• ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১২:২৮:০৯
  • ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১২:২৮:০৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ওয়াহিদা খানমের উপর হামলার দায়ভার ...

ফাইল ছবি

ঘোড়াঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানমের উপর হামলা পরিকল্পিত এমনটাই দাবি করছেন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ। তারা বিষয়টি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তারা বলছেন, ‘নেহাত চুরি নয়, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত। চুরির কথা বলে ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে।’ এ বিষয়ে গণমাধ্যম ‘দেশ রূপান্তর’ একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছে। সেই প্রতিবেদনটিও সরকারি কর্মকর্তাদের সংগঠনটির বক্তব্যকে সমর্থন করে। সেই প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে শাসক দলের স্থানীয় নেতাদের সাথে তার বনিবনা হচ্ছিল না খাস জমি দখলের প্রশ্নে। রয়েছে ওয়াহিদা খানমের মাদক ও অন্যান্য অপরাধবিরোধী কার্যক্রমের প্রতিও ক্ষোভ। স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির নাম দিয়ে প্রতিবেদনের শিরোনামই করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তার মুল্লুকে বাধা ছিলেন ইউএনও ওয়াহিদা— এমন শিরোনামই জানান দেয় ঘটনাটি নিছক চুরির ছিলো না।

অর্থাৎ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিলেন ওয়াহিদা খানম। অন্যায়কে চুপ করে মেনে নিতে পারছিলেন না বলেই এমন দ্বন্দ্ব। ঘটনার প্রেক্ষাপট অন্তত তাই বলে। এমন দ্বন্দ্ব কি এটাই প্রথম? আর কোনো ঘটনা নেই? লাঞ্ছনা, বদলি। নেই এসবের ঘটনা? এসবের ধারাবাহিকতাই ওয়াহিদা খানমের উপর হামলা, দেশ রূপান্তরের খবর এবং শাসক দলের যুব সংগঠনের দুই নেতার বহিষ্কার তারই পরোক্ষ সত্যতা তুলে ধরে।

সরকারি কর্মকর্তাদের বিচার দাবি করে সংবাদ সম্মেলনটি নিয়ে কথা কম হয়নি। বিশেষ করে সামাজিকমাধ্যমে অনেকেই ছেড়ে কথা কননি। প্রশাসনের হাতে আইনশৃঙ্খলা থেকে নিয়ন্ত্রণের সকল দায়িত্ব। তবে অবস্থা এমন দাঁড়ালো কেনো। অনেকেই এ নিয়ে তীর্যক প্রশ্ন ছুড়েছেন তাদের প্রতি। কেউ কেউ বলেছেন পরিস্থিতির দুর্বিষহতার দায়ভার তারাও এড়াতে পারেন না।

সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি হেলালুদ্দীন আহমেদ বলেছেন, ‘কোনো কোনো মহল ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য বিচ্ছিন্ন ও চুরির ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার অপপ্রচার চালাচ্ছেন।’ এখন প্রশ্ন ওঠে, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার উপর ঘটে যাওয়া হামলা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার বিষয়ে সংগঠনটির বক্তব্য কী বিশ্বাসযোগ্য? যদি বিশ্বাসযোগ্য হয় তবে এর আগে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু আলোচিত ঘটনা বা হত্যাকাণ্ডগুলোর ক্ষেত্রে এই বক্তব্যের কী মূল্যায়ন হবে? সংগঠনটি আরো বলছে, ‘বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল বেআইনি তদবিরে ব্যর্থ হয়ে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।’ অর্থাৎ বেআইনি তদবির বিষয়টিও অবশেষে স্বীকৃত হলো। তারা ঘটনাটি পরিকল্পিত বলেও দাবি করেছেন। একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে হত্যা প্রচেষ্টার পরিকল্পনা খুব ছোট পর্যায়ের কারো হতে পারে না। অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা ‘হয়েছে’, ‘হচ্ছে’, ‘হতে পারে’ — এই তিনটি টার্মই সম্ভাবনার বাইরে নয়। না হলে বেশ কিছু উপজেলা কর্মকর্তাদের রক্ষায় সশস্ত্র আনসার নিয়োগ হবার কথা নয়। তখনি নিরাপত্তার প্রয়োজন পরে, যখন নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। এক্ষেত্রে ওয়াহিদা খানমের ঘটনাটি অ্যালার্মিং কিংবা দুর্বৃত্তদের টেস্ট কেইস বলা যায় কি? এই দুর্বৃত্তরা কি ক্রমশ নিজেদের প্রশাসনের প্যারালাল মনে করতে শুরু করেছে?

এসোসিয়েশনের সংবাদ সম্মেলনে আরেকটি কথা উঠে এসেছে। কথাটি এমন, ‘ওয়াহিদা খানম তেমন কোনো চাপে ছিলেন বা অস্বস্তিতে আছেন বলে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে শেয়ার করেননি।’ অর্থাৎ দোষের ভাগটা কিছুটা হলেও ওয়াহিদা খানমের। কেনো তিনি জানালেন না। সেই পরিচিত ভিক্টিম ব্লেইমিং থিওরি। যেটা এখানেও খেটে যাচ্ছে। একজন ধর্ষিতা হলে, তার পোশাকের দোষ। খুন হলে, রাতে বের হবার প্রশ্ন, অসাবধান থাকার গল্প। হারকিউলিস উপখ্যান। ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি। এসবই ভিক্টিম ব্লেইমিং। ওয়াহিদা খানমের ক্ষেত্রেও কি তাই ঘটছে?  

একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। একটা উপজেলার যিনি প্রশাসনিক প্রধান। তিনি যদি কথায় কথায় জেলা প্রশাসককে বিচার দিতে যান, তাহলে তার পদে থাকার যোগ্যতা নিয়ে কথা উঠবে। হয়তো উঠাবেন ওয়াহিদা খানমের সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতনরাই। এমন উদাহরণও রয়েছে। প্রতিকার চাইতে গিয়ে বদলির ঘটনাও রয়েছে। আর একজন যোগ্য কর্মকর্তা সাধারণত নিজেই হ্যান্ডেল করতে চান এমন বিষয়কে। অন্যদিকে প্রশাসনের লোকজনকে হত্যার চিন্তা করা হবে এমন ধারণাই হয়তো কাজ করেনি ওয়াহিদা খানমের মধ্যে।

কেনো করেনি, তার নানা রকম ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রশাসন কতটা ক্ষমতাধর তা আমজনতা জানে। জানে প্রশাসনও। তাই তাদের খুন বা আক্রমণ করার কথা চিন্তার মতো সাহসও হাতেগোনা মানুষের রয়েছে। মানুষ যেখানে নিজেদের ন্যায্য দাবির কথা বলতেই সাহস করতে পারে না। দাবির কথা বলতে গেলে, রাস্তায় দাঁড়াতে গেলেই লাঠি খেতে হয়। সেই প্রশাসনকে আঘাত করার মতন সাহস সাধারণ কোনো আমজনতা কিংবা রাজনৈতিক নেতাকর্মীরও হবার কথা নয়। সে শাসক দলের হলেও। আলোচিত ওসি প্রদীপকে যেমন ভয় পেতেন শাসক দলের লোকজনও। প্রশাসনের সঙ্গে ‘পাঙ্গা’ নেয়া সোজা কাজ নয়। যেন-তেন কারো কম্মও নয়।

বুঝলাম ওয়াহিদা খানম সৎ ছিলেন দেখেই তার এমন দুর্গতি। কিন্তু গণমাধ্যমে উঠে আসা খবরে জাহাঙ্গীর-আসাদুলদের যে কর্মকাণ্ড দেখি, তা-তো একদিনের নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তারা জমি দখল, মাদক ব্যবসা থেকে নানা অপরাধ করে আসছিলো। এভাবেই তারা শক্তি সঞ্চয় করেছে। শক্তিমান হয়ে উঠেছে। তাদের প্রশ্রয় দিয়েছে কে? শুধু কি রাজনীতিবিদরা? প্রশাসন কী করলো এতদিন? প্রশ্ন আছে অনেক, উত্তরও খুব অজানা নয়। অজানা কি?

পুনশ্চ: কদিন আগে গেলো কাজী নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকী। নজরুলের লেখা মানুষকে জাগিয়ে তোলে। বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। ‘আমরা সবাই পাপী; আপন পাপের বাটখারা দিয়ে; অন্যের পাপ মাপি!’ — এটাও নজরুলের বিবেক নাড়িয়ে দেয়া পঙ্ক্তি। কিন্তু আমাদের বিবেককে নাড়ানোর ক্ষমতা এমন পঙ্ক্তিসমূহ এখন আর ধারণ করে কি?  

লেখক : সাংবাদিক ও কলামনিস্ট

বাংলা/এসএ/

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.1059 seconds.