• ২৪ আগস্ট ২০২০ ১৯:৫৮:৪০
  • ২৪ আগস্ট ২০২০ ১৯:৫৮:৪০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ক্যানিবাল চক্রের উত্থান এবং সামাজিক বিপর্যয়

ফাইল ছবি


কাকন রেজা :


ভয়াবহ অবস্থা। কক্সবাজারের চকোরিয়ায় মা ও মেয়েকে গরু চুরির অপবাদ দিয়ে পেটানো হয়েছে। যে সে পেটানো নয় দড়ি দিয়ে বেঁধে অমানুসিক নির্যাতন করা হয়েছে সেই মা মেয়ের উপর। শেষে মুমূর্ষু অবস্থায় তুলে দেয়া হয়েছে পুলিশের হাতে। কেনো আমি বারবার ক্যানিবালিজমের কথা বলি। কেনো তুলে আনি মব জাস্টিসের কথা। এটা যারা এখনো বুঝতে পারেননি, তাদের আর বোঝার সম্ভাবনা নেই। তারা বুঝতে পারছেন না ‘ক্যানিবাল চক্রে’র উত্থান ও সামাজিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা অথবা তারা জেগে ঘুমাচ্ছেন।

ঘটনার দৃশচিত্রটি লক্ষ্য করুন। গণমাধ্যমে উঠে আসা চিত্রটিতে দুজন নারী গরু চুরির সাথে জড়িত, তাও আবার মা-মেয়ে। এমন অভিযোগ তুলে বিচার করতে বসলেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, যিনি কিনা সেখানের শাসকদলের সভাপতিও। তার হুকুমে দড়ি বেঁধে প্রকাশ্যে রাস্তায় হাঁটিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে নিয়ে আসা হলো সেই মা-মেয়েকে। নিয়ে আসার আগে একবার পেটানো হলো। নিয়ে এসে আবার এমন পেটানো হলো যে মৃতপ্রায় অবস্থায় তাদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। আর এই হাসপাতালে ভর্তির কাজটা করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, স্থানীয় পর্যায় থেকে খবর পেয়ে তারা দুই মহিলাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। গণমাধ্যমে পাওয়া খবর অনুযায়ী পুলিশ জানিয়েছে, এই দুষ্কর্ম কে ঘটিয়েছে তা তাদের জানা নেই। অভিযোগ পেলে তারা ব্যবস্থা নেবেন। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে অভিযোগ না করলে এর কোনো ব্যবস্থা বা প্রতিকার নেই! অর্থাৎ কেউ যদি নিশ্চিত হতে বা করতে পারে কাউকে পেটালে অভিযোগ হবে না, তাহলে সে নিশ্চিন্তে দুষ্কর্মটি করতে পারে!

অপরাধ করলে তাকে আটক ও গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশ রয়েছে। বিচারের জন্য আদালত রয়েছে। এখানে ইউপি চেয়ারম্যানের কাজটা কী! ইউপি চেয়ারম্যান সামাজিক বিচার করতে পারেন, যেটাকে সালিশি আদালত হিসাবে গণ্য করা হয়। তার কাজের পরিধি প্রকাশ্যে পেটানোর মধ্যে পরে না। হয়তো তিনি শাসক দলের স্থানীয় ইউনিটের সভাপতি হিসাবে নিজেকে শাসন ক্ষমতার মালিকও ভেবেছিলেন। এই যে ঘটনা, তার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বিশ্লেষণ করলে দেখবেন, এর পুরোটাই অপরাধ কার্যক্রম। মব জাস্টিসও বলা যায় না তাকে। তার থেকেও বড় অপরাধ। মব জাস্টিস হলো ন্যায় বিচার না পাওয়ার আক্রোশে অপরাধীর বিরুদ্ধে ফুসে উঠা সংগঠিত মবের জাস্টিস। এ ঘটনায় এমনটা অনুপস্থিত। এটা সংগঠিত একটি অপরাধী চক্রের উদ্দেশ্যমূলক কার্যক্রম। এটা সংগঠিত জনতার কাজ হলে, স্থানীয়রা থানাতে বিষয়টি জানিয়ে মা-মেয়েকে উদ্ধার করতে বলতো না।

দেশের প্রতিটি এলাকায় সামাজিকভাবে এমনি এক ধরণের ক্যানিবালিজমের উদ্ভব ঘটেছে। ক্ষমতার প্রভাবে কিছু মানুষ ক্রমেই ক্যানিবাল হয়ে উঠছেন। চকোরিয়ার ঘটনাও তাই। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী সেখানের জনপ্রতিনিধি একাধারে শাসক দলের স্থানীয় প্রধান এবং বিত্তশালী। হয়তো অর্থ-বিত্ত-প্রতিপত্তি তাকে ‘ক্যানিবাল’ হিসাবে তৈরি করেছে। তিনি নিজেকে দন্ডমুন্ডের কর্তা ভাবতে শুরু করেছেন। যার ফলেই তিনি এমন কান্ড ঘটিয়েছেন। আর এমন মানুষের কিছু ক্যানিবাল চেলা-চামুন্ডা এমনিতেই গজিয়ে উঠে। সূর্যের চেয়ে বালির উত্তাপ বেশি হয়, তেমনি এসব চেলাদের তেজও সাধারণত নেতাদের চেয়ে বেশি হয়। তারা ধরে আনতে বললে বেঁধে আনে। আর সেই বেঁধে আনাকে পিঠ চাপড়িয়ে স্বাগত জানান নেতা। এভাবেই প্রতিটি এলাকায় গড়ে উঠে ক্ষমতা নির্ভর একটি ‘ক্যানিবাল চক্র’। যাদের থাকে নরভোজি মানসিকতা। মানুষকে নির্যাতন নিপীড়ন করে তারা এক ধরণের বিকৃত আনন্দ পায়।

এমন ঘটনার কথা প্রায়শই গণমাধ্যমে উঠে আসে। যতটা উঠে আসে তার বেশি অবশ্য চাপাও পরে যায়। কেনো যায় সেটাও বিশ্লেষণযোগ্য। সেটা বিশ্লেষণের আগে কতিপয় গণমাধ্যমের বিষয়টিও বলতে হয়। মা ও মেয়েকে বেঁধে আনা হচ্ছে এমন ছবি প্রকাশ করেছে কিছু গণমাধ্যম। এই যে, সারাদেশে মা ও মেয়েকে চিনিয়ে দেয়ার বিষয়, এটাও অপরাধ। এটাও ক্যানিবাল চিন্তার ফসল। ছবিতে মা ও মেয়ের মুখটা ঢেকে দেয়া এখনের প্রযুক্তিতে কোন বিষয় নয়। তারপরেও মা-মেয়েকে ছবির মাধ্যমে চিহ্নিত করে দেয়া মানে তাদের সামাজিক ভাবে অসম্মানিত করা, শেষ করে দেয়া। এটাও এক ধরণের ক্যানিবালিজম। সুতরাং দেশের গণমাধ্যমেও এক ধরণের ক্যানিবালিজম ভর করেছে। শিপ্রার ব্যক্তি জীবন ও সাবরিনার ‘গ্ল্যামারাস’ ছবির প্রকাশ সেই কথাই বলে। এই ক্যানিবালিজমের শুরুটা হয়েছিলো মৃতপ্রায় মানুষকে চিকিৎসার আগে প্রশ্ন করার মতন নৈতিকতা বিবর্জিত মানসিকতার মধ্য দিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ার চাপিয়ে দেয়া সাংবাদিকতার ভুল শিক্ষার ফল এটা।

এই যে বিচারের আগে বিচার প্রক্রিয়া, মানুষকে অত্যাচার করার আদিম প্রয়াস, এটা বন্ধ করার কোনো বিকল্প নেই। আর এটা বন্ধ করতে হলে বিচারিক প্রক্রিয়াকে আস্থার জায়গায় আনাটা জরুরি। মানুষ যেনো নিশ্চিত হয় বিচারের ব্যাপারে। মানুষ যেনো বিশ্বাস করে অন্যায় করলে শাস্তি পেতে হবে। জাস্টিস যেনো ডিলেইড না হয়, যাতে মানুষের মনে ডিনাইডের ধারণাটা ভর করে। যতক্ষণ পর্যন্ত ন্যায় বিচারের বিশ্বাস মানুষের মনে না জন্মাবে। ততক্ষণ পর্যন্ত সমাজের ক্যানিবাল অংশটি এর সুবিধা ভোগ করবে। মব জাস্টিসের উত্থান পর্ব দীর্ঘায়িত হবে। ধরো এবং মারো- বিচারের নামে এমনটাই চলবে।

বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা সৃষ্টির পাশাপাশি রাষ্ট্রের ক্ষমতাচক্রেরও একটি দায়িত্ব রয়েছে। সেই দায়িত্বটা হলো, এই যে শাসক দলের নাম ভাঙিয়ে এলাকাভিত্তিক একটা ‘ক্যানিবাল চক্র’ গড়ে উঠেছে তাদের ক্ষমতার ভিতটাকে ভেঙে দেয়া। তাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। আর পরিষ্কার বার্তা দেয়া যে, এলাকাভিত্তিক গড়ে উঠা এসব ক্ষমতা কেন্দ্রিক ক্যানিবাল চক্রকে কোনভাবেই প্রশ্রয় দেয়া হবে না। এটা শুধু লোক দেখানো হলে চলবে না, কার্যকর বার্তা হতে হবে। ‘ফলস অ্যালার্ম’ কোনো কাজের কথা নয়। অথচ আমাদের চারিদিকে এখন শুধু ফলস অ্যালার্মই বাজছে কাজের কাজ তেমন কিছুই হচ্ছে না। কোনো ক্ষেত্রেই না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামনিস্ট।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কাকন রেজা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1610 seconds.