• ১৮ আগস্ট ২০২০ ২০:২৬:২৫
  • ১৮ আগস্ট ২০২০ ২০:২৬:২৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

বেলারুশ থেকে দক্ষিণ এশিয়া, সাংবাদিকতা ও গণতন্ত্র

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা:


বেলারুশের সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, তারা যদি সৎ সাংবাদিকতা করতে না পারেন, তাহলে কাজ বন্ধ করে দেবেন। ভোট চোর বেলারুশ সরকারের বিপক্ষে পথে নামা আসা জনতার সঙ্গী হয়েছেন এই খবরের কর্মীরা। এটাই হওয়া উচিত। সাংবাদিকতা পেশাটার সাথে অন্য পেশার পার্থক্যটা এখানেই। এটা স্বাধীন থাকা আর সত্য বলার পেশা। এটা প্রতিবাদের পেশা, প্রতিরোধে পাশে থাকার পেশা। সে কাজটাই করেছেন বেলারুশের সাংবাদিকগণ।

স্বাধীন সাংবাদিকতার অসংখ্য নমুনা রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও সাংবাদিকের প্রশ্নবাণে সংবাদ সম্মেলন সংক্ষিপ্ত করতে হয়েছে। সিএনএন এর এক সাংবাদিককে হোয়াইট হাউজে ঢুকতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে টিকাতে পারেননি ট্রাম্প। মামলা করে জিতে ফের ঢোকার অনুমতি আদায় করেছেন সেই সাংবাদিক। সিএনএন তার সাংবাদিকের পাশে দাঁড়িয়েছে শক্তভাবে। এটাই সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যমের প্রকৃত অবয়ব। লড়াকু চেহারা। তবে এ কথা সত্যি, স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য প্রয়োজন প্রকৃত গণতন্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।

বেলারুশ বিষয়ক খবরটি যারা পড়েননি তারা বেলারুশের প্রতিবাদী সাংবাদিকদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় জেনে বিস্মিত হবেন। তারা সবাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে কর্মরত। একজন দু’জন নয়। রাষ্ট্র পরিচালিত টেলিভিশনের শত শত সাংবাদিক ভোটচুরির প্রতিবাদে এবং সত্য না বলতে দেয়ায় রাজপথে নেমে এসেছেন। চিন্তা করে দেখুন তো, দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এমনটা ভাবা যায় কি? যেখানে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন, রেডিও ও খবরের সংস্থাগুলোর অন্যতম কাজ হচ্ছে স্তাবকতা (চাটুকারী)। যেখানে খবরের আঙ্গিকে প্রায় সময়ই প্রচারিত হয় স্তবকথা।

বেলারুশের বিক্ষোভ বিষয়ে অল্প কথায় জানাই। গত ৯ আগস্ট বেলারুশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটচুরি করে ফল পাল্টে দেয়া হয়। করা হয় মিডিয়াতে সেন্সরশিপ আরোপ। মানুষ এই ভোটচুরির প্রতিবাদে রাজপথে নামেন। সাথে সাংবাদিকরা যোগ দেন ভোটচুরি আর সেন্সরশিপ আরোপের প্রতিবাদে। মজার ব্যাপার হলো দেশটির বেশিরভাগ টেলিভিশন চ্যানেলই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত। তারপরেও সে দেশের সাংবাদিকরা পথে নেমেছেন। এমন কী নির্বাচনের আগেই ভোটচুরির সম্ভাবনা জেনে কাজে বিরতি দিয়েছেন অনেক সাংবাদিক।

সেখানকার খবরকর্মীদের মধ্যে অবশ্য আশঙ্কা কাজ করছে চাকরি হারানোর। যেহেতু সব টেলিভিশনই সরকার নিয়ন্ত্রিত তাই চাকরি হারালে পাবার সম্ভাবনা খুবই কম। তারপরেও তারা রাজপথে নেমেছে। কারণ তাদের ডেডিকেশন রয়েছে পেশার প্রতি। তারা কমিটেড। তাদের শিরদাঁড়া সোজা। দক্ষিণ এশিয়ায় এমন সোজা শিরদাঁড়ার দেখা মেলা ভার।

এখানেই শেষ নয় সরকার সমর্থনে দুটি অনুষ্ঠান চালাতেন আলেকজান্দার লুচোনোক। নির্বাচনের আগে তিনি পদত্যাগ করেছেন। তার কথা ছিলো, কী করতে হবে তা চাপিয়ে দেয়া হতো প্রশাসনের পক্ষ থেকে। ফলে সাংবাদিক হিসাবে ক্যারিয়ার গড়ার মতন জায়গা সেটা নয়। সে জন্যেই তার পদত্যাগ। পেশার প্রতি কী পরিমাণ ডেডিকেশন থাকলে, কমিটেড হলে এমনটা করা সম্ভব। দক্ষিণ এশিয়ার সাথে এমন অবস্থার তুলনা করলে দৃষ্টি এমনিতেই নিচু হয়ে আসবে। সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকদের বেশিরভাগই বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন না এমন চাপিয়ে দেয়া বা চাপের সম্মুখীন কেউ হননি। আর সাথে আপোস বা চুপ করে যাননি।

বেলারুশ নামের সাথে আমাদের দেশের প্রথম ও শেষ অক্ষরটিও মিলে যায়। এ দেশেও সাংবাদিকদের দুর্ভোগের সমুখে পড়তে হয়। সাগর-রুনি থেকে তরুণ ফাগুন রেজা’রা খুন হয়ে যান। জাস্টিস ডিলেইড হয়। হতে হতে আশঙ্কা তৈরি হয় ডিনাইডের। একজন ওসি’র তোপের মুখে সাংবাদিককে কারাগারে পঁচতে হয়। সাংবাদিক প্রবীর শিকদার হতে তরুণ প্রদীপ দাসকে অত্যাচারিত হতে হয়, লাঞ্ছিত হতে হয়। অথচ এর প্রতিকারে উচ্চারিত হয় না, ‘আমাদের সৎ সাংবাদিকতা করতে দেয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। না হলে আমরা কাজ বন্ধ করে দেবো।’ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য ‍দুটি দেশ ভারত-পাকিস্তান। কিছু দিন আগে ভারতে খুন হয়েছেন এক সাংবাদিক। পাকিস্তানের তুলে নেয়া হয়েছে আরেকজনকে। এই হলো অবস্থা।

সৎ সাংবাদিকতা রাষ্ট্রের জন্যই জরুরি। এই যে ওসি প্রদীপকে নিয়ে এত কথা হচ্ছে, তা হতো না যদি আগে থেকেই জানতো সরকার। খবরের কর্মীরা জানাতে পারেননি সরকারকে। কেন পারেননি তার প্রমাণ গণমাধ্যমকর্মী ফরিদুল মোস্তফা। ওসি প্রদীপের কাহিনি জানাতে গিয়ে যে এখনো জেলে। দীর্ঘ সময় জেলে থাকার ফলে ফরিদুলের পরিবারও আজ বিপর্যস্ত। এমন উদাহরণ সামনে থাকায় অন্য গণমাধ্যমকর্মীরা আর সাহস পায়নি খবর করার। অথচ করলে রাষ্ট্রই উপকৃত হতো। উপকৃত হতো রাষ্ট্রের পুলিশ। আগেই ব্যবস্থা নিলে তাদের আর এতটা দুর্নামের দায় নিতে হতো না। মূল কথা হলো, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের জন্যই জরুরি। আর গণমাধ্যমের জন্য জরুরি স্বাধীন সাংবাদিকতা। আর এ দুয়ের জন্যই প্রয়োজন প্রকৃত গণতান্ত্রিক অনুশীলন। দক্ষিণ এশিয়ায় এমন দিন আসবে কি...

লেখক: সাংবাদিক ও কলামনিস্ট।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0952 seconds.