• ২৬ আগস্ট ২০২০ ২১:১১:২৫
  • ২৬ আগস্ট ২০২০ ২১:১১:২৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

নারীকে একটা শরীর ভাবা বন্ধ না হলে মুক্তি নেই নারীর

ফাইল ছবি


আমিনা সুলতানা সানজানা :


একটা সমাজে ধর্ষণের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা কেন ঘটে?
কি সাহসে একজন মানুষকে একদল লোক যৌতুকের জন্য পিটিয়ে মেরে ফেলে?
কি অনুভূতি থাকলে অনাগত শিশুটি স্ত্রী লিঙ্গ জেনে ভ্রুণ হত্যা করা হয়?
ভুলটা কোথায়? পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টির? ধর্ম না মানা? আর্থিক? নাকি শুধু একটি অন্যায়, নারী হয়ে জন্মানো!

শুরুটা জন্মের প্রথম থেকেই। বেশির ভাগ পরিবারে প্রথমবার কন্যা সন্তান মেনে নিলেও দ্বিতীয়বার সবার মন খারাপ হয়। অনেক উচ্চ শিক্ষিত পরিবারেও দেখেছি এই সমস্যা। তারপর যদি পরপর কন্যা সন্তান হয় তাহলে তো কথাই নেই। ওই কন্যা সন্তানের গায়ের রং কালো হলে তো শেষ! দূরে যেতে হবে না, পরিবারই সব চেয়ে বড় শত্রু হয় তার। অনেক উদার মনা শিক্ষিত পরিবারেও দেখেছি মেয়ের গায়ের রং নিয়ে কত হীনমন্যতায় ভোগে। কারণ একটাই ভালো বিয়ে হবে না। আরে যে সম্পর্ক আমার গায়ের রং দেখে হয়, তা না হলেই বরং ভালো।

শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে এলেই পরিবারের বড় চিন্তা তাকে নিয়ে। এভাবে চলবে ওভাবে চলবে না। তোমার স্ফীত বক্ষ যেন কোন ভাবেই কারো চক্ষু খোচর না হয়। হোক তা বাহিরে কিবা ঘরে। আচ্ছা বাহিরে বুঝলাম, পরের উপর আমার নিয়ন্ত্রণ নেই, কিন্তু ঘরও আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে? বাবা, ভাই ওরাও যদি দৃষ্টি সংযত রাখতে না পারে তবে বাহিরের কি দোষ?

বিজ্ঞান বলে মানুষের শরীর বর্ধনশীল এবং না বাড়লে তা নিয়ে আরেক চিন্তা! তাহলে বর্ধনশীল দেহ দেখলেই কেন কুচিন্তা আসতে হবে? কুচিন্তা না এসে বরং নিজের মানসিকতাটা পরিবর্তন করা শ্রেয় মনে করি।

কিন্তু একটা দৃষ্টিই কেবল ধর্ষণ, যৌতুক, নারী ভ্রুণ হত্যা অথবা নারীর প্রতি সহিংসতার কারণ হতে পারে না।
আপনি যখন ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাস্তা পার হবেন, তখন কোন রেস্টুরেন্ট থেকে খাবারের গন্ধ আসলে বা আপনার চোখের সামনে আসলেই আপনি তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন না। কারণ আপনি জানেন এতে আপনার মার খাবার সম্ভবনা শতভাগ। আপনি তখনই ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন যদি আপনি অমুক তমুক বড় ভাই হোন, যার এলাকায় ভয়ে বা নির্ভয়ে সমর্থন আছে। আপনার অন্যায়ে সমর্থন দেবার লোক আছে জেনেই আপনি অন্যায় করার সুযোগ পান।

ঠিক তেমনই ধর্ষণ, যৌতুকের মতো ঘটনা, ভ্রুণ হত্যা সমর্থন দেয়ার লোক এখনও আছে। কখনো এরা প্রকাশ্যে থাকে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এদের লেবাস লুকায়িত থাকে। সময় সুযোগ মতো এরা কোপ মারে।

একটি নারীকে সম্মান করতে শেখাতে হবে ঘর থেকেই। এটা বেসিক জ্ঞানের মধ্যে পরে। কিন্তু যে পরিবারে এর চর্চা নেই সেই পরিবার কিভাবে তার সন্তানকে শেখাবে? যা আমি নিজে বিশ্বাস করি না, তা সন্তানকে শেখাবো কি করে? আমি মুখে যাই বলি না কেন, আমার সন্তান আমার আচরণ থেকেই বেশিরভাগ সত্য শিখে নিবে। তার জন্যই নেপোলিয়ান বহু যুগ আগে বলে গেছেন, আমাকে একটা শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দিবো। এখন সর্ষের মাঝেই যদি ভূত থাকে? শিক্ষার ভিতরেই যদি থাকে গলদ?

বাড়িতে বসেই যদি এই মেয়ের চালচলন ভালো না, ওই মেয়ে কালো, তোর শ্বশুরবাড়ি থেকে কি কি দিলো? আবার মেয়ে হয়েছে? মেয়ে হয়ে এটা কেন করে ওটা কেন করে না টাইপ কথা বলে যদি সকালে উঠে বলেন, বাবা তুমি কিন্তু মেয়েদের সম্মান করবে। তাহলে সেই ছেলে তো দ্বিধায় পরে যাবে, আসলে সম্মান কাকে বলে?

মেয়েরা লেখাপড়া করুক ছেলেদের মতো বেশি নাম্বার পাক ঠিক আছে, কিন্তু লেখাপড়া করে তাকেও কিছু করতে হবে তা সব সময় ঠিক নাই! মেয়েরা ব্যবসা বা চাকরি করে সংসার চালাবে ঠিক আছে কিন্তু তার নিজের ভালো থাকার জন্য ব্যবসা বা চাকরি করবে ঠিক নাই! ফেইসবুকে আমি নিত্য আমার ছবি দেই ঠিক আছে, কিন্তু একটা মেয়ে তার পণ্য বিক্রি করবে লাইভে এসে তখন জাত যায় যায়। যারা এতো আপত্তি তুলে মেয়েদের নিয়ে তারা নিজেরা চরম হিপোক্রেট। তারা নিজেদের অজান্তেই সমাজে চালু রেখেছে এসব ভয়াবহ অন্যায়।

যে বা যারা ধর্ষণ করে, তারা জানে একদল তার সমর্থন করবেই। আঙ্গুল তুলবে মেয়ের দিকে। যারা যৌতুক নেয় তারাও বলবে ওই বাড়ির ওরা তো দিয়েছে। যে স্বামী বউ পিটায় সে জানে আমাদের সমাজে এটা তেমন বড় কোন অন্যায় নয়। এমন কত হয়েছে মেয়ের বাবা মা জানে মেয়ে মার খায়, স্বামী অন্য নারীতে আসক্ত, মদ খায়, জুয়া খেলে তারপরও মেয়েকে বলে মানিয়ে চল। কারণ ওই যে , সমাজে সে মুখ দেখাবে কি করে! অথচ একটা মেয়েকে স্বাবলম্বী করা আরো সহজ ছিল।

এখনও মেয়ের পরিবার বিয়ের পর মেয়েকে পরের ঘরের মনে করে। এতো আদর করে যে মেয়ে বড় করে বিয়ের পর সে তার অবস্থান হারায় বাবার বাড়িতে। সম্পত্তির ভাগের সময়েও মেয়েরা প্রায়ই ন্যায্য অধিকার পায় না। 

পরিবারে, সমাজে আজও মেয়েরা মানুষ হিসেবে শতভাগ গণ্য হয় না। আমাদের দৃষ্টি ভঙ্গি মেয়েদের প্রতি এখনও দ্বিধাবিভক্ত। যতদিন না মেয়েদের মানুষ হিসেবে না দেখবো ততদিন মেয়েরা এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে না। আমি আপনি আমরা সবাই কোন না কোন ভাবে নারী মুক্তির অন্তরায়। নারীর প্রতি আমাদের মনোভাব যতদিন পরিবর্তন হবে না ততদিন ধর্ষণ বন্ধ হবে না, যৌতুক বন্ধ হবে না, নারী ভ্রুণ হত্যা বন্ধ হবে না! যতদিন নারীকে একটা শরীর ভাবা বন্ধ না করবো ততদিন মুক্তি নেই নারীর।

লেখক : উদ্যোক্তা

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1266 seconds.