনতায় বাদ সাধে। এই বিষয়টা অনাহুত উত্তেজনায় অনেকেই ভুলে যান। শুধু আমাদের দেশে নয়, উন্নত দেশগুলিতেও এমন গণমাধ্যম রয়েছে। যারা খবরের বোদ্ধা এবং চিন্তায় ঋদ্ধ তারা যদি বেডরুমের ক্যামেরা বসানো মার্কা মাধ্যমকে গণমাধ্যম হিসাবে স্বীকৃতি দেন তাহলে মুশকিল। তার উপর যদি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সাথে কথিত গণমাধ্যমের ‘পিপিংটম’ কার্যকলাপের তুলনা জুড়ে দেয়া হয়, তাহলে বিষয়টি আরো বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠে। মুশকিলের হয়ে দাঁড়ায়। যে মুশকিলের কোনো আছান নেই।

ব্যক্তি ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পার্থক্যটা এক্ষেত্রে বোঝা জরুরি। না কোনো বিখ্যাতজনকে উদ্ধৃত করে নয়, নিজস্ব বোধের ব্যপ্তিতে এই জরুরিটা বুঝতে হবে। বুঝতে হবে বাস্তবতা থেকে। পুরান ঢাকার মানুষ ‘হালার পো’ বলে গালি দেয়। এটা তাদের ব্যবহৃত ভাষার অংশ। তাই এটা বলা তার বা তাদের স্বাধীনতা। এই বলাটা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে না। সাবরিনার করোনা সনদের জোচ্চুরি বলা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। তার শারীরিক বিষয় গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে না। কারো বেডরুমে রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কিছু না হলে সেখানে ব্যক্তিগত বিষয় ধারণ গণমাধ্যমের কাজ নয়। সুতরাং এর সাথে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার তুলনা করা যেমন বোকামি, তেমনি বিষয়টির সাথে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার আলাপ জুড়ে দেয়াটাও অসঙ্গত। এমন অসঙ্গত কর্ম অনেক ঋদ্ধ জনেরাও সময়ে করে বসেন।

এটা সত্যি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলে তাকে কেউ রাজনীতি বা সরকার বিরোধীতার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারেন। করুন, অসুবিধা কী! সে জন্যে সম্পাদকীয় পাতা রয়েছেই। রয়েছে কলাম লেখার জায়গা। সেখানে সব মতের কথাই উঠে আসতে পারে। উঠে আসতে পারে পক্ষ-বিপক্ষের চিন্তা-দর্শন। কেউ সরকারের বিপক্ষে বললে অন্যজন সরকারের পক্ষে বলুন। কেউ সরকারের পক্ষে বললে, আপনি বিরোধ করুন, বিরোধীপক্ষের কথা লিখুন। এই দ্বন্দ্ব কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রক্রিয়া, রাষ্ট্রকে মানুষের জন্য গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। এই দ্বন্দ্ব মানুষকে সঠিক ও জরুরি বিষয়টা বুঝতে এবং বেছে নিতে সহায়তা করবে।

কোনো গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় নীতিও হতে পারে কোনো একটা মতাদর্শের পক্ষে, তাতে দোষের কিছু নেই। বিশ্বের অনেক গণমাধ্যমই ঘোষণা দিয়ে তাদের সম্পাদকীয় নীতির জানান দেন, তাদের মতাদর্শের কথা বলেন। দোষটা তখনই যখন খবরের ক্ষেত্রে কোন বিষয়কে ব্ল্যাক-আউট করা হয়। টুইস্ট করা হয়। কোন গণমাধ্যম যদি নিজেও এটা করে তাও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সাথে সাংঘর্ষিক হয়, বিপক্ষে যায়। আর যদি চাপের মুখে করা হয়, তবে সেটা তো আরো বেশি সাংঘর্ষিক হয়ে উঠে।  

কলামের ক্ষেত্রেও বলা যায়, মতাদর্শ প্রচারের সাথে অন্যায়কে সমর্থনের পার্থক্য রয়েছে। যেমন রয়েছে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। মতাদর্শ বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক। মতাদর্শ দুর্নীতি বা অন্যায় করে না। করে ব্যক্তি। সুতরাং মতাদর্শের অজুহাতে ব্যক্তির সাফাই গাওয়ার বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক নয়। এই কাজটা যারা করেন, তাদের এমন কাজটাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সাথে সাংঘর্ষিক। অনেকেই ব্যক্তি, গণমাধ্যম, মতাদর্শ বিষয়সমূহকে গুলিয়ে ফেলেন। এই গুলিয়ে ফেলাটাই বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। মানুষের কাছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

সাংবাদিকতার কিছু ইথিকস রয়েছে। যেটা মেনেই সাংবাদিকতা করতে হয়। খবর আর গসিপের মধ্যে পার্থক্যটা সেই ইথিকসেরই অংশ। বেডরুম ভিত্তিক সাংবাদিকতা হলো ‘গসিপ সাংবাদিকতা’। মূলত বিনোদন মাধ্যমে এগুলো চলে আসছে। কোন নায়িকার সাথে কোন নায়কের গোপন অভিসার, এটা বিনোদন সাংবাদিকতার বিষয়। অথচ, বিনোদন সাংবাদিকতা প্রথমে মূল সাংবাদিকতার অংশ ছিলো না, পরে যুক্ত হয়েছে। এটা অবশ্য অনেকেরই জানা নেই। এখনো এই সাংবাদিকতার ‘গসিপ’ অংশটি সাংবাদিকতার ধারণার সাথে যায় না। অনেকে বলতে পারেন, তাহলে গণমাধ্যম এগুলো প্রকাশ করে কেনো। তাদের বলি, ইয়েলো জার্নালিজমও সাংবাদিকতা শিক্ষার অংশ। অসুর যেমন দুর্গার কাঠামোতে থাকে, তেমনি জার্নালিজমের সাথে ইয়েলো জার্নালিজমও থাকে। থাকে এ কারণেই যে, ভুল কোনটা না জানলে শুদ্ধ হবার উপায় নেই। তবে কেউ যদি জার্নালিজমের ‘ইয়েলো’টাকেই ভুলের জায়গায় মূল ভেবে বসেন, তার জন্য দুঃখ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। এসবের সাথে কেউ যদি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মিলিয়ে ফেলেন তবে তার জন্যেও বরাদ্দ থাকে দুঃখ।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হলো একটা বিষয় তুলে ধরার স্বাধীনতা। সেটা খবরেই হোক কলামেই হোক। আর বাক স্বাধীনতা হলো মেঠো বক্তৃতার স্বাধীনতা। ‘হালার পো’ বলে গালি দেয়ার স্বাধীনতা। বিষয়ের সাথে স্বাভাবিক চর্চার ক্ষোভ প্রকাশের স্বাধীনতা। বিপরীতে এই বকাবাজিগুলো ফিল্টার করে মূল বিষয়টাকে সঠিক ভাবে পরিবেশন করাই হলো গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। এর মধ্যে অন্য আর কিছু নেই, কোনো কিন্তু নেই।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতাটাকে অন্য কিছুর সাথে গুলিয়ে ফেলার সুযোগ নেই, থাকা উচিত নয়। গণমাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা হলো উভয়পক্ষের জন্যই। নিউজ বাদে ভিউজে সবাই তাদের নিজস্ব মত প্র্রকাশ করতে পারেন, মতাদর্শ নিয়ে আলাপ করতে পারেন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে কাউকে অগ্রাধিকার দেয়া নয়, সবাইকে অধিকার দেয়া। এটা বুঝতে হবে। মূলত গণমাধ্যমের সৃষ্টির কারণ এবং প্রায়োগিকতা এর মধ্যেই নিহিত।

পুনশ্চ: আমি বরাবরই খুব সহজ ভাবে বিষয়গুলি উপস্থাপনের চেষ্টা করি। ভারী কোনো কথা বা ‍উদ্ধৃতির ব্যবহার এড়িয়ে যাই। আমি বিশ্বাস করি সহজ কথা বুঝতে যারা অপারগ, রাশভারী কোন তত্ত্ব বোঝা তাদের জন্য আরো দুষ্কর। তাই এ লেখায় শুধু সহজ যুক্তি ব্যবহার হয়েছে।

তবুও শেষে অনেকের জানা একটা উদ্ধৃতি বিষয়ে বলতে চাই। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট বলেছিলেন, ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা যদি কার্যত খর্ব করা হয় তবে গণতান্ত্রিক অধিকার সমূহ অর্থহীন হয়ে পড়বে।’ এসব অধিকারের মধ্যে তিনি মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বক্তব্য রাখার স্বাধীনতা এবং জনসমাবেশের অধিকার বিষয়গুলিকে অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন। এসব মূলত রাজনৈতিক অধিকার। এ অধিকারগুলো না থাকলে মানুষ সঙ্গতই নাগরিক থাকে না, দাস পড়ে। আর রাষ্ট্রটি কল্যাণ রাষ্ট্র না হয়ে নিপীড়ক রাষ্ট্র হয়ে উঠে।

বলতে পারেন জানা বিষয়টি পুনর্বার উল্লেখের প্রয়োজন কি ছিলো। প্রয়োজনের মধ্যে অনেকের জানা ও বোঝার ভেতরকার পার্থক্য এবং তা নিয়ে সংশয় ছিলো বলেই উল্লেখ করা, দেয়া।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.7141 seconds.