• ১৬ আগস্ট ২০২০ ১৮:৫৩:৪৩
  • ১৬ আগস্ট ২০২০ ১৯:০৪:০৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

আগস্ট সত্যিকার অর্থেই বাঙালির নিঃশেষিত হওয়ার মাস

ফাইল ছবি


ডা. পলাশ বসু :


আগস্ট সত্যিকার অর্থেই বাঙালির জীবনে এক ভয়াবহ মাস। আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক এবং শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের কাছে এক বিষময় মাস এ আগস্ট। কারণ এ মাসেই আমরা হারিয়েছি বাঙালির ৩ জন অত্যন্ত প্রাণের মানুষ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এ কথা বললে তাই মনে হয় অত্যুক্তি হবে না-আগস্ট যেন আমাদের সাথে  এক চিরবৈরিতায় লিপ্ত।

আগস্টের শুরুতেই আমরা হারিয়েছি বাঙালির শুদ্ধতম মানুষ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। ৭ আগস্ট, ১৯৪১ এ তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। বাংলা সাহিত্যের এমন কোন শাখা নেই যেখানে তার হাতের ছোঁয়া পড়েনি। তিনি শুধু কবি, সাহিত্যিক, লেখক, চিত্রকর, গীতিকার, সুরস্রষ্ঠাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত ধ্যানী মানুষ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে প্রচলিত শিক্ষাকাঠামোতে আমাদের কোনো মুক্তি নেই। প্রকৃতির কাছে বসে যে শিক্ষালাভ হয় সেটাই যে প্রকৃত শিক্ষা তা তিনি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তিনি নিজের অর্জিত সমস্ত অর্থকড়ি দিয়ে তৈরি করে গেছেন শান্তিনিকেতনের মতো শিক্ষালয়।

বলশেভিক বিপ্লব তথা সমাজতন্ত্র পরবর্তী রাশিয়া ভ্রমণে গিয়ে তিনি সেখানে শিক্ষার অভূতপূর্ব উন্নয়ন দেখে তাই মুগ্ধ হয়েছিলেন। ‘রাশিয়ার চিঠি’তে তিনি সে কথা উল্লেখও করেছেন। নিজের হাতে গড়া শিক্ষালয় শান্তিনিকেতনের সাথে তার তুলনাও টেনেছেন তিনি। তিনি লিখেছেন, “এখানে প্রত্যেকের শিক্ষায় সকলের শিক্ষা। একজনের মধ্যে শিক্ষার যে অভাব হবে সে অভাব সকলকেই লাগবে। কেননা সম্মিলিত শিক্ষারই যোগে এরা সম্মিলিত মনকে বিশ্বসাধারণের কাজে সফল করতে চায়। এরা ‘বিশ্বকর্মা'; অতএব এদের বিশ্বমনা হওয়া চাই। অতএব এদের জন্যেই যথার্থ বিশ্ববিদ্যালয়।

শিক্ষা-ব্যাপারকে এরা নানা প্রণালী দিয়ে সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তার মধ্যে একটা হচ্ছে ম্যুজিয়ম। নানাপ্রকার ম্যুজিয়মের জালে এরা সমস্ত গ্রাম-শহরকে জড়িয়ে ফেলেছে। সে ম্যুজিয়ম আমাদের শান্তিনিকেতনের লাইব্রেরির মতো অকারী (Passive) নয়, সকারী (active)।”

মাতৃভাষায় শিক্ষাছাড়া যে শিক্ষা সম্পূর্ণ হতে পারে না তাও কবিগুরু তার লেখা ও বক্তৃতায় উল্ল্যেখ করেছেন। তৎকালীন সময়ে বৃটিশ রাজের দৃষ্টিতে আনার জন্য রাজনৈতিক মঞ্চে ইংরেজিতে দেয়া বক্তৃতার সমালোচনা করে তিনি কংগ্রেস নেতাদের বাংলায় বক্তৃতা করার জন্য অনুরোধ করেছেন। কারণ মানুষকে জাগাতে হলে তার সমস্যা তার কাছে তার ভাষায়ই যে বোধগম্য করে তুলতে হবে- এটাই ছিলো তার স্থির বিশ্বাস। 

কবিগুরুর সাধারন মানুষের প্রতি এই যে বিশ্বাস সেটা আমরা রূপায়িত হতে দেখি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের পরতে পরতে। তাই হয়ত টুঙ্গিপাড়ার ছোট্ট খোকা একসময় হয়ে ওঠে আপামর বাঙালির নয়নের মনি। যার আঙুলের ইশারা আর চোখের ভাষা জনসাধারণের কাছে ছিলো একদম জলের মতো স্বচ্ছ। সে কারণেই তিনি হতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ৩ মার্চ ১৯৭১ এ পল্টনে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত প্রিয়, কবিগুরুর লেখা গান ‘আমার সোনার বাংলা’কে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছিলো। কবিগুরুর অসংখ্য কবিতার লাইন, গানের চরণ বঙ্গবন্ধুর যেমন প্রিয় ছিলো তেমনভাবি সময় মতো সেখান থেকে তিনি উদ্ধৃতি দিতেও ভুলতেন না। ১০ই জানুয়ারি, ১৯৭২ দেশ স্বাধীনের পরে ফিরে এসে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতির পিতা যে আবেগময়ী বক্তৃতা দেন। সেখানে তিনি কবিগুরুর কবিতার লাইন তুলে ধরে বলেছেন- কবিগুরু তোমার কথা আজ মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে--বাঙালিরা আজ মানুষ হয়েছে। 

১৫ই আগস্ট স্বপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়েছে। একটা স্বাধীন দেশের রূপকার, বাঙালির সুহৃদ, খেটে খাওয়া মানুষের প্রিয়জন বঙ্গবন্ধুকে এদিন শুধু হত্যাই করা হয়নি তার হত্যাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করা যাবে না বলে সংবিধানে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশও সংযোজিত করা হয়েছিলো। ভাবা যায় একবার- এমন কলংকের কথা! আমাদের সংবিধানে যেখানে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে সেখানেই কিনা জাতির পিতার হত্যাকারী, নারী, শিশু হত্যাকারী নরপিশাচ খুনীদেরকে বিচারের মুখোমুখি করা যাবে না বলে বিধান যুক্ত করা হয়েছিলো। শুধু তাই নয় ১৯৯৬ সালে প্রথমবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে অবধি এসব খুনীরা আমাদের বিদেশী দুতাবাসগুলোতে বহাল তবিয়তে চাকরি করেছে। সংসদে এমপি হয়ে এসেছে। দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছে এসব খুনিরা!

অন্যদিকে সাম্যবাদের কবি কাজী নজরুল ইসলামকে দেশ স্বাধীনের পরে বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’র মহিমায় ভূষিত করে এদেশে নিয়ে এসেছেন। ১৯৪১ সালের মাঝামাঝি থেকেই নির্বাক হয়ে যাওয়া  কবিকে এদেশে এনে এ সম্মান দেয়া হলেও আফসোস কবি তা উপলব্ধি করতে পারেন নি! শুধু তাই নয় বিদ্রোহী কবির ‘চল চল চল’ কবিতা আমাদের রণসঙ্গীত হিসেবেও স্বীকৃতি লাভ করেছে। ১৯৪১ থেকে ১৯৭৬ প্রায় ৩৫ বছর আমাদের মাঝে বিদ্রোহী কবি বেঁচে ছিলেন ঠিকই তবে এ সময়ে তার হাতে আর জন্ম নিতে পারেনি সাহিত্যের কোন অমর সৃষ্টি। বাংলা সাহিত্যের জন্য এ এক অকল্পনীয় ক্ষতিই বটে! মধ্যগগনে এসে কবির সৃষ্টসূর্য অস্তমিত হয়ে গেলেও জীবন সূর্য নিভেছে ১৯৭৬ এর ২৯ আগস্ট।

এই লেখার শেষে এসে একটা তথ্য তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে দিয়ে শেষ করতে চাই। ২০০৪ সালে বিবিসির শ্রোতাজরিপে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে ২০ জন ব্যক্তির নাম প্রকাশিত হয়েছিলো। এখনকার তরুণ প্রজন্মের অনেকেই হয়তো বা তা জানে না। তরুণ প্রজন্মের জ্ঞাতার্থে তাই এ তালিকার প্রথম ৩ জনের নাম তুলে ধরে এ লেখার ইতি টানবো।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় (এখন হয়ত বুঝতে পেরেছেন আশা করি) প্রথম হয়েছিলেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান। দ্বিতীয় হয়েছিলেন সাহিত্যে একমাত্র বাঙালি নোবেলপ্রাইজ পাওয়া, আমাদের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর তৃতীয় হয়েছিলেন আমাদের জাতীয় কবি, রনসংগীতের রচয়িতা এবং চির তারুণ্য ও বিদ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ এ ৩ বাঙালিকেই আমরা হারিয়েছে কালের অলৌকিক খেয়ালে এই আগস্ট মাসেই। আগস্টের ৭, ১৫ আর ২৯ তারিখে আমরা হারিয়েছে আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ৩ জন সূর্যসন্তানকে। তাহলে আগস্ট কি সত্যিই আমাদের জন্য নিঃশেষিত হওয়া মাস নয়?

লেখক : চিকিৎসক ও শিক্ষক, সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, এনাম মেডিকেল কলেজ।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1379 seconds.