• ০১ আগস্ট ২০২০ ১২:০৬:১৬
  • ০১ আগস্ট ২০২০ ১২:০৬:১৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ভারত আর চীন, সম্পর্ক ও টানাপোড়েন, রাষ্ট্র বনাম ক্যাম্পেইনার

ছবি : প্রতীকী

ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে ইদানীং বেশ কথা হচ্ছে। কেউ কেউ রীতিমত আহাজারি করছেন ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন বিষয়ে। অথচ দুই দেশের সরকারের বক্তব্য তাদের সাথে মিলে না। সম্প্রতি বাংলাদেশের পক্ষে বলা হয়েছে ভারতের সাথে সম্পর্ক ‘রক্তের রাখি বন্ধনে’ বাঁধা। বিষয়টা গোলেমেলে নয় কি?

একটা প্রবাদ রয়েছে, ‘যার বিয়ে তার খবর নাই পাড়া পড়শির ঘুম নাই’। অবস্থা হয়েছে তাই। ভারতের সাথে সম্পর্কের প্রশ্নে রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি আগ্রহী হওয়া বিপজ্জনক। আরেক প্রবাদ ‘মার চেয়ে মাসির দরদ বেশি’র মতন। তবে এই আগ্রহ আর আলোচনার একটি বড় দিক হচ্ছে ‘মাসি’দের চেনা যাচ্ছে।

এসব আলোচনার আগে বুঝতে চেষ্টা করা প্রয়োজন এই টানাপোড়েন শব্দটি কেনো দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্ত হলো। এটা বুঝতে হলে মূলত জনগণ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের চিন্তার পার্থক্যটা বুঝতে হবে। বাংলাদেশের বিশাল অংশের জনগণ সব সময়ই ভারতবিরোধী একটা সেন্টিমেন্ট ধারণ করে। বিপরীতে রাষ্ট্রকে হতে হয় কৌশলী। ইচ্ছা থাকলেও রাষ্ট্রযন্ত্রকে জনগণের সেন্টিমেন্ট ধারণ করা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। আর জনগণের সাথে রাষ্ট্রযন্ত্রের দূরত্ব সৃষ্টি হলে তা আরো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং খুব সহজেই যারা সম্পর্কের টানাপোড়েন বিষয়টি চিন্তায় আনেন, তাদের চিন্তাটা আরো সুদূরপ্রসারী হওয়া উচিত।

এখন আসি কেনো ‘পাড়া পড়শির ঘুম নাই’ হলো সে কথায়। ‘ক্যাম্পেইন’ শব্দটার সাথে পরিচিত সবাই। একটা প্রতিষ্ঠান তাদের বা তাদের পণ্যের পরিচিতির জন্য ‘ক্যাম্পেইন’ করে থাকে এবং এর জন্য একটা গ্রুপকে হায়ার করে। সেই গ্রুপের কাছে ‘ক্যাম্পেইন’টা হলো রুজি-রোজগার। অভাবে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়। সুতরাং রুজি-রোজগারের সমস্যা হলে সেই গ্রুপটা সঙ্গতই চাইবে তাদের কাজটা টিকে থাকুক। তাই সম্পর্কের টানাপোড়েন হতে পারে এমন ধারণা সৃষ্ট দুশ্চিন্তার বাহ্যিক প্রকাশ হবেই। এই যে নানা কথা, আলাপ চলছে মুখে এবং লিখিত ফর্মে তা হলো সেই প্রকাশ। ‘ক্যাম্পেইনার’দের ভয়ের আরেকটা জায়গা হলো পাবলিক সেন্টিমেন্ট। রাষ্ট্র এবং পাবলিক দুটো বিপক্ষে গেলে তো টিকে থাকা দায়। কথাটা একটু শক্ত হলো, কিন্তু রাষ্ট্র যেখানে বলছে সমস্যা নেই। বন্ধন হলো রীতিমত ‘রক্তের রাখিতে’, তার ওপর আর কথা কেনো।

রাষ্ট্রের কতগুলো কৌশলগত দিক রয়েছে। সেই কৌশল রাষ্ট্র তার মত নির্ধারণ করে। এটাও ঠিক রাষ্ট্রযন্ত্র যারা চালান তারা যদি বেপথু হন তাহলে সেই কৌশল বুমেরাং হতে পারে। তবে সেটা বোঝার জন্যই সময়ের প্রয়োজন। অথচ কেউ কেউ সময় দিতে নারাজ। একেবারে ভূমিকাতেই উপসংহার টানতে উদগ্রীব তারা।

আচ্ছা, ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক রাখতেই হবে কেনো এবং সেটা নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে, এই প্রশ্নের জবাবটা জরুরি। ভারত বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছে, কেনো করেছে এই প্রশ্নটাও জরুরি। এটা বুঝতে অতিকায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হওয়ার দরকার নেই। সোজাভাবেই বলা যায়, আবেগের তাড়নায় রাষ্ট্র কখনো চলে না, চলে নিজ ভালোমন্দের চিন্তায়। সুতরাং ভারতের সে সমর্থনের পেছনে তাদের ভালোমন্দ চিন্তা ছিলো। আর সেই চিন্তা বিষয়ে মুখ ফুটে বলাটা বাহুল্য।

রাষ্ট্র আবেগে চলে না, আবার বলছি। চললে, মুক্তিযুদ্ধে যে যুক্তরাষ্ট্র ছিলো পাকিস্তানের পক্ষে সে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের সহযোগী। আর রাশিয়া ছিলো তখন ভারতের সাথে সেই রাশিয়ার সাথে সখ্য এখন পাকিস্তান এবং চীনের। যারা রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ককে আবেগের ছাঁচে ঢালাই করতে চান তারা নিরেট বোকা, নয় তাদের কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। বিশ্ব কিন্তু ১৯৭১-এ ঠেকে নেই। গ্লোবাল পলিটিক্সে অনেক ভাঙচুর হয়েছে। বিশ্ব রাজনীতির এই পাঠটা পড়তে হবে সম্পর্কের বিষয়গুলো বুঝতে গেলে। রাষ্ট্র পরিচালনে আবেগের কোন জায়গা নেই এটা পরিষ্কার বুঝে নিতে হবে। সুতরাং ‍মুক্তিযুদ্ধকে পুঁজি করে, অন্য কথায় আমাদের আবেগের জায়গাটাকে ব্যবহার করে ফায়দা লোটার দিন শেষ হয়ে আসছে সেটা না বোঝাটা অদূরদর্শিতা। এক্ষেত্রে দূরদর্শিতার বিকল্প নেই। আর সেটা আমাদের রাষ্ট্রের সার্বিক মঙ্গলের জন্যেই।

লেখাটা শুরু করেছিলাম নয়াদিল্লি বক্তব্য পাওয়ার আগেই। আমার চিন্তা যে একেবারে বাতিল ছিলো না তা জানালো ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকই। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী নয়াদিল্লি তথা ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, বাংলাদেশের একটি পত্রিকায় দুই দেশের সম্পর্ক বিষয়ক প্রকাশিত খবরটি ক্ষতিকর। শুধু তাতেই ক্ষান্ত হয়নি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক, তারা খবরটি ‘সাজানো-মনগড়া’ আখ্যা দিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মুখপাত্র অনুরাগ শ্রীবাস্তব তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, ‘সুপ্রতিবেশী কেমন হয় বাংলাদেশ তার রোল মডেল’। অতএব যারা কান উদ্ধারে চিলের পেছনে দৌড়াচ্ছেন, তারা ক্ষণকাল তিষ্ঠান।

তবে ‘ক্যাম্পেইনার’দের ভয় থাকবেই। তাদের ভয়ের কারণও রয়েছে। গ্লোবাল পলিটিক্সে চীনের উত্থান পর্বটি এখন দৃশ্যমান। করোনাভাইরাস যদি প্রাকৃতিক হিসাবে না ধরি, যদি ধরি ল্যাব সৃষ্ট, তাহলে অনেক হিসাবই মিলে যায়। এদিকটায় যেতে চাই না, যেহেতু এখনো এটা ‘হাইপোথিসিস’ পর্যায়ে। তবু পুঁজিবাদী বিশ্বের অর্থনীতি চাকা স্থবির হয়ে পড়েছে করোনাকালে এটা দৃশ্যমান সত্যি। বিপরীতে চীনের চাকা সচল। অর্থাৎ প্রতিদিন পার্থক্য বাড়ছে। আর এই বাড়ার হার হলো দ্বিগুণ। পশ্চিমা বিশ্বের কমছে আর চীনের বাড়ছে। বৃদ্ধির হিসাবটা করে দেখুন, তাহলেই অনেক কিছু খোলাসা হয়ে যাবে।

‘ক্যাম্পেইনার’দের যেহেতু রুটি-রুজি হলো চোঙা ফুঁকা, বিশ্ব রাজনীতি-অর্থনীতি’র হিসাব তাদের রাখতেই হয়। অবস্থা অনেকটা শেয়ারবাজারের হিসাব রাখার মতো, কোনটা পড়লো, কোনটা উঠলো, তেমন। সেই হিসাবের যোগফলই তাদের ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। তাও ভয়টা কেটে যেতো যদি পক্ষ বদলের পথ খোলা থাকতো। পল্টিবাজিরও আপাতত উপায় নেই। না হলে ব্যতিক্রম ছাড়া ‘ক্যাম্পেইনার’দের কোনো জাত-ধর্ম নেই।

যাক গে, সব কিছুতেই এত তাড়াতাড়ি প্রতিক্রিয়া দেখাতে গেলে ‘কানমলা’ খেতে হয়। নয়াদিল্লি’র বার্তা তাই বলে। অতএব সর্বশেষ কথা হলো, ধীরে দৌড়ান এবং মনে রাখুন, খরগোশ হওয়ার চেয়ে কাছিম হওয়া ঢের ভালো।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামনিস্ট

বাংলা/এসএ/

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0656 seconds.