• ৩০ জুলাই ২০২০ ২১:১২:০৯
  • ৩০ জুলাই ২০২০ ২১:১২:০৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ত্যাগ ও যোগ্যতার বয়ান, সুযোগের অভাবে চরিত্রবান

কাকন রেজা। ফাইল ছবি

কাকন রেজা:

ধরা পড়ার পরে কেউ পরিচয়ের দায়িত্ব নিতে চায় না। খালেদ, শামীম থেকে শুরু করে হালের সাহেদ-সাবরিনা-তূর্ণা পর্যন্ত কাউকেই গছে নেয়নি কেউ। গলায় ধরে যে ছবি তুলেছেন সেও জানান দিয়েছেন আমি তো ‘এমনি এমনি’ তুলেছি। ভালো করে ভেবে দেখুন কেউ-ই এসব সম্পর্কের দায়ভার নেয়নি, নেয় না। সাহস করে অন্তত এটুকুও বলে না কেউ, ‘হ্যাঁ সম্পর্ক ছিলো, তবে তাকে ভালোমানুষ ভেবেই গড়ে উঠেছিল সম্পর্কটা।’ এই স্বীকারোক্তিতে দোষের কিছু ছিলো না, থাকার কথা নয়। সবাই যে সাহেদদের সম্পর্কে সব কিছু জানবে তার যৌক্তিক কারণ নেই। তবে সম্পর্ক অস্বীকারের মাত্রা জানিয়ে দেয় ঘটনাটি অন্যখানে। ডালমে কুছ কালা হ্যায়।

আরেকপক্ষে আহাজারি রয়েছে সাহেদদের নিয়ে। আফসোসের আহাজারি। কেমন, বলি শুনুন। যোগ্য-ত্যাগী লোককে জায়গা না দিয়ে অযোগ্য-ধান্ধাবাজদের জায়গা দেয়া হয়েছে। ত্যাগী লোকের মূল্যায়ন নেই, যোগ্যদের জায়গা নেই, ইত্যাদি সব। এই আহাজারি আফসোসের জায়গা থেকে। সাহেদের মতন নেপো দই মেরে গেলো আমরা কী করলাম, এমন ভেবে আর কী। যারা আক্ষেপ করছেন তারা সাহেদের মতন জায়গা পেলে স্ব-মহিমায় উদ্ভাসিত হতেন। এমন অনেক ত্যাগী লোকের গল্পও অনেকের জানা। বলতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে।

সম্প্রতি আরেক রমণী তূর্ণা গ্রেপ্তার হলেন প্রতারণার দায়ে। নাইজেরিয়ানদের সাথে মিলে ফটকাবাজি করতেন। তার সাথেও অনেকের ছবি আছে কিন্তু দায় কেউ নেয়নি। দায় না নিলেও তার কাজে কারো কারো সায় ছিলো এটা বুঝতে ড্রোন বিজ্ঞানী হতে হয় না।

আমাদের মতন দেশগুলিতে ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি করতে গেলেও একটা চেইন মেনটেইন করতে হয়। এটা বাদ দিয়ে যদি ফুটপাতে দোকান দিয়ে সৎ দিনযাপন করতে চান, তবুও অসৎ লোকদের সাথে সখ্যতা রাখতে হয়। সোজা ভাষায় চাঁদা দিতে হয়। এই চাঁদার ভাগ কোন পর্যন্ত যায় এটা আন্দাজ করা খুব কঠিন নয়। একটা মার্কেটে দোকান নিবেন, ফ্ল্যাট কিনবেন, জমি কিনবেন, সবকিছুতেই ‘কমিশন’ কাটতে হয়। এমন কী এই কমিশন কাটা থেকে ভিক্ষুকরাও বাদ যান না। নিউ ইয়র্ক টাইমসে’র ভাষায় আমরা হলাম ‘পুওরেস্ট’ দেশগুলির একটা। আর এসব দেশের এটাই নিয়তি।

আমাদের অবস্থাটাই ভাবুন, আমাদের পকেট কত ভাবে কাটা হচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে বেশি টাকায় আমরা জ্বালানী তেল কিনি। বিদ্যুৎ-গ্যাস কিনি। রাস্তায় বেশি টোল দিই। নানা নামে, নানা উছিলায় আমাদের পকেট থেকে বৈধ সিলমোহরেই টাকা কেটে নেয়া হয়। অন্য দেশে যে গাড়ির দাম দুই লাখ সেটা আমাদের দেশে এসে হয় বিশ লাখ। এই তো আমাদের অবস্থা। তারোপর ‘খাঁড়ার ঘা’ হলো ‘কমিশন’, সোজা ভাষায় চাঁদা। বারোমাস কোনো না কোনো ‘পার্বণ’ লেগেই আছে, যাতে ‘কমিশন’ দিতে হয়। সরকারি টাকা বাকি পড়লে তো কিছুটা রেহাই আছে, সুযোগ দেয়া হয়। ‘কমিশনে’র টাকার কোনো রেহাই নেই।  

এই যে করোনাকাল চলছে এই অবস্থায় চিকিৎসা ক্ষেত্রেও ‘কমিশন’ চলছে। পরীক্ষা করাবেন, লোক ধরতে হবে, সেখানেও কমিশন। চিকিৎসক দেখাবেন, সিরিয়াল পাইয়ে দিতে কমিশন। এমন কম পর্যায়ের লেনদেন খবরের বিষয় নয়। গণমাধ্যমও কমিশনের ব্যাপারে এতটাই সহনীয় উঠেছে, খুব বড় কোনো ‘কমিশনে’র খবর না হলে কানা-মাথা নাড়ায় না। পর্দাকাণ্ড থেকে বটিকাণ্ডের মতন কোনো কাণ্ড হলে খবর হয়। এখানেও ‘কমিশনে’র চল আছে। কেউ কেউ ‘কমিশন’ পেয়ে খবরও হাওয়া করে দেন। এই যে আমপাবলিক অভিযোগ করে ঢাকা শহরে কি আগে থেকে ক্যাসিনো চলেনি, মন্ত্রণালয়গুলিতে লুটপাট হয়নি, খবর হয়নি কেনো - এমন ‘কেনো’র জবাব দেয়াটা গণমাধ্যমের জন্য ‘সো ডিফিকাল্ট’।

তাই বলি, এই যে ত্যাগ আর যোগ্যতার আলাপটা তোলা হয়, তার বেশির ভাগই না পাওয়ার আর্তনাদ। ‘সুযোগের অভাবে চরিত্রবান’ কথাটি অনর্থক চালু হয়নি। রাজনীতিতে যারা কমিউনিস্ট বলে পরিচিত, আগের জামানায় মানুষ তাদের সাধু-সন্ত ভাবতো। হাল জামানার অনেক ‘কমরেড’দের রেট অন্যদের চেয়ে ঢের বেশি। তাদের গাড়ি-বাড়ি তারই প্রমাণ দেয়। সেই ছেড়া চটি আর তাঁতে বোনা কাপড়ের দিন বাঘে খেয়েছে। সুতরাং কথায় কথায় যারা যোগ্যতা ও ত্যাগের কথা বলে নিজেদের না পাওয়ার জানান দেন, তাদের সম্পর্কেও সাবধান থাকাটা জরুরি।

যারা জানান না দিয়ে নিজের কাজ করে যান, তারাই মূলত যোগ্য এবং ত্যাগী। যোগ্য আর ত্যাগীদের খুঁজে নিতে হয়, তারা নিজে বা অন্যকে দিয়ে জানান দেয়ার চেষ্টা করেন না। বলে বেড়ান না, তাদের ত্যাগ আর যোগ্যতার করুণ কাহিনি। যারা বলে বেড়ান, তাদের সাথে সাহেদদের পার্থক্য হলো সুযোগটা না পাওয়া, সেই সুবাদে নিজেকে চরিত্রবান জাহির করা। সে অর্থে তারা সাহেদদের চেয়েও অযোগ্য। এমন সব সুযোগ না পাওয়া ত্যাগী আর সুযোগ পাওয়া ভোগীদের কর্মকাণ্ডে দেশটা ক্রমেই নরক হয়ে উঠছে। আমপাবলিক অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে। তারা ভেবে পাচ্ছে না এ দুরাবস্থার শেষ কোথায়। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামনিস্ট।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0728 seconds.