• ২৯ আগস্ট ২০২০ ২১:৫৩:০৬
  • ২৯ আগস্ট ২০২০ ২১:৫৩:০৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

একাত্তর, সাফাত উল্লাহ, ভুলে যাওয়া ইতিহাসের দায়!

সাফাত উল্লাহর বাড়ি ও তার নামে করা সড়কের ফলক। ছবি : সংগৃহীত


মামুনুর রশিদ :


১. কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রায়গঞ্জ ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম রতনপুর। বর্তমান আদর্শপাড়া। আনুমানিক ১৯৪৫-১৯৪৬ সালে এই গ্রামে বছদ্দি মিয়া ও ছারভান বেগমের ঘরে জন্মলাভ করেন সাফাত উল্লাহ নামের এক বীর সন্তান। যার কথা ভুলে গেছি আমরা। তাতে কি? এই গ্রামের ধুলিকণা নড়সিংডাংগা বিল, পথঘাট, কোথাও না কোথাও এই দেশের মাটি মনে রেখেছে তাকে। নইলে আজ মৃত্যুর (স্বাধীনতার) ৪৯ বছর পর তার নাম কেন সামনে এলো।

আসুন আপনাদের গল্প বলি। সেই গল্পটা, যেটা আমাদের ইতিহাস।

২. একাত্তরে আনুমানিক ২৪-২৫ বছরের টগবগে যুবক সাফাত উল্লাহ। গরীব পিতার জন্য তিনি তখন কর্মক্ষম সহায়ক ছিলেন। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষালাভ করার পর আর স্কুলমুখী হতে পারেননি। কাজ করতেন আফসার আলী ব্যাপারীর বাড়ির কেয়ারটেকার হিসেবে। বন্ধুদের সাথে হা-ডু-ডু কোর্ট যেমন কাঁপিয়েছেন তেমনি কর্মক্ষেত্রে ছিলেন মালিকের বিশ্বস্ত। এই অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আফসার আলী ব্যাপারীর ভরসার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন এই সাফাত উল্লাহ নামের যুবকটি। তাই তাকে তিনি কাজে লাগাতে চেষ্টা  করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী হিসেবে। দ্বায়িত্ব পালন ভেবে দেশকে স্বাধীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছিলেন সাফাত। তাই দিতে হয়েছে নিজের জীবন। আর তার মৃত্যু ছিলো ভয়ংকর।

৩. এবার তারও ৪৯ বছর পরের গল্প শুনুন। সব রাজাকার এবং তার বংশধরেরা এখন প্রভাবশালী। সময়ের ব্যবধানে আমরা ভুলে গেছি বীর সাফাত উল্লাহ কেই। আজ যখন এতো বছর পর তার নাম উচ্চারিত হচ্ছে তো ভয়ে কথা বলার লোকের বড় অভাব। ভাবলাম একবার ঘুরে আসি সাফাত উল্লাহর গ্রাম। সেখানে কথা হল স্কুলশিক্ষক নুরুল আমিনের সাথে। তার সাথে কথা বলে ফিরলাম। ব্যস্ততায় সেদিন আর কাউকে পাওয়া গেল না। পরদিন নুরুল আমিন সকলের সাথে কথা বলে রেখেছেন তাই এক জায়গাতেই পেয়ে গেলাম সবাইকে। এলাকাবাসী শামসুল হক বলেন, ‘তখন আমার বয়স ১০ বছরের মত। সেদিন সাফাত চাচা আমাদের বাড়ি গিয়ে বাবার হুক্কা চেয়েছিলেন। হুক্কা খেয়ে বাবাকে বলেন ভাইজির (ভগ্নিপতি) বাড়ি যাই। কিছু টাকা পয়সা লাগে, বলেই… ১১টার দিকে চলে যান। পরে ১২টা নাগাদ শুনতে পাই উনি রাজাকারদের হাতে আটক হয়েছেন।’

কথা হল ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুল হামিদ মিয়ার সাথে। যেন তার চোখের সামনে ভাসছে সব। জ্যান্ত স্মৃতির পশরা খুললেন তিনি। বলেন, ‘শর্টকাটে কমো (বলবো) নাকি সোগ (সব) শুনবেন?’

বললাম, ‘আপনি মুল বিষয়গুলো বলুন।’

তিনি শুরু করলেন, ‘সাফাত গেছিলো তার বোইনের (বোনের) বাড়ি। এই নড়সিনডাংগার পাড়। টাকা নিয়ে ইন্ডিয়া যাইবে (যাবে) ট্রেইনিং কইরতে (করতে)। এই খবর রাজাকারের দল শুনছে। সাফাত নড়সিনডাং থাকি ফিরতে রতনপুর স্কুলের রাস্তায় একটা দোরামের গাছ আছিলো। ওইখানে গাজী পিয়ন, ইছব সরকার আর নুর-মোহাম্মদ খন্দকার তাকে অ্যাটাক করে। ধরে নিয়ে এসে গাজী পিয়নের বাড়িতে রাখে। সেই খবর পেয়ে আকবর মন্ডল, আমজাদ ব্যাপারী, আজগার ব্যাপারী, আতোয়ার ব্যাপারীসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তাকে ছাড়বার (ছাড়াতে) যায়। কিন্তু রাজাকাররা তাকে ছাড়ে নাই। চোকিদার দিয়ে অন্য রাস্তা দিয়ে তাকে নাগেশ্বরী নেয়। পরে শুনছি যে বিহারিরা মারি ফ্যালাইছে (মেরে ফেলেছে)। লাশও মেলে নাই।’

শহীদ (যদিও তিনি তালিকাভুক্ত নন) সাফাতের কোনো বংশধর আছেন কিনা- জানতে চাইলে তার চাচাতো ভাই বয়োবৃদ্ধ নুর ইসলাম মিয়াকে পাওয়া গেলো। তিনি সাফাত উল্লাহ যে বাড়িতে থাকতেন তা দেখিয়ে দিলেন। ওই বাড়িতে এখন নুর ইসলামের পুত্র লোকমান মিয়া স্ব-পরিবারে বসবাস করেন। সে সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সাফাত যখন ধরা পড়ে তখন তার বিয়ে করার এক মাসও যায় নাই। বাড়িতে নতুন বউ। জ্যাঠা (সাফাত উল্লাহর বাবা) আমাক সাথে নিয়ে সাফাতকে ছাড়বার (ছাড়াতে) যায়। খানেরা আমাদের দেখতে দেয় নাই। পরদিন খানা (খাবার) নিয়ে আবার যাই। সাফাতের সাথে আমাদের দেখা করতে দেওয়া হয় নাই। এভাবে ৫-৬ দিন চলে যাওয়ার পর জ্যাঠা অস্থির হয়ে পিস কমিটির (এ অঞ্চলের) আব্দুল হক প্রধানের হাতে পায়ে ধরে সাফাতকে ছাড়ে (ছেড়ে) আনতে বলেন। কিন্তু সে স্বাক্ষী দেয় যে, সাফাতকে নাকি চেনেনই না। পরদিন খানেরা গোরধার ব্রীজের উপর থেকে সাফাতের হাত-ঠ্যাং কাটি কাটি টুকরা টুকরা করি নদীত (নাগেশ্বর নদ) ফেলে দেয়। জ্যাঠা এইগলার (এসবের) পরে বছর খানিকের মধ্যে মারা যায়। জ্যাঠাই (ছারভান বেগম, সাফাত উল্লাহর মা) মারা যায় সংগ্রামের আট/নয় বছর পর। তারপর থেকে সাফাতকে নিয়ে আর কেউ কোনো কথা বলে নাই।’

এরপর দেখা করলাম এই অঞ্চলের বীর মুক্তিযোদ্ধা আজাদ হোসেনের সাথে। তিনি জানালেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগ ছিলো সাফাত উল্লাহর। সাফাতের সাথে কথা বলে আমি, আহমদ আলী এবং মোরেন নামে একজন- মোট তিনজন ট্রেনিংয়ে যাই। সে নিজেও যেতে আগ্রহী ছিলো কিন্তু তার মালিক আফসার আলী ব্যাপারীর দেওয়া কিছু দ্বায়িত্ব তার কাধে ছিলো। সেগুলো সে পালন করেছিল। কারণ ব্যাপারী তখন ইন্ডিয়া গিয়েছিলেন। পরে সে যুদ্ধে যেতে প্রস্তুতি নিলেও রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে যায়।

শহীদের তালিকায় তার নাম না থাকা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তার কোনো ছেলেপুলে না থাকায় কেউই খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি এই ব্যাপারে। সরকারের কাছে আমার অনুরোধ তার নামটি যেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।’

স্কুল শিক্ষক নুরুল আমিনের সাথে কথা হল।

তিনি বললেন, আমরা একাত্তর পরবর্তী প্রজন্ম সাফাত উল্লাহর ব্যাপারে কিছুই জানতাম না। ভাগ্যিস এখন বিষয়টি কোনোভাবে সামনে এসেছে। কিন্তু আমাদের পরের প্রজন্ম যেন তার বীরত্বের গল্প ভুলে না যায়। তাই এলাকাবাসী গ্রামের সড়কটি পাকা করে তার নামে নামকরণের দাবী করছি।

এতদিন পর সাফাত উল্লাহর নাম সবার সামনে তুলে ধরেছে স্থানীয় একটি সংগঠন। আদর্শ পাড়া নবজাগরণ ফাউন্ডেশন। কথা হল তাদের সভাপতি মিজানুর রহমানের সাথে। তিনি জানালেন সাফাত উল্লাহকে নিয়ে তাদের পরিকল্পনা। তিনি বলেন, শহীদ (তিনি তালিকাভুক্ত নন) সাফাত উল্লাহর নাম যেন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকা ভুক্ত করা হয়। সেই সাথে রতনপুর থেকে সাপখাওয়া হয়ে মধুর হাইল্যা পর্যন্ত কাঁচা সড়কটি পাকা করে তা যেন শহীদ সাফাত উল্লাহর নামে নামকরণ হয়। এই দাবি গুলো তুলে ধরে আমরা কর্মসূচি হাতে নেব। সেই সাথে শহীদ সাফাত হত্যার সাথে জড়িত রাজাকারদের বিচার দাবি করবো আমরা। করোনা ক্রাইসিস পেরুলেই কর্মসূচি গুলো নেবে নবজাগরণ।

৪. একবার শহীদ সাফাতের বাড়িটা দেখতে গেলাম। এখন সেখানে টিনের ঘর উঠেছে। স্থানীয়রা জানালেন সাফাতকে হত্যার পর তার এই বাড়িটি জালিয়ে দেয় রাজাকারের দল। যার ফলে পুত্র হারা হওয়ার পর বাস্তুহারা হন বছদ্দি মিয়া এবং ছারভান বেগম। মন শান্ত হয়ে গেল। সবাইকে বিদায় বললাম। কিছুক্ষণ বসলাম। মনে মনে ভাবলাম সবাই ভাল থাকে। এই দেশে অপরাধীরা ক্ষমতা দখল করেছে অনেকবারই। বিভিন্নভাবে, অনেক জায়গায়। অথচ সাফাত উল্লাহ তার ত্যাগের স্বীকৃতিটুকু আজও পাননি।

লেখক : অ্যাক্টিভিস্ট।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1453 seconds.