• ১৩ আগস্ট ২০২০ ১৮:২৯:০৬
  • ১৩ আগস্ট ২০২০ ১৮:২৯:০৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

হঠাৎ জাগরণ, ন্যায় বিচার এবং আমাদের ব্যর্থতা

কাকন রেজা। ফাইল ছবি

কাকন রেজা:

একটা রাষ্ট্রে যখন কথায় কথায় বিচার চাইতে হয়, তখন রাষ্ট্রটির সফলতা কি প্রশ্নের সম্মুখিন হয় না? একটি রাষ্ট্র গড়ে উঠার লক্ষ্য হলো নাগরিক নিরাপত্তা। জীবনযাপনের নিশ্চয়তা। আর এই নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতেই গড়ে উঠে রাষ্ট্রের বিচারিক ব্যবস্থা। বিচারের অনিশ্চয়তা একটি সফল রাষ্ট্র গড়ে উঠার পথে বড় বাঁধা। শুরুতে সংঘবদ্ধ মানুষ রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রবর্তনের যে ধারণা করেছিলেন, তার মূল কারণ ছিলো নিরাপত্তা।

বুনো পশ্চিমের কথা যারা জানেন, বুনো পশ্চিমের গল্প যারা পড়েছেন, তারা জানেন, নিরাপত্তাটা কেন প্রয়োজন। বুনো পশ্চিমের উদাহরণটা আমি আমার অনেক লিখাতেই দিয়েছি। যারা আমার লিখা পড়েন তারা হয়তো পুনরাবৃত্তিতে বিরক্ত হতে পারেন। যারা এমনটা ভাবেন, তাদের কাছে প্রশ্ন রেখে যাই, লিখার ফলে সার্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছি কি? হয়নি। তাই বলছি, বিচার ব্যবস্থা নিয়ে সংশয় দেখা দিলে সেই রাষ্ট্র তার সৃষ্টির তাৎপর্য হারায়। আউটল’দের ভূখন্ডেই বন্দুক ফায়সালা হয়ে উঠে।

আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলি, আমার ছেলে ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন খুন হয়েছেন আজ প্রায় পনেরো মাস। ফাগুন নিজেও গণমাধ্যমকর্মী ছিলেন। ছিলেন একটি গণমাধ্যমের ইংরেজি বিভাগে সাব-এডিটর। আজ অবধি ফাগুনের খুনি ধরা পড়েনি। জাস্টিস ডিলেইড অর্থ জাস্টিস ডিনাইড, এটা আইনেরই ভাষা। পনেরো মাস ধরে একটা হত্যাকাণ্ডের সুরাহা হয়নি। তার খুনের সকল ক্লুই প্রায় পুলিশের কাছে রয়েছে। অথচ হত্যাকারীকে ধরা যায়নি, ধরা হয়নি। এই যে ‘ডিলেইড’ এতে মানুষ বিচার ব্যবস্থার উপর আস্থা হারাচ্ছে। একজন বিচারপ্রার্থীর মনে ক্ষোভ জন্ম নিচ্ছে। মনে হচ্ছে বিচারের দরকার নেই, খুনের বদলা খুন হয়ে যাক। আর সে থেকেই ক্রসফায়ারের মতন একটি আদিম ধারণার উদ্ভব। স্বাভাবিক বিচারের গতি রুদ্ধ হলেই সমাজ ক্যানিবাল হয়ে উঠে। মানুষ ক্যানিবালিজমে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

আমি অনেক লিখাতে এজন্যই ক্যানিবাল শব্দটি ব্যবহার করি, ক্যানিবাল সমাজের আশঙ্কার কথা বলি। যে আশঙ্কা আজ আমাদের জন্যে প্রায় সত্যি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর বাকি যতটুকু রয়েছে এভাবে চললে সে কোটাও নিশ্চিত পূর্ণ হয়ে যাবে। আমাজনের আদিম সমাজ কিংবা বুনো পশ্চিমের সাথে আমাদের তেমন পার্থক্য থাকবে না। খুনে সমাজ, খুনে বিচারিক ব্যবস্থা মিলে নরক গুলজার হয়ে উঠবে।

ওসি প্রদীপ কাহিনী এখন বাজারে ‘হটকেক’। খুব খাচ্ছে মানুষ। প্রায় দুশো মানুষ খুন হবার পর জাগরণ ঘটেছে সমাজে। অনেকটা গন্ডারের সেই চুলকানির গল্পের মতো। একবার চুলকালে পনেরো দিন পর সেই অনভূতি গন্ডারের মস্তিষ্কে পৌঁছে। আমাদেরও তাই হয়েছে। এই জাগরণটা আগে ঘটলে দুশো মানুষের প্রাণ যেতো না। জানি, নিহতের মধ্যে অপরাধীও রয়েছেন। কেউ কেউ তাদের মৃত্যুতে উল্লাসিত হয়েছেন। কারণ তারা সেই অপরাধীদের দ্বারা জুলুমের শিকার। মানুষ মজলুম হয়ে উঠার সাথে সাথে প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে উঠে। যদি তাদের প্রতি জুলুমের বিচার না পাওয়া যায় কিংবা বিলম্বিত হয়। ওসি প্রদীপ সেই সুযোগটারই সদ্ব্যবহার করেছেন। এমন অসংখ্য প্রদীপ নরকের আগুন জ্বালাচ্ছে দেশে।

এই যে হঠাৎ জাগরণ এই প্রশ্নের সমুখে দাঁড়িয়ে এখন গণমাধ্যমও। ওসি প্রদীপ, সাহেদ, সাবরিনা, শামীম, সম্রাট কাহিনী, এসব ক্ষেত্রে হঠাৎ জাগরণ কেন। ক্যাসিনো কি আগে চলেনি? সাহেদ-সাবরিনা কি দীর্ঘদিন ধরে বাটপারি করে আসছে না? প্রদীপেরা কি সারাদেশে নরকের আগুন জ্বালাচ্ছে না? যদি জ্বালিয়ে থাকে তাহলে আগে কেন খবর হয়নি! প্রিভেনশন যে কিউর এর চেয়ে বেটার সেটা কি গণমাধ্যমের জানা নেই! এমন সব প্রশ্ন আর প্রশ্নজনিত বিস্ময়ের সমুখে দাঁড়িয়ে আমরা। আর এসব প্রশ্ন আর বিস্ময় একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে ‍উঠার পক্ষে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।

লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1405 seconds.