• ২১ আগস্ট ২০২০ ১৫:১৯:২৯
  • ২১ আগস্ট ২০২০ ১৫:২১:০৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

নজরুলের বুলবুল আর আমার ফাগুন

বাবা কাকন রেজার সঙ্গে ফাগুন। ফাইল ছবি


কাকন রেজা:


প্রাণপ্রিয় পুত্র বুলবুলকে হারানোর পর নজরুল পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। প্রাণোচ্ছল নজরুল হয়ে উঠেছিলেন উচ্ছাসহীন একজন পাথর মানুষ। তার আর যেন হারাবার কিছু ছিলো না। বিষয়টি এখন আমি বুঝি। আমারও হারানোর কিছু নেই। একজন পিতা যখন নিজ পুত্রকে কাঁধে করে কবরে শোয়াতে যান, সেই কবরে তিনি তার সব সুখ-স্বপ্ন-সাধ কবর দিয়ে আসেন। এমন মানুষের থাকে শুধু লক্ষ্য। সুকান্ত যেমন বলেছিলেন, এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো’। তেমনি একটা লক্ষ্য নিয়ে বেঁচে থাকে এমন মানুষেরা। নজরুল যেমন বেঁচেছিলেন।

বুলবুলের রোগ শয্যার পাশে বসেই নজরুল অনুবাদ শুরু করেছিলেন হাফিজের রুবাইয়াত। অনুবাদ শেষ করে অনুবাদের উৎসর্গ পত্রে নিজের ভেতরের কথাটা জানান দিলেন। বললেন, 'তোমার মৃত্যু শিয়রে বসে ‘বুলবুল-ই সিরাজ’ হাফিজের রুবাইয়াতের অনুবাদ আরম্ভ করি। যেদিন অনুবাদ শেষ করে উঠলাম, সেদিন তুমি আমার কাননের বুলবুলি - উড়ে গেছ। যে দেশে গেছ সে কি বুলবুলিস্তান, ইরানের চেয়েও সুন্দর? জানি না তুমি কোথায়? যে লোকেই থাক, তোমার শোক-সন্তপ্ত পিতার এই শেষদান শেষ চুম্বন বলে গ্রহণ করো।’ নজরুলের মতন একজন কবি। যিনি যুদ্ধের বিভৎসতা দেখেছেন। নিজেও ছিলেন যুদ্ধে। যিনি লড়াই শুরু করেছেন শাসক-শোষক আর অন্ধ সমাজের বিরুদ্ধে সেও ভেতরে ভেতরে বিধ্বস্ত হয়ে গেলেন সন্তানের মৃত্যুতে। এ জন্যেই সবচেয়ে ভারী বোঝা বলা হয়েছে সন্তানের মৃত শরীরকে। নজরুল সেটা বুঝেছিলেন, আর আমিও বুঝেছি। তাই এখন নজরুলের বুলবুল পরবর্তী অবস্থাটা অনুধাবন করতে পারি।

আমার বড় ছেলে ফাগুনের শরীর যখন আমার কাঁধে, তখন বুঝেছিলাম যন্ত্রণার প্রকৃত রূপ। সেই রূপ এখন আমার চোখে স্থায়ী হয়ে গেছে। যেমন গিয়েছিল নজরুলের। প্রাণোচ্ছলতার প্রাণ হারিয়েছিলেন তিনি। বুলবুল মারা গিয়েছিল অসুখে। আমার ফাগুন, ইহসান ইবনে রেজা ফাগুনকে খুন করা হয়েছিল। একজন গণমাধ্যমকর্মীকে মেরে ফেলা হয়েছিল। অশুভ শক্তির হাতে নিহত হয়েছিল সে। এখন প্রশ্ন হলো কারা সেই অশুভ শক্তি। নজরুল লিখেছিলেন, ‘কান্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর, বাঙ্গালীর খুনে লাল হ’ল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!’ সেই অশুভ শক্তিরা সেই ক্লাইভের প্রেতাত্মা। যারা আধিপত্যবাদীদের দেশিয় রূপ।

নজরুল তার শোককে শক্তিকে পরিণত করেছিলেন। বিদ্রোহ করেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন বিদ্রোহী। শাসক, শোষক আর অন্ধ সমাজের জন্য হয়ে উঠেছিলেন মূর্তিমান আতঙ্ক। তার লেখায় ঝরতে শুরু করেছিল আগুন। ক্রমেই সেই আগুন জ্বলে উঠছিল সবখানে। আর ত্রস্ত হয়ে উঠছিল অশুভ শক্তি।

নজরুল লিখলেন,

তিমির রাত্রি, মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান!

যুগ-যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান!

ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান,

ইহাদের পথে, নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার!!

নজরুল সে সময়, সেই শাসক-শোষক আর অন্ধ সমাজের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন। আমাদের এই সময়ে এমন লেখার কেউ আছে কি? নেই। সন্তান শোক নজরুলের চেয়ে কোন অংশেই কম নয় আমার। আমারও হারাবার আর কিছু নেই। কিন্তু নজরুলের মতন লেখার ক্ষমতা আমার বা আমাদের আছে কি? উত্তর একটাই নেই। তবে সীমিত সাধ্যে চেষ্টাটা রয়েছে। নিজের যতটুকু ক্ষমতা রয়েছে তা দিয়ে শাসক-শোষক আর অন্ধ সমাজের বিরুদ্ধে লিখে যাচ্ছি। এই লিখে যাওয়াটাও এই সময়ের এক চিত্রিত রূপ ভবিষ্যতের কাছে। নজরুলের লেখা যেমন জানান দেয় সে সময়ের ইতিহাস। আমরা আজও অনুপ্রাণিত হই সেই লেখা থেকে। জ্বলে উঠে ভস্মে আগুন। সে অর্থে রুখে দাঁড়াবার চেষ্টাটা অন্তত করি।

আর যারা রুখে দাঁড়াবার চেষ্টা করেন না, ‘জ্বী হুজুরে’র সেই দলকে নজরুল অনেক আগেই চিহ্নিত করেছিলেন। বলেছিলেন,

মোরা গলদঘর্ম যদিও গলিয়া,

              বড় বেজুত করেছে লেজুড় ডলিয়া,

              তবু গলদ করো না বলদ বলিয়া হে,

মোরা বড় দরকারি সরকারি গরু, তরকারি নহি তার!

তবে গতিক দেখিয়া অধিক না গিয়া সটান পগার পার!

এই দলটিকে আমরা চিনি। আমাদের সময়ে সেই দলের আরো বাড়ন্ত হয়েছে। এখন ঘরে ঘরে। আজও আমাদের নজরুলের ‘ল্যাবেন্ডিশ বাহিনীর বিজাতীয় সঙ্গীত’ গাইতে হয়। মানুষের বিপক্ষে দাঁড়ায় আজও সুবেশী উন-মানুষেরা। টিভি টক’শো থেকে পথ’শো সবখানেই এদের দেখা মেলে।

কোরাবানির ঈদ চলে গেলো। ফাগুনকে ছাড়া দুটো কোরবানির ঈদ গেলো আমার। গত কোরবানি ঈদেও আমার কোরবানি দেয়া হয়নি। দীর্ঘদিনের অভ্যাস হাটে ফাগুনকে নিয়ে গরু কিনতে যাওয়া। ও নেই, তাই হাটের পথ আর টানেনি আমায়। সবচেয়ে বড় কোরবানিতো আমি দিয়েই দিয়েছি। ইসমাইল (আ.) তো বেঁচে গিয়েছিলেন। আমার ফাগুন বাঁচেনি। অবশ্য ফাগুন থাকলেও এবার হাটে যেতে দিতো না। করোনাকালের ভয়াবহতাটা ওর অনুধাবনের মধ্যে থাকতো। বিশ্ব এমন এক সময় পাড়ি দিচ্ছে, যেখানে এমন জমায়েতে যাওয়া শুধু নিজের ক্ষতি নয়, পরিবার এবং সমাজেরও ক্ষতি। ধর্ম আর যাই হোক মানুষের ক্ষতি চায় না।

তাই নজরুল লিখলেন,

ওরে ফাঁকিবাজ, ফেরেব-বাজ,

আপনারে আর দিস্নে লাজ,-

গরু ঘুষ দিয়ে চাস্ সওয়াব?

যদিই রে তুই গরুর সাথ

পার হয়ে যাস পুল্সেরাত,

কি দিবি মোহাম্মদে জওয়াব।

জবাব নেই কোনো। কী জবাব দেবে ফেরেব-বাজ’রা। যারা এমন মহামারীর কালে মানুষের জীবন-মৃত্যু নিয়ে ব্যবসা করে। শোষণ করে। তাদের কোরবানি অর্থহীন। নিজেরা ঘুষখোর বলে গরু ঘুষ দিয়ে চায় সওয়াব।

আমার ফাগুন হত্যার বিচার হয়নি। দোষীরা আইনের আওতায় আসেনি এখনো। কেন আসেনি এর জবাবও ছিলো নজরুলের জানা। তিনি বললেন,

টুপি প’রে টিকি রেখে সদা বল যেন তুমি পাপী নও।

   পাপী নও যদি কেন এ ভড়ং, ট্রেডমার্কার ধুম?

   পুলিশী পোশাক পরিয়া হ’য়েছ পাপের আসামী গুম।

নজরুল বলতে বাদ রাখেননি কিছু। কাউকে ছাড় দেননি। ছাড় দেয়ার সময়ও নেই। ছাড় দিতে দিতে আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে। হারানোর কিছু নেই আমাদের। সন্তানহারাদের হারানোর কিছু থাকে না। তাই বলি, বসে থাকার সময় নেই। পথে নামুন। নিজের আত্মজদের বাঁচাতে হবে। এখনো অনেক ফাগুনেরা সম্ভাবনা নিয়ে বেঁচে আছে তাদের আগলে রাখার দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। তাই আওয়াজ তুলুন। এখন এর বাইরে আর কোনো বিকল্প আমাদের হাতে নেই।

পুনশ্চ: আজ পনেরো মাস পূর্ণ হলো ফাগুন চলে যাওয়ার। ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন, ফাগুন রেজা। এক আগুনসমান গণমাধ্যমকর্মী। নির্ভিক, সৎ। যে আপোস করেনি অন্যায়ের সাথে তার ক্ষুদ্র জীবনে। তাই হয়তো তাকে খুন করা হয়েছে। ২০১৯ এর ২১ মে ফাগুন নিখোঁজ হয়ে যায়। সেদিন রাতেই তার লাশ পাওয়া যায় জামালপুরের রেললাইনের পাশে। মামলা হয়। কিন্তু ওই পর্যন্তই। পনেরো মাসেও পুলিশের পক্ষে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি মূল সন্দেহভাজনদের। উদঘাটিত হয়নি ফাগুনের হত্যা রহস্য। কোথাও যেন এক অদৃশ্য বাধা কাজ করছে। কোথায় সে বাধা?

লেখক: নিহত সাংবাদিক ফাগুন রেজা’র বাবা, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1051 seconds.