• ৩০ আগস্ট ২০২০ ১১:১১:০৩
  • ৩০ আগস্ট ২০২০ ১১:১১:২৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

করোনায় ওল্ড লাইফ, আমরা কী নির্বোধ না উপায়হীন!

ফাইল ছবি

দুই শ্রেণির মানুষ সাহসী হয়। এক শ্রেণি হলো উপায়হীন। অন্য শ্রেণি নির্বোধ। করোনাকালে আমাদের যে সাহসীপনা তাকি নির্বুদ্ধিতা নাকি উপায়হীনতা। নাকি দুয়েরই সমন্বয়। অবস্থাদৃষ্টে এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

সংক্রমণ নতুন করে বাড়ছে। ধারণা করা হচ্ছে, দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হেনেছে। তথ্য-উপাত্ত জানাচ্ছে, ঢাকায় সংক্রমণ আবার বেড়েছে। সারাদেশেও তাই। মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। দু’দিন আগে মারা গেছেন ৫৪ জন। দুই মাসে এই সংখ্যা সর্বোচ্চ। অথচ কোথাও তার কোনো ছাপ নেই। মানুষ ফিরে গেছে তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়। স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক দূরত্ব সব চুলোয় গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে নিও-নর্মাল জীবনের কথা, আর বাংলাদেশ চলছে ওল্ড-নর্মালে। রাস্তায় বেরুলে ৯৫ শতাংশ মানুষের মুখেই মাস্ক দেখা যায় না। সামাজিক দূরত্ব বলতে গলাগলি। রীতিমত দুঃসাহসিক দৃশ্যচিত্র। আর এই সাহসিকতার শ্রেণিভেদ করতে গেলে দুটি কথাই উঠে আসে। এ উপায়হীনতা, নাকি নির্বুদ্ধিতা।

উপায়হীনতার কারণটা ব্যাখ্যা করি। মানুষ দেখেছে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রকৃত রূপ। এতদিন যাও ঢেকেঢুকে রাখা হয়েছিলো। করোনা মহামারীতে তা নিরাভরণ হয়ে উঠেছে। মানুষের চোখ গেছে অন্দরমহল অবধি। দেখেছে উদাহরণ অযোগ্য দুর্নীতি। প্রথম আলো’র সম্পাদকীয় যে কথা বলেছে। পুকুর চুরি, সাগর চুরি কোনো কিছুই আর যাচ্ছে না সে দুর্নীতির সাথে। সারাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা লেজেগোবরে। দেশের জেলাগুলিতে একটা আইসিইউ বেড নেই। নেই হাই ফ্লো অক্সিজেন ব্যবস্থা। এমনকি কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সঞ্চালন ব্যবস্থাও নেই। নেই কার্ডিয়াক ইউনিট। নিউরো বিষয় তো দূর কা বাত। তার ওপর পরীক্ষা নিয়ে কত হ্যাপা। ফি দিতে হবে, সিরিয়াল নিতে হবে কত কী! পরীক্ষার শুদ্ধতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। নকল সনদের কথা তো জানাই। সাহেদ-সাবরিনা কাহিনী বায়স্কোপকেও হার মানিয়েছে। মানুষ বুঝতে পেরেছে, তাদের উপায় নেই, তারা উপায়হীন। যার ফলে আক্রান্ত হলে বাসাতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন বেশিরভাগ মানুষ। একেবারে নিরূপায় না হলে কেউ হাসপাতালের দ্বারস্থ হচ্ছেন না। এই না হওয়াটাকে কেউ কেউ সাফল্য বলে ধরে নিতে চাইছেন। বিপরীতে অন্যরা বলছেন, ‘পাগলের সুখ মনে মনে’।

গণস্বাস্থ্যের কিট নিয়ে ভেল্কিবাজি তো চোখের সমুখে। ভ্যাকসিন ট্রায়াল নিয়েও একদফা জাদু দেখা হলো। অবশেষে চীনের ভ্যাকসিন ট্রায়ালে রাজি হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। রাজি হওয়ার পরের দিনের খবর হলো দেশের একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন উৎপাদন নিয়ে ভারতের একটি প্রতিষ্ঠানের চুক্তি হয়েছে। ট্রায়ালে গরিমসি এবং চুক্তি এই দু’য়ের যোগসাজশ বোঝা ওঠা খুব দুঃসাধ্য নয়। বালিশকাণ্ড আর পর্দাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা তো আজো চলমান। এসব দেখে মানুষের মনে উপায়হীনতা ছাড়া অন্য আর কী বোধ জন্মাতে পারে!

নির্বুদ্ধিতার কথা জানাই। আমাদের দেশের অনেকেই দেখে শিখে। যারা সমাজের মাথা-মুণ্ডু তাদের অনুসরণ করে সাধারণ মানুষ। সেদিকে তাকালে আমরা কী দেখি। দেখি ত্রাণের দেয়ার নামে স্বাস্থ্যবিধি না মানার কসরৎ। সভা-সমিতির নামে সামাজিক দূরত্ব লঙ্ঘনের মহোৎসব। দেখি কর্তাদের মাস্ককে ‘থাস্ক’ বানানো। অর্থাৎ মুখে না লাগিয়ে থুতনিতে লাগানো। সব মিলিয়ে তৃণমূলে মেসেজ যেটা যায় সেটা হলো, ‘নো চিন্তা ডু ফুর্তি’।

এরমধ্যে আবার করোনা বিষয়ক বুলেটিন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কমানো হচ্ছে করোনা হাসপাতালের সংখ্যা। একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া সব খোলা। তবে প্রাইভেট পড়ানো কিংবা কোচিং থেমে নেই। রাস্তাঘাটে আবার যানজট। সেপ্টেম্বর থেকে গাড়িতে সামাজিক দূরত্ব মানার বিষয়টিও উঠে যাচ্ছে। ভাড়া স্বাভাবিক করায় এক সিট ছেড়ে বসার বিষয়টি পরিত্যক্ত হচ্ছে। মাস্ক পরা বাধ্যতামূল হলেও, বাধ্য করানোর কোনো চেষ্টাই কোথাও নেই। সব মিলিয়ে মেসেজ একটাই ‘নো চিন্তা’। সুতরাং ভুল বার্তায় মানুষের নির্বোধ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এরসাথে যোগ হয়েছে বাগাড়ম্বর আর সাফল্যের স্তবগাথা। সব মিলিয়ে মানুষ রীতিমত ‘ইয়ে’ অবস্থায়।

অন্যদিকে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন উল্টো কথা। আশঙ্কার কথা। বলছেন, সংক্রমণ বাড়ছে। পরিস্থিতি এখনো না সামলানো গেলে ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠবে। শীত আসলে তো কথাই নেই। বিবিসি তার প্রতিবেদনে আশঙ্কা করেছে, স্বাস্থ্য বিভাগ হাল ছেড়ে দিয়েছে কিনা। কেউ কেউ বলছেন, হার্ড ইমিউনিটির পথে এগুচ্ছে পরিস্থিতি। খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক ও চিকিৎসক জাকির তালুকদার এক লেখায় উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ‘সরকার হার্ড ইমিউনিটির পথে হাঁটছে। সুতরাং মানুষকে নিজেদের রক্ষার ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে। সবাইকে মাস্ক পড়ার কথা বলতে হবে। বোঝাতে হবে আসন্ন বিপদের কথা।’ এছাড়া অবশ্য উপায়ও নেই। সব মিলিয়ে নিজেরা নিজেদের কাছে ক্রমেই প্রশ্নবোধক হয়ে দাঁড়াচ্ছি এই ভেবে যে, আমরা নির্বোধ নাকি উপায়হীন।

শেষে হার্ড ইমিউনিটির কথা বলি। হার্ড ইউমিউনিটি স্রেফ একটি চিন্তা। এমন হতে পারে। কিন্তু হয়েছে কিনা কেউ দেখেনি। এক ধরণের জাদুবাস্তবতা বলতে পারেন। আর এই জাদুবাস্তবতাকে বাস্তবতা হিসাবে ধরে নেয়াটা চরম বোকামি। হার্ড ইমিউনিটি মানে কমপক্ষে ৬০ শতাংশ মানুষকে আক্রান্ত হতে হবে। আচ্ছা এত পরিমাণ মানুষ যদি আক্রান্ত হয় তাদের চিকিৎসা দেয়ার ক্ষমতা কি রাষ্ট্রের রয়েছে? মানুষকে আক্রান্ত করে, মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে কোনো বিপর্যয় এড়ানোর চিন্তা কি সুস্থ? নাকি অসুস্থতা ভর করেছে আমাদের মগজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে!  

লেখক : সাংবাদিক ও কলামনিস্ট

বাংলা/এসএ/

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1593 seconds.